“আপনি বলতে চাইছেন সেরকম কিছু লুকিয়ে রাখা আছে ওই আলমারির লুকননা কোনও ‘পকেটে–মানে খাপখোপরে?”
“আমার তাই ধারণা। আর সেটা রাজীবই শুধু জানে, সুবর্ণবাবু জানতেন না– জানেন না। রাজীবের কাছে আলমারিটার দাম নেই, ওই লুকনো জিনিসটাই আসল। সেটা তার চাই। কিন্তু যতক্ষণ না আলমারিটা ফেরত পাচ্ছে সে নিশ্চিন্ত হবে কেমন করে?”
চন্দন আর তারাপদ চুপ। পরস্পরকে দেখল বারকয়েক। তারা কিছু ভাবতেই পারছিল না।
.
০৯.
নন্দবাবু দোকানে আসছিলেন। নিয়মিত নয়। একদিন আসেন তো পরের দিন বাদ যায়। রিকশা করেই আসেন। প্লাস্টার করা ভাঙা হাত বুকের কাছে ঝোলানো থাকে। আসেন, বসেন। কর্মচারীরা আলমারি পরিষ্কারের কাজ শুরু করল। নন্দবাবু চোখ রাখেন। আবার মাঝে মাঝে অন্যমনস্কভাবে বাইরের দিকে তাকান। রাস্তার লোক দোকানের কাছাকাছি চলে এলেই তাঁর উদ্বেগ বেড়ে যায়।
কিকিরাও আসেন দোকানে। নন্দবাবুর সঙ্গে কথাবার্তা বলেন নিচু গলায়। কখনও কখনও আলমারির সামনে গিয়ে নজর করেন ভেতরের দিকটা। কিছুই বুঝতে পারেন না।
সাত-আটটা দিন এইভাবেই কেটে গেল।
“কী হল রায়বাবু? রাজীবের তো সাড়া পাচ্ছি না।”
“বাড়িতে ফোনও আসছে না?”
“না। হঠাৎ কী হল?”
“দেখুন আর ক’দিন।”
“আমি যে কী ধন্দে পড়ে গেলাম। বাড়িতে ওদের আর তর সইছে না; বলছে, ফেরত দিয়ে দাও। বিদেয় করো আপদ। ক’টা টাকা যদি গচ্চা যায় যাক; প্রাণ আগে…”
কিকিরা বললেন, “দেবেন বইকি! নিশ্চয় দেবেন। তবে সবুর করুন না আট-দশটা দিন। কথায় বলে, সবুরে মেওয়া ফলে।”
“ফলার নামগন্ধও দেখছি না। তবু দেখি।”
.
মেওয়া ফলতে ফলতে আরও তিন-চারদিন কাটল! তারপর যা ঘটল সেটা নাটকীয় বললেও হয়।
কিকিরার বাড়িতে বসে গল্পগুজব হচ্ছিল। কিকিরা আর তারাপদ কথা বলছিলেন। সন্ধে হয়ে এসেছে। বাতি জ্বালা হল এইমাত্র। চন্দনের আসার কথা, এসে পৌঁছয়নি এখনও। তারাপদ তাদের হোটেলের মজুমদার সাহেবের ঘরে বসে সেদিন একটা চমৎকার প্রোগ্রাম দেখেছে টিভিতে। তাও পুরো দেখা হয়নি, কারণ সে যখন মজুমদার সাহেবের ঘরে যায়–তখন প্রোগ্রামের অর্ধেকটা হয়ে গিয়েছে। বিবিসি থেকে দেখাচ্ছিল প্রোগ্রামটা। হিস্ট্রি অব ম্যাজিক। পার্ট টু।
“বুঝলেন কিকিরা, দারুণ একটা জিনিস দেখলাম,” তারাপদ বলল। “স্টেজের ওপর একদিকে ম্যাজিশিয়ান। অদ্ভুত তার ড্রেস। মাথায় হেলমেট, কান গলা পর্যন্ত ঢাকা। চোখে গগল্স। পরনে কুস্তিগির টাইপের পোশাক। ম্যাজিশিয়ান দাঁড়িয়ে আছে, দু’ হাত বুকের কাছে। স্টেজের অন্য সাইড থেকে একজন পিস্তল ধরনের ফায়ার আর্মস থেকে নিশানা করে ম্যাজিশিয়ানের মুখে গুলি ছুড়ল। তারপর দেখি, গুলিটা ম্যাজিশিয়ানের মুখে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরা রয়েছে। কী থ্রিলিং। ভয় লাগে। এই খেলা অনেকেই দেখাত। সামান্য হেরফের করে। শেষে একজন চাইনিজ ম্যাজিশিয়ান-”
