তারাপদ হো হো করে হেসে উঠল। চন্দনও হেসে ফেলল।
সমুদ্রের ধার ঘেঁষে এখনও কিছু লোক হাঁটাচলা করছে। বালির ওপর হাত-পা ছড়িয়ে অলসভাবে বসে আছে কেউ কেউ। দু-তিনটি মহিলা গল্প করতে করতে হাঁটছিলেন। একটি ছেলে তার মেয়ে আর বউকে নিয়ে ফিরে আসছিল। সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে; আকাশ লাল হয়ে আছে পশ্চিম প্রান্তে। সমুদ্রের গর্জন অনেক শান্ত। ঝাউবনের দিকে ছায়া ঘন হয়ে এল।
তারাপদ বলল, “আর কতটা যাবেন, সার?”
“বেশি নয়। এবার ফিরব। ফিরে ওই কাফেটারিয়া, চায়ের দোকান, কাছের হোটেলগুলোয় একবার উঁকি দেব। বাসস্ট্যান্ড, বাজার ঘুরে আমাদের হোটেলে।”
“রাজার খোঁজটা তা হলে …?”
“ঘোরাঘুরির মধ্যেই করতে হবে। হয়তো আশেপাশেই তাকে পেয়ে যাব।”
“কেমন করে?”
“আরে একটা ইয়াং ম্যান কি এই সন্ধে হওয়ার সময় তার ঘরে বসে থাকবে! এদিকেই কোথাও ঘুরছে ফিরছে। এখন কি আর তার হোটেলের কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকার সময়! ঘোরাফেরা করবে না। আর করলে এইদিকেই করবে। দিঘায় লোকজনের মুখ দেখতে হলে অন্য কোথাও গিয়ে লাভ!”
চন্দন বলল, “আর যদি দেখতে না পাই? তা ছাড়া তাকে তো আমরা চিনি না।”
“না চিনলেও আন্দাজ করতে পারব। নন্দবাবু ছেলেটির যে বর্ণনা দিয়েছেন চেহারার গায়ের রং, মুখের ছাঁদ, থুতনির তলায় দাড়ি, মাথার কোঁকড়ানো চুল …!”
তারাপদ বলল, “সার, অমন দাড়ি আজকাল অনেকেই রাখে।”
“রাখতেই পারে। তবু, শুধু দাড়ি নয়, গায়ের রং, মাথার চুল, চোখ। শোনো হে তারাবাবু, চোখে দেখা এক জিনিস আর ঠিকমতন লক্ষ করা অন্য জিনিস। শার্লক হোমস তাঁর শাগরেদকে বলেছিলেন, ওহে বন্ধু তুমি দেখো সবই কিন্তু মন দিয়ে লক্ষ করো না।”
“আপনি সার শার্লক হোমস হবেন নাকি?” ঠাট্টা করে তারাপদ বলল।
“কী যে বলো, উনি হলেন মহারাজ আর আমরা হলাম কলাগাছ!”
চন্দন হেসে ফেলল। “বললেন ভাল। … তা ধরুন আমরা ওই ছেলেটিকে দেখতে পেলাম না।”
“না পেলাম। তখন এখানে ওখানে, হোটেলে বাজারে, ইতিউতি খোঁজ করব, কাছাকাছি কোথায় নতুন হোটেল তৈরির কাজ হচ্ছে। দিঘায় তো একসঙ্গে গণ্ডায় গণ্ডায় হোটেল বাড়ি তৈরি হচ্ছে না। একটু হাতড়ালেই পেয়ে যাব ছোকরাকে।”
“দেখুন যদি পান। আমি কিন্তু সার, পরশু রবিবার দিনই পালাব। হাসপাতাল ফেলে এভাবে থাকতে পারব না এখানে।”
“কাল তো আছ! তার মধ্যেই রাজামশাইকে ধরে ফেলব।”
“ভাল কথা।”
কিকিরারা এবার ফিরতে শুরু করলেন। সূর্য অস্ত গিয়েছে। ছায়া ঘন হয়ে অন্ধকার নেমে এসেছিল। সমুদ্র যেন মনোরম এক বাতাস বয়ে আনছিল, সামান্য এলোমেলো কিন্তু স্নিগ্ধ।
ভালই লাগছিল তারাপদর। কলকাতা শহর থেকে দু-একদিনের জন্যে বাইরে এলে চমৎকার লাগে যে, তাতে সন্দেহ নেই।
“সার?”
