ওপর থেকে ততক্ষণে একটি কমবয়েসি মেয়ে এসে চা, মিষ্টি, কাটা ফল দিয়ে গিয়েছে। হরেনবাবু হাত বাড়িয়ে তুলে নিতে বললেন কিকিরাদের।
“খোঁজ নেওয়ার দরকার পড়েছে, দাদা। বলব আপনাকে,” কিকিরা বললেন, “তার আগে আরও দু-একটা কথা জেনে নিই। …আপনি ওঁকে শেষ কবে দেখেছেন?”
“শেষ! শেষ দেখেছি বছর দুই আগে। আমি নিজেই আজকাল তেমন একটা বেরোই না বাইরে। উনি ডেকে পাঠিয়েছিলেন, গিয়েছিলাম।”
“ডেকে পাঠিয়েছিলেন কেন?”
“এই তো মুশকিলে ফেললেন, যদুমাস্টার। সব কথা কি বলা যায়? উচিতও নয়।”
“সিক্রেট! তা হলে বলবেন না।”
“বলেই ফেলি। অনেকদিন হয়ে গেল, ক্ষতি কিছু হবে না। আমার এক ভায়রাভাইয়ের জুয়েলারির ব্যবসা আছে। সোনাবাবুর জানা ছিল। ওঁর তখন টাকার দরকার। ভীষণ জরুরি। পেনেটির বাগান ক্রোক হয়ে যাচ্ছে। আদালতের খাঁড়া মাথার ওপর। সোনাবাবু একটা নেকলেস বিক্রি করবেন। জড়োয়ার নেকলেস, হিরে আছে এক জোড়া, মুক্তো, পান্না। বাজারে গিয়ে নেকলেস ফেলে দেবেন সোনাবাবু, তাই কি হয়! তার ওপর দাঁও মারার লোকের অভাব নেই। কেউ ঠেকায় পড়লে তাকে ঠকাবার লোকের অভাব হয় না। সোনাবাবু অতটা ঠকতে রাজি নন, আবার লোকের চোখের আড়ালে বেচতে হবে। আমায় তাই ডেকে পাঠিয়েছিলেন।”
কিকিরা একবার তারাপদর দিকে তাকালেন। তারাপদ ফলের টুকরো তুলে মুখে দিয়েছে ততক্ষণে।
“অবস্থা তা হলে খুবই খারাপ বলুন” কিকিরা বললেন।
“অবস্থা–!..কী বলব ভাই যদুমাস্টার, বাড়িতে ঢুকলে মনে হয় না, এই সেই বিশ্বাসবাড়ি যেখানে দেড়শো বছর ধরে দোল দুর্গোৎসব হয়েছে রমরম করে। বাড়ির তিনটে ভাগ তিন শরিকের; সব শরিকেরই একই অবস্থা, উনিশ-বিশ তফাত। সোনাবাবুর বাড়িতে আগেও গিয়েছি, অমন দৈন্যদশা চোখে পড়েনি। ঘরদোর মেঝে ছাদ দরজা জানলা–সবদিকে তাকাও, ভূতের বাড়ির মতন পোড়ো আর ময়লায় ভরতি। দেখলে কষ্ট হয়।”
কিকিরা বললেন, “শুনলাম, ওঁর নাকি এখন এমন অবস্থা যে–বাড়ির যেখানে যা আছে বিক্রি করে দিয়ে সংসার চালান।”
“আমারও কানে গিয়েছে কথাটা। সোনাবাবু আজকাল চোখেও প্রায় অন্ধ হয়ে এসেছেন শুনেছি। মাথারও ঠিক থাকে না।”
কিকিরা চা খাচ্ছিলেন।
“আপনার দরকারটা তো বললেন না?” হরেনবাবু আবার জিজ্ঞেস করলেন।
“বলব বইকি, দাদা। আমাকে আর একটা কথা বলুন।”
“কী?”
“সুবর্ণবাবুর একটি নাতি আছে। রাজীব…”
“রাজু! হ্যাঁ, আছে। কেন?”
“চেনেন তাকে?”
“চিনি বইকি! ছোটবেলা থেকে দেখছি।”
“তার খবর রাখেন নাকি?”
“খবর? না? চিনি; দেখেছি। কথাবার্তাও বলেছি দেখা হলো কেন, সে কী করেছে?”
