“কতদিন হল? ছ’ সপ্তাহের আগে”
“নন্দবাবু বললেন, আলমারিটা তিনি ফেরত পাঠিয়ে দেবেন।”
“সে কী! কেন?”
“বলছিলেন, তাঁর বাড়ির লোক ভয় পেয়ে গিয়েছে। স্ত্রী তো বটেই, ছেলেও বলছে ফেরত দিয়ে দিতে।”
তারাপদ সন্দেহের গলায় বলল, “আবার কিছু হয়েছে নাকি?”
“হ্যাঁ। বাড়িতে ফোন আসতে শুরু করেছে। দু’দিন ফোন এসেছিল। সেই একই গলা। শাসাচ্ছে নন্দবাবুকে।”
তারাপদ চন্দনের দিকে তাকাল একবার। বোধ হয় পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছিল না। কিকিরার দিকে মুখ ফেরাল আবার। “ঝামেলাটা তবে মিটে যাচ্ছে?”
কিকিরা মাথার চুল ঘাঁটতে ঘাঁটতে বললেন, “নন্দবাবু মেটাতে চাইছেন, আমি বললাম, এত সহজে মিটিয়ে দেবেন? আর-একটু দেখুন না!”
“মানে?”
“মানে, আলমারি ফেরত দেওয়া, আড়াই হাজার টাকা ফেরত আসা বড় কথা নয়। ধরে নিলাম, আপনি ব্যবসাদার মানুষ, একটা ডিল মনের মতন হল না, লাভও নয়, লোকসানও নয়–ছেড়েই দিলেন। কিন্তু আপনার কি মনে হয় না, কী আছে ওই আলমারির মধ্যে যার জন্যে আপনার কেনা জিনিস জোর করে ভয় দেখিয়ে আপনার কাছ থেকে ফেরত নেবে ওরা?”
চন্দন বলল, ইতস্তত করে, “কী বললেন নন্দবাবু?”
“বললেন, না মশাই–আর আমার সাহস হয় না। ছেলে তো একেবারে বেঁকে বসেছে। বলছে, জেদ করে বিপদ ডেকে আনার দরকার কী এই বয়েসে! নিজের প্রাণ বড়, না জেদ!”
“ছেলে ভয় পেয়েছে, সার।”
“হ্যাঁ। নিরীহ ছেলে, তা ছাড়া বাপের ব্যবসা নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। তা আমি নন্দবাবুকে বললাম, আলমারিটা ফেরত দেওয়ার আগে আপনি একটু চালাকি করুন।”
“চালাকি?”
“আবার যখন ফোন আসবে আপনি বলবেন, ওটা আপনি আমাকে বেচে দেবেন বলে আগাম টাকা নিয়েছেন। কথা ছিল, মাসখানেক পরে আলমারির খুচখচ মেরামতি সেরে, রং পালিশ করে আমায় ডেলিভারি দেবেন। এখন কথার খেলাপ করে কেমন করে আলমারিটা ফেরত পাঠান। অন্তত আমার সঙ্গে কথা না বলে তা করা সম্ভব নয়।”
তারাপদ অবাক হয়ে বলল, “আপনি সার ওই আলমারিটা কিনছেন?”
“কিনছি না; কেনার ভান করছি।”
“ফলস দিচ্ছেন!”
