“ইস–স্যাড” কিকিরা বললেন, “জন্তু-জানোয়ার অ্যাটাক করেছিল?”
“না। একটা পাথরের চাঁই ওপর থেকে খসে গড়িয়ে পড়ে মাথার পেছন দিকে এসে লেগেছিল।”
কিকিরা আফসোসের শব্দ করলেন। “দুর্ভাগ্য! মানুষ যে কীভাবে মারা যায়!…তা ভাই, আপনি সেই ছেলেবেলা থেকে–”
“আমার দাদুর কাছে মানুষ।”
“কলকাতায় কোথায় বাড়ি?”
“হাতিবাগান।” রাজীব বাড়ির একটা বর্ণনা দিল, নাম বলল রাস্তার, “ওটা আমার দাদু-মানে মায়ের বাপের বাড়ি। ওই বাড়িতেই আমি মানুষ, বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে। আমাদের নিজেদের বাড়ি সুরি লেন, বাবার ভাই জ্ঞাতিগোষ্ঠীরা সেখানে থাকে। আমরা থাকি না।”
কিকিরারা চুপ করে থাকলেন। রোদ ঝলসে উঠছে, দমকা বাতাসও এল। মিস্ত্রিমজুরের গলা। এখান থেকে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে না, আড়াল পড়ে গিয়েছে, শব্দ শোনা যাচ্ছিল, ঢেউ যেন এখন অনেক শান্ত।
তারাপদ হঠাৎ বলল, “এই বাড়িটা আপনারা কিনেছেন?”
“হ্যাঁ,” রাজীব মাথা নাড়ল। “পনেরো-বিশ বছরের পুরনো বাড়ি। কাঁথির এক ভদ্রলোকের বাড়ি। উনি মারা যাওয়ার পর ওঁর স্ত্রী ভাগলপুরে চলে যান। ছেলেমেয়ে ছিল না। এই বাড়িটা ফাঁকাই পড়ে থাকত। তখন দিঘায় লোকজনও বেশি আসত না। আমার পার্টনার যোগাযোগ করে বাড়িটা কিনে নেয়।”
“তাঁকে তো দেখছি না?”
“না, এখন আমি আছি বলে সে অন্য কাজে ব্যস্ত, খঙ্গপুরে তার বাড়িতে গিয়েছে। আমরা দুজনে একসঙ্গে এখানে কমই থাকি। ও যখন থাকে, কাজকর্ম দেখাশোনা করে এদিককার, আমি কলকাতায় চলে যাই। আবার আমি ফিরে এলে ও চলে যায়।”
“অল্টারনেট ব্যবস্থা।”
রাজীব হাসল।
ততক্ষণে চা এসে গিয়েছে। হাতে হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিল ভোলা। বেতের গোল একটা টেবিলও পড়ে ছিল সামনে।
চায়ে চুমুক দিয়ে কিকিরা তারিফ করলেন চায়ের। পরে বললেন, “আপনাদের এই সাগরসঙ্গম চালু হবে কবে?” বলে হাসলেন।
রাজীব বলল, “আশা করছি জুনের আগেই। আর মাস দুই লাগবে বড়জোর।”
“বর্ষার আগেই তবে তা ভাল। শুভস্য শীঘ্রম।” হাসলেন কিকিরা। “আমরাও চলে আসতে পারি।…আজ তা হলে চলি, ভাই। আপনার সঙ্গে আলাপ করে বড় ভাল লাগল।”
চা শেষ করে তিনজনে উঠে পড়লেন।
বারান্দা দিয়ে নামার সময় চন্দনের আবার নজর পড়ল মোটরবাইকের দিকে। কিকিরাদের কাছে সে নন্দবাবুর কথা শুনেছে, বাইকের ধাক্কা খেয়েছেন ভদ্রলোক। তাঁর ধারণা ওটা দুর্ঘটনা নয়, তাঁকে জখম করার চেষ্টা।
চন্দন চোখের ইশারায় বাইকটা দেখাল রাজীবকে। “আপনি কি মোটরসাইকেল নিয়ে কলকাতা যান? এতটা রাস্তা!”
“না। আমার যাওয়ার ঠিক নেই। কখনও বাসে যাই, কখনও খঙ্গপুর পর্যন্ত গিয়ে লোকাল ধরি, আবার চেনাশোনা কন্ট্রাক্টারদের জিপ-টিপ যাচ্ছে দেখলে তাতেও চলে যাই। কেন বলুন তো?”
