পুরনো কলকাতার গলি। মোটামুটি চওড়াই বলতে হবে, টেম্পো, ছোট ট্রাক ঢুকে পড়তে পারে অনায়াসেই। গায়ে গায়ে বাড়ি, খানিকটা স্যাঁতসেঁতে চেহারায় দাঁড়িয়ে আছে। এবাড়ি ও-বাড়ির সামনে রোয়াক। এক জায়গায় জনাকয়েক ছেলে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। কিকিরা আর তারাপদ সদর পেরোতেই হরেনবাবুর গলা পেলেন।
বাঁদিকের ঘরের দরজা খুলেই বসে ছিলেন হরেনবাবু। “এই যে যদুমাস্টার আসুন। আমি ঘড়ি ধরে বসে আছি।”
কিকিরা ভেতরে এলেন; পেছনে তারাপদ।
মজার গলায় কিকিরা বললেন, “আমার নামটা এখনও ভোলেননি দেখছি।” বলে তারাপদর দিকে তাকালেন, বললেন, “হরেনদা আমার জাদুকর পেশাটাকে যদুমাস্টারে পালটে দিয়েছিলেন। এখনও ওঁর সেটা মনে আছে ভাবিনি।”
হরেনবাবু হাসছিলেন। “বসুন বসুন। আগে বসা হোক, তারপর কথা।”
ঘরের মধ্যে একটা চওড়া তক্তপোশের ওপর ফরাস পাতা। চাদরটা ময়লা হয়ে গিয়েছে। জানলার দিকে একটামাত্র কাঠের চেয়ার। দেয়াল জুড়ে নানান ছবি। বাঁধানো ফোটোগ্রাফ, কোনওটা গ্রুপ ফোটো, কোনওটা একলা হরেনবাবু। একপাশে সরস্বতীর পট, দেয়াল-তাকে এটা-ওটা সাজানো, ফরাসের এককোণে একটা হারমোনিয়াম, পাশে ডুগি তবলা।
ঘরের মধ্যে গান চলছিল। আলো জ্বালানোর সময় হয়ে এসেছে দেখে আলোও জ্বালিয়ে দিলেন হরেনবাবু।
কিকিরারা ফরাসের ওপর বসলেন, “কেমন আছেন দাদা?”
“আছি। পুরনো হলে বাঁশেও ঘুন ধরে। আমারও ধরেছে।”
“অসুখবিসুখ?”
“তা ঠাকুরের দয়ায় হাঁপানিটা বারো মাসে তেরো পার্বণের মতন লেগেই আছে। ব্লাড প্রেশারটাও চড়া। কী আর করা যাবে ভাই! গিন্নি সটকান দিল। আমি বলতাম, ওগো তেজ দেখিয়ো না, ড্যাংড্যাঙিয়ে চলে যাব আগে আমি, তুমি থাকবে পড়ে। তো সেই আগে চলে গেল। এখন আমি পড়ে আছি। সংসার বলতে ছেলে, বউমা আর এক নাতি। দিন কেটে যাচ্ছে।”
কিকিরার কষ্টই হল। হরেনদা বরাবরই রসিক মানুষ ছিলেন। মুখে হাসি লেগেই থাকত। সামান্য চুপ করে থেকে বললেন, “বাজনাটাজনা ছেড়ে দিয়েছেন নাকি?”
