কিকিরা হাসলেন। “প্যাঁচ নয়, প্যাঁচালো গিটের মুখ খোলার চেষ্টা। সবই যদি, যদি লেগে যায়!”
তারাপদ বলল, “আচ্ছা, একটা কথা ভেবেছেন?”
“কী?”
“নন্দবাবু চালাকি করে আপনাকে মাঝখানে খাড়া করে দিলেন, আপনারই কথামতন। কিন্তু এমন কী গ্যারান্টি আছে যে, রাজীব তা বিশ্বাস করবে? আর যদি বা করে সে বলতে পারে, নন্দবাবু কার কাছ থেকে অ্যাডভান্স টাকা নিয়েছেন তা দেখার দরকার তার নেই; সে শুধু চায় আলমারিটা তাদের বাড়িতে ফেরত দিয়ে আসা হোক।”
কিকিরা মাথা হেলিয়ে বললেন, “বলতেই পারে। তবে নন্দবাবু একটু শক্ত হয়ে থাকলে রাজীব সুবিধে করতে পারবে না। যে-জিনিস আমায় বিক্রি করব বলে তুমি আগাম টাকা নিয়েছ, আমায় না জানিয়ে কথা না বলে সে-জিনিস তুমি অন্য কাউকে দিয়ে দিতে পারো না। আইনে আটকাবে। উকিল দিয়ে মামলা ঠুকে দেব। কার সাধ্য তুমি জিনিস সরাবে!”
চন্দন চমৎকৃত হয়ে তারিফ করার গলায় বলল, “দারুণ। চালটা ভালই চেলেছেন বলে মনে হচ্ছে। তবে সত্যি তো আপনি টাকা দিয়ে ওটা বুক করেননি।”
“আরে, টাকা দিয়েছি কি দিইনি সেটা আমি আর নন্দবাবু বুঝব। হাতেনাতে না দিলাম, মুখে দিয়েছি।”
সামান্য অপেক্ষা করে তারাপদ বলল, “সার, আপনি ভাবছেন, এর পর রাজীব আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইবে?”
“আশা করছি। অন্তত যোগাযোগ করতে পারে।”
“বেশ, যোগাযোগ করল। করলেই তো আপনাকে চিনে ফেলবে।”
“আমার উদ্দেশ্য তো সেইরকম। রাজীবকে নন্দবাবু আমার ঠিকানা দিয়ে দেবেন। তবে পুরো নাম দেবেন না-শর্ট করে বলবেন, কে কে রায়। ঠিকানা সঠিক দেবেন। রাজীব নাম-ঠিকানা পেয়ে সটান আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতে পারে। যদি চায়, নন্দবাবু শ্রীকুমারকে সঙ্গে দিয়ে রাজীবকে আমার কাছে পাঠাতে পারেন।”
তারাপদ উঠে পড়ে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। গরমের তাত খানিকটা কমলেও গুমোট কাটছিল না। রুমালে মুখ ঘাড় মুছে নিল তারাপদ। সন্ধে পেরিয়ে রাত হয়ে এল।
তারাপদই হঠাৎ বলল, “শেষমেশ তা হলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে, আপনি এখন রাজীবের সঙ্গে দেখা হওয়ার ভরসায় রয়েছেন?
কিকিরা গলা তুলে বগলাকে ডাকলেন। জল দিয়ে যেতে বললেন তাকে। হঠাৎ হাই তুললেন। ক্লান্তির জন্যেই সম্ভবত। ঘাড়ের আড়ষ্ট ভাবটা কাটাবার জন্যে নাড়াচাড়া করলেন মাথা-ঘাড়।
বগলা জল এনে দিল।
জল খেয়ে আরাম পেলেন। চুরুট ধরালেন। তারপর বললেন, “আমার যা যা মনে হয়, বলছি। মন দিয়ে শোনো। বিশ্বাসবাড়ির ছোটকর্তা সুবর্ণবাবুর সঙ্গে আমি দেখা করতে পারিনি। হরেনবাবু আমায় ও-বাড়িতে নিয়ে যেতে রাজি হননি। আমি তাঁর কোনও দোষ ধরছি না। সত্যি সত্যি এভাবে হুট করে কাউকে সেখানে নিয়ে যাওয়া যায় না। উচিতও নয়। বুড়ো মানুষটির দুর্দিনে তাঁর কাছে নিয়ে গেলে সেটা হয়তো খারাপ দেখাত। তবে তাতে আমার লোকসান হয়নি। হরেনবাবুর কাছ থেকে সুবর্ণবাবুর সম্পর্কে যা জানার আমি জেনেছি।”
“কী জেনেছেন?”