“ছেলেটি কেমন? মানে আপনার ধারণা?”
হরেনবাবু কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলেন কিকিরার দিকে। পরে বললেন, “বাপ-মরা ছেলে, দাদুর কাছেই মানুষ ও। কম বয়েস থেকেই ওকে দেখেছি মাঝে মাঝে। সোনাবাবুর মুখে নাতির কথা যা শুনেছি কখনও-সখনও, তাতে তো মনে হয়নি রাজু ওঁকে জ্বালিয়ে মারে। বিরক্ত হয়েছেন বলেও জানি না। এখন সে বড় হয়েছে, দাদুর সঙ্গে কেমন সম্পর্ক বলব কেমন করে! আমি জানি না। …আপনি এসব কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?”
কিকিরা শেষ কথাটা যেন শোনেননি। বললেন, “রাজীব যে দিঘায় একজনের সঙ্গে পার্টনারশিপে হোটেল খুলছে, জানেন?”
“না”
“হালে তাকে দেখেননি?”
“না। কেন?”
“দাদুর হাতে টাকা নেই, নাতি হোটেলের ব্যবসায় নামছে, টাকা পাচ্ছে কেমন করে?”
হরেনবাবু এবার বিরক্ত হয়েই বললেন, “আরে ভায়া, এসব সাংসারিক কথা কি আমার জানার কথা! আপনারই তাতে কী! তবে রাজুর বাবার তরফে কানাকড়িও ছিল না–আপনি জানলেন কেমন করে? ওর মায়ের গয়নাগাটিও তো থাকতে পারে।…আপনি ঠিক কী জানতে চাইছেন বলুন তো?”
কিকিরা নিজেকে শুধরে নিয়ে মোলায়েম গলায় বললেন, “দাদা, আমি একটা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছি বলেই কথাগুলো জানতে চাইছিলাম। আপনি কিছু মনে করবেন না।…আচ্ছা, আপনি আমাকে একবার সুবর্ণবাবুর কাছে নিয়ে যেতে পারেন?”
মাথা নাড়লেন হরেনবাবু, “না, ভাই। যাঁর সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাৎ হয় না, খোঁজ রাখি না, তাঁর দুর্দিনে আমি আপনাকে কোন দরকারে নিয়ে যাব! না, আমি পারব না। আপনার দরকার থাকলে নিজে যান। কিছু কিনতে চান নাকি?”
কিকিরা বুঝলেন, আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।
কথা ঘুরিয়ে অন্য প্রসঙ্গ তুলে খানিক গল্প করলেন কিকিরা। তারপর উঠে পড়লেন তারাপদকে নিয়ে।
.
০৮.
ছ’-সাতটা দিন তারাপদদের সঙ্গে কিকিরার দেখা-সাক্ষাৎই হল না। না হওয়ার কারণ মাঝে দু দিন পর পর কলকাতায় সন্ধের গোড়ায় ঝড়বৃষ্টি হয়ে গেল। চৈত্রমাসের কালবৈশাখী। যেভাবে লাফে লাফে গরম পড়ছিল, এক-আধ পশলা বৃষ্টির জল না পেলে শহরটার আগুনে রুক্ষ চড়া-ভাব আর কমত না। বৃষ্টি হয়ে বাঁচিয়ে দিল মানুষগুলোকে।
তবু তারাপদরা একদিন এসেছিল কিকিরার কাছে। দেখা পায়নি। তিনি যে কোথায় গিয়েছেন বগলাও বলতে পারল না।
সাতদিনের মাথায় দেখা পাওয়া গেল কিকিরার।
চন্দন বলল, “আপনি কি উধাও হয়ে গিয়েছিলেন? আমরা এসে ফিরে গিয়েছি। বগলাদা বলেনি?”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। “বলেছে। ঝড়বৃষ্টির দু’দিন বেরোতে পারিনি। তোমরা তার পরে এসেছ?”
“গিয়েছিলেন কোথায়?”
“নন্দবাবুর বাড়ি।”
“ও! কেমন আছেন ভদ্রলোক?”
“পায়ের ব্যথা কমেছে। হাঁটতে পারছেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। হাতের প্লাস্টার কাটতে দেরি আছে।”
