কিকিরা অল্পক্ষণ চুপচাপ থাকার পর বললেন, “মুখ দেখে মানুষ চিনতে অনেক সময় ভুল হয় হে! …তা এত তাড়াতাড়ি রাজীবকে জামিন দেওয়ার কারণ নেই। আর একটু দেখা যাক। …আচ্ছা শোনো, আমার এই পুরনো ডায়েরিতে হরেনবাবু বলে একজনের নাম দেখেছি। গ্রে স্ট্রিটের দিকে থাকতেন, রাধাকান্ত দেব লেন– বা ওইরকম একটা কিছু হবে। খোঁজ নিতে পারো?”
তারাপদ বলল, “অবাক কথা বলছেন তো আপনি! আপনার ডায়েরিতে নাম; আর খোঁজ নেব আমরা!”
“হরেনবাবু ভদ্রলোকটি কে?” চন্দন জিজ্ঞেস করল।
“মিউজিক হ্যান্ড। বাঁশি বাজাতেন; তবলা হারমোনিয়ামেও দখল ছিল। থিয়েটারে, রেকর্ড কোম্পানিতে কাজকর্ম করতেন। আমার সঙ্গে আলাপও হয়েছিল তাঁর। লোকটি খেপাটে, মুখে সবসময় পান, না হলে আড়বাঁশি। তবে হ্যাঁ-বাঁশিতে পয়লা নম্বর।”
“যা বাবা, বাঁশিঅলা আপনার কী করবে?”
“কী করবে বলতে পারি না, নট নাউ! বিশ্বাসবাড়ির ছোটকর্তা সুবর্ণকান্তির একসময় দোকান ছিল গ্রামোফোন রেকর্ড বিক্রি করার। সেখানে গাইয়ে বাজিয়ের আড্ডা বসত প্রায়ই। নন্দবাবুই বলেছেন। হরেনবাবু ছোটকর্তাকে চিনতে পারেন।”
তারাপদ বিরক্ত হয়ে বলল, “আপনি যে কী বলছেন আমি মাথামুণ্ডু বুঝতে পারছি না। সুবর্ণবাবুর দোকান ছিল তাঁর যৌবনকালে, এখন তিনি বুড়ো, হরেন তাঁকে কেমন করে চিনবেন!”
কিকিরা ডায়েরি বন্ধ করে মুখ তুললেন। মানে ভাল করে দেখলেন তারাপদদের। পরে বললেন, “তোমাদের ব্রেন দিন দিন কমজোরি হয়ে যাচ্ছে। ঘিলু শুকিয়ে গেলে গোবর-গণেশ হয়ে যাবে।” বলে কিকিরা হাসলেন। তারপর দাঁড়িয়ে পড়ে হাত মাথার ওপর তুললেন। আলস্য ভাঙলেন। ঘরের মধ্যে জায়গা কম। দু’পা হাঁটলেন। শেষে বললেন, “সুবর্ণবাবু যৌবন বয়েসে দোকান সাজিয়ে বসেছিলেন–মানেটা কী! যৌবন বলতে তুমি কি তাঁর বিশ-পঁচিশ বছর বয়েস বোঝো? সেটা তিরিশ-চল্লিশ হতে আপত্তি কোথায়? পঁয়তাল্লিশও হবে না কেন? ওভাবে হিসেব হয় না। আমি ধরে নিচ্ছি সুবর্ণবাবুর বয়েস এখন যদি সত্তর হয়– তবে বছর কুড়ি-বাইশ আগেও তাঁর গ্রামোফোনের দোকানটা ছিল। তখন তাঁকে হরেনবাবুরা দেখলেও দেখতে পারেন। আলাপও থাকতে পারে।”
“হরেনবাবুর বয়েস কত হতে পারে?” চন্দন জিজ্ঞেস করল।
“ক-ত! সঠিক বলতে পারব না। যাটের গায়ে গায়ে হবে।”
“তিনি এখনও পুরনো ঠিকানায় আছেন?”
“ঠিকানা জানি না। গলির নাম লেখা আছে ডায়েরিতে। ওখানে গিয়ে খোঁজ করলে ভদ্রলোককে পাওয়া যেতে পারে। অবশ্য অনুমানে বলছি!”
তারাপদ বলল, “কিন্তু সার, উনি যে এখনও বাঁশি বাজান আপনি জানেন?”