“চোদ্দ আনা। বাঁশি আর ছুঁই না, দম কোথায় কলজেতে, হাঁপানি রোগী। তবে একেবারে বসে থাকি কেমন করে! দু’-পাঁচটা ছাত্র আছে–তারা হপ্তায় দু’ তিনদিন আসে। এখানে বসে বাজায়টাজায়। শুধরে দিই।”
কিকিরা ফরাসের ওপর পড়ে থাকা হারমোনিয়াম ডুগিতবলার ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন।
“আমার কথা হল, আপনার কথাটা বলুন তো যদুমাস্টার। ওই ছেলেটি পরশুদিন আমার বাড়ি খুঁজতে খুঁজতে এখানে এসে হাজির,” বলে তারাপদকে দেখালেন হরেনবাবু। “আপনার কথা বলল। প্রথমটায় থমকে গিয়েছিলাম। ধরতে পারলাম ঠিকই যখন বলল, আপনি ম্যাজিশিয়ান ছিলেন একসময়। তবে অবাক হলাম এই ভেবে যে, এতকাল পরে আপনি আমার খোঁজ করে দেখা করতে চান।”
কিকিরা বললেন, “আমি আপনাদের সেই রেকর্ড কোম্পানির অফিসের খোঁজেও গিয়েছিলাম। শুনলাম, উঠে গিয়েছে।”
“সে তো কবেই।”
“আমার পুরনো ডায়েরি খাতায় আপনার নাম পেলাম। গলির নাম। ঠিকানা মানে বাড়ির নম্বরটা লেখা ছিল না। তারাপদকে খোঁজ করতে পাঠিয়েছিলাম।”
“আমরা আর কোথায় যাব, ভাই! দু’পুরুষের বাড়ি। ইটকাঠের চেহারা দেখেই বুঝতে পারছেন। …যাক গে, এবার আসল কথাটা শুনি। আমায় হঠাৎ মনে পড়ল কেন? …দাঁড়ান, আগে একটু চায়ের কথা বলে নিই।” বলে হরেনবাবু ভেতর-দরজার ওপারে গিয়ে হাঁক পাড়লেন, “বউমা, নীচে লোক এসেছেন, দু-তিনজনের চা পাঠাও।”
ফিরে এসে বসলেন আবার। পানের ডিবে থেকে পান বার করে মুখে দিলেন। “বলুন?”
কিকিরা সরাসরি বললেন, “আপনি হাতিবাগানের বিশ্বাসবাড়ির ছোটকর্তা সুবর্ণকান্তিকে চেনেন?”
“কে? সোনাবাবু! চিনব না কেন? বিলক্ষণ চিনি। ওঁকে আমরা সোনাবাবু বলতাম।”
“ভদ্রলোকের দোকান ছিল একসময়; গ্রামোফোন রেকর্ড বিক্রি হত…।”
“আরে হ্যাঁ, ওই তো–যতীন্দ্রমোহন অ্যাভিনিউতে, বিশ্বাস মিউজিক্যাল হাউস। বাহারি দোকান ভায়া, অন্য পাঁচটা দোকানের মতন একেবারেই নয়। দিব্যি বড় ঘর, কাঠের ঠেলা-দরজা, দোকানের একপাশে রেকর্ড, গ্রামোফোন মেশিনটেশিন বিক্রি হত; অন্য পাশে পার্টিশানের এপাশে সোফাসেটি চেয়ার গালচে। সেখানে জমাট আড্ডা বসত গাইয়ে বাজিয়ের, চা পান চুরুট চলত। মাঝে মাঝে খাবারদাবার আসত। হইচই হাসি তামাশা…”
“আড্ডার দোকান?”
“হু, তা বলতে পারেন। সোনাবাবুর যে একটা রেকর্ড কোম্পানি ছিল। বেঙ্গল মিউজিক্যাল রেকর্ডস। বেশি না হলেও কিছু রেকর্ড বার করেছিলেন। গাইয়ে-বাজিয়েদের আসা-যাওয়া তো থাকবেই।”
“দোকান উঠে গেল কেন?”
হরেনবাবু হাসলেন, “ব্যবসা চালাবার মানুষ সোনাবাবু ছিলেন না। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি, খরচার খাতা ভারী হতে হতে গণেশ উলটে গেল।”
“তারপর আর উনি কিছু করেননি?”
“আমার জানা নেই, ভায়া। করেছেন বললে বলতে হয়, শরিকি মামলা মোকদ্দমা আইন আদালত। আগেও করেছেন পরেও করেছেন। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা উকিল ব্যারিস্টারের পকেটে ঢেলে এসেছেন। আর বোঝেনই তো, বড় বড় বাড়ির দেওয়ানি মামলা এক যুগেও শেষ হয় না। সোনাবাবুর জীবনটা এইভাবেই কেটে গেল। খেয়ালি মানুষ, আগুপিছু না ভেবে ঝাঁপিয়ে পড়েন, শেষে মাঝপুকুরে গিয়ে গলা ডুবে যায়, হাঁসফাঁস করেন। … কিন্তু যদুমাস্টার আপনি হঠাৎ সোনাবাবুর খোঁজ নিচ্ছেন কেন?”