“ভদ্রলোকের এখন চরম দুরবস্থা। স্থাবর অস্থাবর যেখানে যা আছে বেচেবুচে দিন কাটাতে হচ্ছে। ওঁর এমন অবস্থা নেই যে, নাতিকে টাকা দেবেন হোটেল খোলার জন্যে। রাজীব হোটেলের ব্যবসায় নেমেছে দিঘায় গিয়ে–এটা তিনি জানেন কিদ্র তাকে আর্থিকভাবে সাহায্য তিনি করতে পারেননি। করা সম্ভবই নয়।”
রাজীবের হাতে টাকা এল কেমন করে?
“হরেনবাবুর ধারণাই বোধ হয় ঠিক। রাজীব নিশ্চয় তার বাবার গচ্ছিত কিছু পেয়েছে, মায়ের গয়নাগাটিও বেচে দিতে পারে টাকার জন্যে। না হয় কোথাও থেকে ধারকর্য করেছে। এ ছাড়া আর কী বলব! না হলে বলতে হয়, রাজীব টাকাপয়সা ঢালেনি, ওয়ার্কিং পার্টনার হিসেবে কাজ করছে।…তা সে যাই হোক ও নিয়ে মাথা ঘামিয়ে আমাদের লাভ নেই।”
“বেশ! তা হলে–”
“আলমারিটাই আসল তারাবাবু। দাদু বেচে দিল, নাতি সেটা বেচতে দেবে না। কেন? আগে কত কীই না দাদু বেচে দিয়েছেন, আসবাবপত্রও, রাজীব ফেরত পাওয়ার জন্যে হন্যে হয়ে উঠেছে! না, কিছুতেই নয়। যদি হত সুবর্ণবাবু বিনা দ্বিধায় আলমারি বেচতেন না।”
“এ তো এক পাজল, সার। একটা কাঠের আলমারি, যত পুরনোই হোক, তার সঙ্গে এমন কী মিস্ত্রি জড়িয়ে থাকতে পারে যে, তা নিয়ে এত কাণ্ড হবে?”
কিকিরা চুরুটটা রেখে দিলেন। আগুন নিভে গিয়েছে। গলা পরিষ্কার করলেন, বললেন, “আমি নন্দবাবুকে বলেছি, আপনি আলমারির কাজে হাত লাগান। ভেতর-বাইরে দেখুন ভাল করে–যদি কিছু নজরে আসে…”
“কী আসবে?”
“কেমন করে বলব! ওই আলমারিটায়–আমি ওপর থেকে যা দেখেছি, একটা তাকে ড্রয়ার, খোপখাপ আছে। এখন যেমন আলমারিতে লকারের ব্যবস্থা থাকে। তা থাকবে বইকি, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু!”
কিকিরা থেমে গেলেন। চুরুটটা আবার ধরাবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিলেন। রদ্দি চুরুট।
“কিন্তু কী–?” চন্দন বলল অধৈর্য হয়ে।
“ওর মধ্যে কোনও সিক্রেট পকেট বা খোপের ব্যবস্থা আছে–যা বাইরে থেকে হাজার খুঁজলেও ধরা মুশকিল। পুরনো কালের আলমারিতে এসব থাকত, নন্দবাবু জানেন। এখনও থাকে, তবে রেয়ার। ব্যাঙ্ক লকার হয়ে যাওয়ার পর বিশেষ বিশেষ দামি জিনিস, কাগজপত্র রাখার সুবিধে হয়ে গিয়েছে। ধরো হিরের নেকলেস, নীলার আংটি, চুনির গয়না থেকে কোনও অত্যন্ত জরুরি দলিল দস্তাবেজের কাগজ তো আলগোছে সকলের চোখের সামনে ফেলে রাখা যায় না, লুকিয়েই রাখতে হয়।”