“না। সেটা খোঁজ করলেই জানা যাবে। তবে আমি জানি হরেনবাবু ওই পাড়ার একটা রেকর্ড কোম্পানির রিহার্সাল অফিসে নিয়মিত যেতেন। হয় বাঁশি না হয় তবলা বাজাতেন। হারমোনিয়ামেও হাত লাগাতেন।”
“তা হলে তো সেই রেকর্ড কোম্পানির অফিসে গিয়ে খোঁজ করলেই হয়।”
“তাও হয়। ..মুশকিল হল, সেই অফিস এখনও আছে কিনা জানি না।”
বগলা চা দিয়ে গেল। গরমে সর্দিজ্বরে ভুগেছে সবে। মুখ শুকনো কাহিল কাহিল লাগছিল।
চন্দনের ডাক্তারিতে বগলা আপাতত নিজেকে সামলে নিলেও গায়ে-গতরে খানিকটা নির্জীব হয়ে রয়েছে।
চা খেতে খেতে তারাপদ বলল, “আপনি তবে লেগে পড়ুন সার। দেখুন হরেনবাবুকে খুঁজে পান কিনা!”
“আমি রেকর্ডিং কোম্পানির অফিসে খোঁজখবরটা নেব। তোমরা বাড়ির খবরটা জোগাড় করার চেষ্টা করো। মনে হয় পেয়ে যাব।”
“ঠিক আছে, বলছেন যখন খোঁজ করব”, তারাপদ বলল। তার গলায় তেমন উৎসাহ নেই, যেন নিতান্তই কিকিরার কথা রাখতে সে খোঁজ করবে, আশা-ভরসা তার নেই।
কিকিরা বললেন, “কালকেই যাও একবার। আমিও কাল বেরোব।” চন্দন বলল, “একটা কথা বলব, সার?”
“বলো।”
“ধরে নিলাম কোনওভাবে আপনি বিশ্বাসবাড়ির চৌকাঠ ডিঙোলেন, বৃদ্ধ ভদ্রলোকের সঙ্গে আপনার দেখাও হল। কিন্তু যদি দেখেন রাজীব সেখানে হাজির, কিংবা আপনার আসা-যাওয়ার পথে তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তখন কী করবেন? ধরা পড়ে যাবেন না?”
কিকিরা অস্বীকার করলেন না কথাটা। বললেন, “আমি একটা হিসেব করেছি। ধরে নিচ্ছি, রাজীব আজ কাল পরশুর মধ্যে দিঘা থেকে ফিরবে না। তার পার্টনার দিঘায় না-যাওয়া পর্যন্ত সে কাজকর্ম ফেলে কলকাতায় আসছে না। সম্ভবত নয়।”
“আপনি একটা চান্স নিতে চান?”
“হ্যাঁ। …তবু অন্যভাবে একবার জেনে নেওয়ার চেষ্টা করব, রাজীব কলকাতায় ফিরেছে কি না?”
“অন্যভাবে মানে?”
“নন্দবাবুর দোকানের শ্রীকুমারকে বলব, খোঁজ করে জেনে আসতে।”
“নন্দবাবুর সঙ্গে আপনি তো আর দেখাই করছেন না!”
“না। ইচ্ছে করেই। অযথা মুখ দেখিয়ে লাভ কী! তা ছাড়া সুবর্ণবাবুর সঙ্গে একবার দেখা না করে আমি নন্দবাবুর বাড়ি যেতে চাই না।”
চন্দন কিকিরাকে নজর করে দেখল। ওঁর গলার স্বর খানিকটা অন্য রকম। কানে লাগল। দ্বিধা হল চন্দনের, তবু বলল, “আপনার মনে যেন কোথাও খোঁচা লেগেছে?”
কিকিরা কথাটার জবাব দিলেন না। না দিয়ে হাত বাড়ালেন, “কই, একটা সিগারেট দাও দেখি। গরমে নেতিয়ে যাচ্ছি। পিক আপ দরকার।”
.
০৭.
পরনে চেককাটা লুঙ্গি, গায়ে ঢিলেঢালা ফতুয়া। মাথার কাঁচাপাকা চুল ফুলেফেঁপে ঝুঁটির মতন দেখায়। মনে হয় না ভদ্রলোক সেলুন বা নাপিতের পরোয়া করেন। মুখে অবশ্য দাড়ি নেই, পাতলা গোঁফ আছে, পাকা।