“এমনি বললাম,” চন্দন বলল, “এই রাস্তাটায় মাঝে মাঝেই শুনি অ্যাক্সিডেন্ট হয়। এই তো কদিন আগেই কাগজে দেখছিলাম এক ভদ্রলোকের স্ত্রী মেয়ে সবাই হেড অন কলিশনে মারা গিয়েছেন। ভদ্রলোক নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করছিলেন।”
রাজীব বলল, “পড়েছি কাগজে, শুনেছি। বেশিরভাগ অ্যাক্সিডেন্টই হয় কেয়ারলেস ড্রাইভিংয়ের জন্যে। ভদ্রলোক শুনলাম নতুন গাড়ি কিনে বেশি বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। ব্যাড লাক।”
কিকিরারা আর দাঁড়ালেন না। মাথার ওপর সূর্য গনগনে হয়ে উঠেছে, বালি তেতে যাচ্ছে ভীষণ।
.
রাস্তায় এসে তারাপদ বলল, “কী সার? কেমন মনে হল?”
কিকিরা বললেন, “মনে হওয়ার মতন এখন কিছু হয়নি। ছেলেটি হয় সরল সাদামাটা ভদ্র; না হয় অত্যন্ত চতুর ধূর্ত। ওপর থেকে কিছু বোঝা যায় না।”
চন্দন বলল, “রাজীবকে আমার কিন্তু খারাপ লাগেনি। ওকে ক্রিমিন্যাল ভাবা যায় না।”
“বোধ হয়। তবু দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়,” কিকিরা বললেন।
.
০৬.
কলকাতায় ফিরে কিকিরা নন্দবাবুর সঙ্গে দেখা করলেন না। করার কোনও প্রয়োজনও আপাতত আছে বলে তাঁর মনে হয়নি। নন্দবাবু জানেনও না, কিকিরা এর মধ্যে রাজীবের খোঁজে দিঘা গিয়েছিলেন।
কিকিরা চাইছিলেন, একবার হাতিবাগানের বিশ্বাসবাড়ির ছোটকর্তাবৃদ্ধ সুবর্ণকান্তির সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু সেটা কেমন করে সম্ভব? কিকিরার পরিচিত এমন কেউ নেই যাকে সঙ্গে নিয়ে, বা যার সুপারিশে ছোটবাবুর সঙ্গে দেখা করতে পারেন।
তারাপদ আর চন্দনকেও তিনি বলে রেখেছিলেন, একটু খোঁজে থাকো, যদি কাউকে পেয়ে যাও–ও পাড়ার লোক, বিশ্বাস ফ্যামিলিকে চেনে, আমাদের একবার ও-বাড়ির সদরে ঢুকিয়ে দেবে।
তারাপদরাও এরকম কোনও বন্ধুবান্ধব, চেনাজানা লোক পাচ্ছিল না। দিন চারেক এইভাবেই কেটে গেল, কাজের কাজ কিছুই হল না।
সেদিন কিকিরার বাড়িতে বসে কথা বলতে বলতে তারাপদ বলল, “সার, নন্দবাবুর মামলা নিয়ে আর মাথা ঘামাবেন না। ছেড়ে দিন। তুচ্ছ ব্যাপার ওটা; আপনার মতন বুদ্ধিমান লোকের ওখানে নাক গলানো পোষাচ্ছে না।”
কিকিরা একটা পুরনো ডায়েরি-বুকের পাতা ওলটাচ্ছিলেন। মুখ না তুলেই বললেন, “না হয় দিলাম; কিন্তু কেন বলবে তো?”
“সত্যি কথা বলতে কি সার, আমি আর চাঁদু মনে করি না-রাজা বা রাজীব গুণ্ডা মস্তান গোছের ছেলে। তাকে দেখলে কেউ একথা বলবে না। নন্দবাবু কেন যে তার সম্পর্কে অত বাজে কথা বলছেন–আমরা বুঝতে পারছি না।”
চন্দন বলল, “নন্দবাবুর সঙ্গে রাজীবের তো সরাসরি কোনও শত্রুতা নেই। তবে কেন সে ভদ্রলোককে শাসাতে যাবে, আর কেনই বা মোটরবাইক চাপা দিয়ে জখম করতে যাবে?”