“জানি। খেলা দেখাতে গিয়ে মারা যায়। অনেকে বলে, ওটা সুইসাইড। খেলাটা তারপর থেকে আইন করে বন্ধ করে দেওয়ার কথা হয়েছিল। এখনও দেখানো হয় বলে শুনিনি।”
তারাপদ বলল, “যাই বলুন, খেলাটা দেখতে বেশ ভয় করে। তবু তো সামনাসামনি দেখছি না।”
এমন সময় বগলা এল। দেখা করতে এসেছেন একজন।
“নিয়ে এসো।”
মুহূর্ত কয়েক পরে যে এল তাকে দেখে কিকিরা অবাক! রাজীব। তারাপদ তাকিয়ে থাকল।
রাজীব কিছু বলার আগেই কিকিরা নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। খাতিরের গলা করা বললেন, “আরে বসুন! আপনি!”
রাজীব কোনও জবাব দিল না। প্রথমে কিকিরাকে দেখল লক্ষ করে, পরে তারাপদকে। শেষে ঘরটাও নজর করে দেখে নিল।
কিকিরা আবার বললেন, “দাঁড়িয়ে কেন! বসুন না!”
রাজীব বসল। তারাপদর পাশের চেয়ারে।
“আমার ঠিকানা খুঁজে পেতে অসুবিধে হয়নি তো? না, শ্রীকুমার পৌঁছে দিয়ে গেল?” কিকিরা বললেন স্বাভাবিক গলায়, যদিও চাপা মজার ভাব ছিল তাঁর কথায়।
রাজীব বলল, “শ্রীকুমার নয়, সুশীল।”
“সুশীল! মানে দোকানের সুশীল? সে..”
রাজীব ভণিতা করল না। “আমার লোক।”
“নন্দবাবুর দোকানে তোমার” বলেই নিজেকে শুধরে নিলেন কিকিরা, “আপনার লোক!”
“আপনি আমাকে তুমি বলতে পারেন, আপত্তি নেই; বয়েসে আপনি বড়। বলছিলাম, নন্দবাবুর দোকানে আমার নোক থাকার মধ্যে অবাক হওয়ার কী আছে? দু’-একশো টাকা বাড়তি হাতে দিলে খবরাখবর দেওয়ার মতন লোক পাওয়া যায়।”
কিকিরা থমকে গেলেন। বুঝতে পারলেন, ছোকরা চতুর, বুদ্ধিমান। সহজে ওকে কবজা করা যাবে না। নিজেকে সঙ্গে সঙ্গে পালটে নিলেন কিকিরা। যেন সত্যিই তিনি অবাক হননি, সরল গলায় বললেন, “তা তো ঠিকই।…ইয়ে, আমার এখানে একটু শরবত, বা চা হতে আপত্তি নেই তো?”
“শরবত! না, চা খেতে পারি, যদি অসুবিধে না হয়!”
“তারাপদ, চা বলে দাও।”
তারাপদ উঠে গেল বগলাদাকে চায়ের কথা বলতে।
কিকিরাকে কথা বলার সময় দিল না রাজীব। নিজেই বলল, “আপনি কে, আপনারা কে কী করেন আমি জানি। শুনেছি। দিঘায় আপনারা তিনজনে কেন গিয়েছিলেন আন্দাজ করতে আমার কষ্ট হয়নি।”
“দিঘায় যাওয়ার আগে নন্দবাবুকে আমি কিছু জানাইনি।”
“না জানালেও আপনি তারাপদবাবুকে নিয়ে ভদ্রলোকের বাড়িতে গিয়েছিলেন। কথাবার্তা হয়েছিল। এসব কি চাপা থাকে? খবর আমি সময়মতন পেয়েছিলাম।”
