রাজা, মানে রাজীব নন্দী।
চিনতে অসুবিধে হল না। টকটকে ফরসা গায়ের রং। ছিপছিপে গড়ন। কাটা কাটা মুখ। থুতনির তলায় দাড়ি। ঘন জুলফি। কুচকুচে কালো মাথার চুল। কোঁকড়ানো। চোখের মণি ধূসর রঙের।
রাজীবের পরনে জিক্স-এর প্যান্ট, গায়ে ঢিলে ঢলঢলে রঙিন গেঞ্জি, সুতোর, পায়ে চটি। হাতে সিগারেট।
নিজেই এগিয়ে এল রাজীব। দেখল কিকিরাদের। “আপনারা?”
“বেড়াতে বেড়াতে এদিকে চলে এসেছিলাম,” কিকিরা বললেন, “দেখতে বড় ভাল লাগছিল। তাই উঠে এলাম ওপরে।” নরম করে হাসলেন কিকিরা।
“বেড়াতে এসেছেন? দিঘায় প্রথম নাকি?”
“অনেক আগে একবার…”
“কোথায় থাকেন?”
“কলকাতা।”
“ও!”
“এটা আপনার বাড়ি। বাঃ, বড় সুন্দর। কতটা উঁচুতে বাড়ি–সামনে সমুদ্র। অসাধারণ।”
“আমার বাড়ি নয়। একটা হোটেল তৈরির কাজ হচ্ছে।”
“তাই বলুন। আমরা ভাবছিলাম, বাড়িটার মেরামতির কাজ চলছে। হোটেল মানে তো বড় ব্যাপার। অনেক ঘরটর, খাওয়া-বসা, অফিস-?”।
মাথা নাড়ল রাজীব। “না, এখনই অত বড় করার ইচ্ছে নেই। এখানে এখন বড় মাঝারি, ভাল মন্দ অনেক হোটেল। আমরা এটাকে গেস্ট হাউস মতন করব। চার-পাঁচটা ঘর, অ্যাটাচড বাথ, বারান্দার দিকে বসার লাউঞ্জ। যে আসবে, থাকবে দু-চারদিন। খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করছি না। সকালে ব্রেকফাস্ট দেওয়া হবে শুধু। বাকি খাওয়া বাইরে।”
“আচ্ছা! তাতে লোকের অসুবিধে হবে না?”
“হওয়ার কথা নয়। এখানে যারা বেড়াতে আসে তারা সকলেই একই হোটেলে খায় না। যার যেমন মরজি, মুখ বদল, মিল চার্ট বুঝে খেয়ে বেড়ায়। তবে কে বললে, আমরা বাইরে থেকে মিল আনিয়ে দেব।”
কিকিরা কথা বলতে বলতে রাজীব সম্পর্কে একটা ধারণা গড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ছেলেটিকে উদ্ধত, রাগী, রুক্ষ বলে তো মনে হচ্ছে না। নন্দবাবুর কথার সঙ্গে যেন মিলছে না ঠিক।
রাজীবই বলল, “আপনারা একটু ওপাশে সরে দাঁড়ান। রোদ লাগছে মাথায়। এরই মধ্যে রোদ চড়ে উঠেছে। … আপনারা ছাতাটাতা নিয়ে বেরুলেই পারতেন।”
কিকিরা মৃদু হাসলেন। “আবার ছাতা! সামান্য ঘোরাফেরা করে আমরা হোটেলে ফিরে যাব। বিকেলে আরও ঘোরা যাবে, যতটা পারা যায়।” বলেই কী যেন মনে পড়ল। তাড়াতাড়ি বললেন, “ভাই, আপনার নামটি জানা হল না। পরে কখনও এলে এখানে যদি উঠি!”