“তাই দিচ্ছি,” কিকিরা নির্বিকার গলায় বললেন, “আমি নন্দবাবুকে বলেছি, আপনার হাতে প্লাস্টার, পা নাড়াতে এখন আর অসুবিধে হয় না। কাল পরশু আপনি রিকশা চেপে দোকানে আসুন। আমিও থাকব। দোকানে গিয়ে আপনি কর্মচারীদের বলবেন, আলমারিটার কাজে হাত লাগাতে। অন্তত সাফসুফ করুক। মেরামতির কোথায় কী আছে খুঁজে বার করুক। আমিও দোকানে গিয়ে হাজির হব।”
“কাস্টমার হিসেবে?” চন্দন বলল।
“আগে গিয়েছি পুরনো বন্ধু হিসেবে। মাইন্ড দ্যাট, আমি সেদিনও আলমারি দেখেছি। কর্মচারীরা নিজের চোখে দেখেছে, আমি নন্দবাবুর সঙ্গে কথাও বলছি, আবার আলমারিও দেখছিলাম। এমন তো হতেই পারে, ওটা আমার পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। পরে আমি কেনার কথা ভেবেছি।”
চন্দন বলল, “আপনি নন্দবাবুর বাড়িতেও গিয়েছেন, দোকানের কর্মচারী শ্রীকুমার এসে আপনাকে খবর দিয়ে গিয়েছে ও-বাড়ি যাওয়ার জন্যে।”
“তাতে ব্যাপারটা পোক্তই হয়েছে, চাঁদু। নন্দবাবু হাত-পা জখম করে বাড়িতে পড়ে আছেন, আমি তাঁকে দেখতে গিয়েছি–তার মানে এই নয় যে আমাদের মধ্যে কেনাকাটার কথা আগে হয়নি বা পরে হবে না। বরং উটকো অ্যাক্সিডেন্টে পড়ে তিনি হয়তো বলতে পারেন, আলমারিটা ডেলিভারি দিতে আরও কিছু সময় লাগবে।”
তারাপদ ধোঁকা খেয়ে প্রায় বোবা হয়ে ছিল এতক্ষণ। এবার বলল, “সার, আপনাদের দুজনের মধ্যে আলমারিটা বেচাকেনার কথা হয়েছে অন্য কেউ জানবে না? দোকানের কর্মচারীরা নয়?”
“না জানতেও পারে। নন্দবাবু আর আমার মধ্যে আড়ালে কোন কথা হচ্ছে কর্মচারীদের জানাবার দরকার কোথায়?”
তারাপদ চন্দনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল, যেন বলতে চাইছিল, ‘তুই কিছু বুঝছিস?”
চন্দন কী যেন ভাবছিল। অন্যমনস্ক। সিগারেট ধরাল। কিকিরার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার উদ্দেশ্য কী? আপনি কি মনে করছেন, এইভাবে রাজীবকে আপনি সামনাসামনি দাঁড় করাতে পারবেন?”
“এ ছাড়া অন্য কোনও চাল আমার মাথায় এল না,” কিকিরা বললেন, “রাজীবকে আমরা দেখেছি। কিন্তু সে অন্যভাবে। তার খোঁজখবর করতে গিয়েছিলাম। নন্দবাবু বললেন, আর আমি মেনে নেব তাঁর কথা–তাই কি হয়! ওঁরও তো কোনও মতলব থাকতে পারে। রাজীব ব্যাপারটা যদি মনগড়া হয়, যদি দু’জনের মধ্যে এমন একটা চুক্তি হয়–রাজীব একদিন দোকানে ঢুকে যাত্রা-থিয়েটার করবে–তারপর হুট করে দোকানে আগুন লাগিয়ে দিলাম নিজেরাই, আর আগুনে পুড়ে দোকান ছাই হয়ে ইনসিওরেন্সের লাখ দুই তিন টাকা হাতে আসবে…
“বলেন কী, সার?”
“এসব আকছার হয়। ম্যানেজ করতে পারলে তুমি ধরা পড়বে না, তারাবাবু। লাখ দুই আড়াই টাকা এল ইনসিওর থেকে, তারপর ধরো তুমি আর দোকান নিয়ে মাথা ঘামালে না। না ঘামিয়ে জায়গাটা অন্য পার্টিকে বেচে দিলে। ওসব জায়গায় দোকানঘর পেতে হলে এখন হাজার পঞ্চাশ গুঁজে দিতে হয় হাতে। ব্ল্যাক মানি। নন্দবাবু যে এমন দাঁও মারতে চাইছেন না বুঝব কেমন করে! দোকানের অবস্থা তো টিমটিমে। ছেলের কোনও আগ্রহ নেই দোকানে। এই অবস্থায়–
কথা শেষ করতে পারলেন না কিকিরা, চন্দন অবাক গলায় বলল, “আপনি বলছেন কী! আপনার মাথায় এতরকম প্যাঁচ ঘোরে! অবাক করলেন, সার। ভেতরে ভেতরে আপনি অনেক এগিয়েছেন তো!”