“আমার নাম রাজীব নন্দী।”
“আমি কিঙ্করকিশোর রায়, লোকে ছোট করে বলে কিকিরা। এরা আমার ইয়ং ফ্রেন্ডস, চন্দন আর তারাপদ।” কিকিরা পরিচয় করিয়ে দিলেন, বিস্তারিত বললেন না।
মিস্ত্রিমজুররা আসতে শুরু করেছিল। তাদের গলা পাওয়া যাচ্ছে, সঙ্গে ধুতি শার্ট পরা মাঝবয়েসি এক সর্দার, হাতে মাপজোকের ফিতে, একটা চটি মতন খাতা।
রাজীব চেঁচিয়ে কী যেন বলল লোকটিকে।
কিকিরা বুঝলেন, এবার তাদের ফিরে যাওয়ার কথা। কিন্তু এভাবে কেমন করে ফিরে যাওয়া যায়! আরও খানিকটা দেখা দরকার। মাথায় একটা বুদ্ধি এল। বললেন, “এক গ্লাস জল পাওয়া যেতে পারে, ভাই? বড় তেষ্টা পেয়েছে।”
“জল খাবেন! আসুন,” বলে রাজীব ডানদিকে পা বাড়াল।
মেঠো জমি, বাগান, করবী ঝোঁপ, গন্ধরাজ ফুলের গাছ। দশ-বিশ পা ডাইনে বাড়িটার পিছন দিকে আসতেই আউট হাউসটা স্পষ্ট নজরে পড়ল। কোনাকুনি একটেরে গোটা দুই ঘর, তারই গা লাগিয়ে কোনাকুনি অন্য এক খুপরি। অ্যাসবেসটাসের ছাদ দেওয়া। আউট হাউসের ঘর দুটি কিন্তু পাকা, সামনে বারান্দা। বেতের চেয়ার পাতা ছিল এক জোড়া।
বারান্দার নীচে কলকেফুলের গাছের ছায়ায় একটা মোটরবাইক।
কিকিরা চন্দনের দিকে আড়চোখে তাকালেন।
চন্দনরা এখন পর্যন্ত একটাও কথা বলেনি। তারাপদ শুধু একবার তুচ্ছ একটা কথা বলেছিল।
হাঁটতে হাঁটতে কিকিরা বললেন, “এই গেস্ট হাউসের নাম কী হবে?”
“নাম এখনও ভাবিনি।”
“আমাদের চেনাশোনা বন্ধুবান্ধব এলে রেফার করতে পারতাম।”
“নাম একটা দেওয়া যাবে।”
“সাগরসঙ্গম। নামটা মুখে এসে গেল।” কিকিরা হাসলেন।
রাজীবও হাসল। মন্দ নয়।”
আউট হাউসে পৌঁছে বারান্দায় উঠলেন কিকিরারা। রাজীব কাকে যেন ডাকল, “ভোলা, জল দিয়ে যাও।” কিকিরাদের দিকে তাকাল, “বসুন আপনারা। ওই কাঠের চেয়ারটাও টেনে নিন।”
পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখ গলা মুছলেন কিকিরা। এখানেই কি আপনি থাকেন?”
“হ্যাঁ, আমরা এখন আউট হাউসেই থাকি। ও-বাড়ির কাজ চলছে, থাকার উপায় নেই।”
ভোলা জল নিয়ে এল। কলাইকরা জলের জগ। কাঁচের গ্লাস। ও বোধ হয় নজর করেছিল, দু-তিনজন বারান্দায় এসে উঠেছেন।
জল খাওয়া হয়ে গেলে কিকিরা বললেন, “আমরা তবে আসি?”
“আসবেন! দাঁড়ান, ভোলা বোধ হয় চা খাওয়াবার ব্যবস্থা করছে। ভোলা কি চা হবে?”
“আনছি।”
ভোলা চলে গেল।
চন্দন হঠাৎ বলল, রাজীবের দিকে তাকিয়ে। “আপনার বাঁ হাত কি ভাঙা?”
রাজীব নিজের বাঁ হাত দেখল। হাসল। “ছেলেবেলার দুরন্তপনার চিহ্ন। ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে ছাদ থেকে পড়েছিলাম। মাটিতে পড়লে আর বেঁচে থাকতে হত না। গাড়িবারান্দার ছাদে পড়েছিলাম।…আপনার তো নজর আছে।”
“ভাল সেট হয়নি, চোখে পড়ে…।”
“ও ডাক্তার,” কিকিরা বললেন।
“আচ্ছা! তাই বলুন।” বলে কী মনে করে মজার মতন মুখ করে হাসল রাজীব। “আমার বাবা ডাক্তার ছিলেন। শুনেছি তাঁর সাধ ছিল আমায় ডাক্তারি পড়াবেন। সাধ মেটেনি। আমার বছর দশেক বয়েসে বাবা মারা যান। অদ্ভুত ভাবে। ওঁর শখ ছিল বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াবার। শিকার করারও নেশা ছিল। জঙ্গলে বেড়াতে গিয়েই মারা যান।”