“বলো।”
“ওই রাজা ছেলেটির সঙ্গে যদি আপনার দেখা হয়ে যায়, কী বলবেন তাকে? আপনি ওকে চেনেন না, জানেন না।”
কিকিরা আকাশের দিকে তাকালেন। তারা ফুটে উঠছে। আসন্ন সন্ধ্যায় কয়েকটি বক উড়ে যাচ্ছিল ঝাউবনের দিকে। কিকিরা বললেন, “আলাপ করব। আলাপ না জমলে সুর ধরা যায় না,” বলে হাসলেন।
.
০৫.
কিকিরা ঠিকই বলেছিলেন। বাসস্ট্যান্ডের কাছে দোকানে বাজারে খোঁজ করতেই রাজাবা রাজীবদের খবর পাওয়া গেল। নিজেদের হোটেলেও খবর নিলেন, শুনলেন, হ্যাঁ–একটা নতুন হোটেল খুলেছে, জায়গাটা কাছেই। দিঘায় এখন হোটেল ব্যবসার রমরমা, সে যেমনই হোক। আরে দাদা, এক-একটা বড় ছুটি থাকলে এখানে মেলার মতন ভিড় জমে যায়, তখন মাথা গোঁজার জায়গা পায় না মানুষ। কলকাতার এত কাছে, বাসে মাত্র পাঁচ-ছ’ ঘণ্টার জার্নি। লোকে আসবে না কেন! ক’ বছরেই দিঘা কত পালটে গেল, ছড়িয়ে গেল। আরও যাবে।
পরের দিন সকালবেলায় চায়ের পাট মিটিয়ে কিকিরারা বেরিয়ে পড়লেন।
বিশ পঁচিশ মিনিটও হাঁটতে হল না, জায়গাটা পাওয়া গেল। কিছু গাছপালা, সরু রাস্তা, তারপরই টিলার মতন উঁচু একটা স্তূপ–অনেকটা বালিয়াড়ির মতন দেখতে রাজীবদের হোটেলবাড়ি দেখতে পেলেন কিকিরা।
তারাপদ বলল, “সার, ওইটে বলে মনে হচ্ছে।”
কিকিরা মাথা নাড়লেন।
সামান্য এগিয়ে আরও স্পষ্ট হল দৃশ্যটা।
চন্দন বলল, “বাড়ি তো নতুন নয়।”
“সেরকমই মনে হচ্ছে। চলো দেখি।”
কাছাকাছি আসতেই বোঝা গেল, কোনও পুরনো বাড়ি যেন হাত বদলে রাজীবদের দখলে এসেছে। একতলা বাড়ি। বড়জোর মাঝারি মাপের। আশেপাশে বাগান। এক প্রান্তে ছোট আউট হাউস।
বাড়িটায় কাজকর্ম হচ্ছে বোঝা যায়। ইট, বাঁশের খুঁটি, বালি, লোহার ছড় মালমশলা চোখে পড়ে।
কিকিরা হালকাভাবে বললেন, “তারা, আমরা বেড়াতে বেরিয়েছি বুঝলে! কলকাতা পার্টি …। এই একটু ঘুরেফিরে দেখছি। আন্ডারস্ট্যান্ড। নো একোয়ারি, নাথিং।”
“বুঝলাম।”
সামান্য চড়াই। বেড়ানোর ভঙ্গিতে তিনজনে বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালেন। দাঁড়িয়ে অবাক। উঁচু এই জায়গাটা যেন সত্যিই বালিয়াড়ি, বিশ পঁচিশ গজ তফাতেই উতরাই, তারপর বালি, গোটা দুয়েক ঝাউগাছ, মাটি তেমন চোখে পড়ে না। আর সামনেই সমুদ্র। যেন এখান থেকে হাত বাড়িয়েই সমুদ্র ছোঁয়া যায়। অবশ্য ওটা চোখের ভ্রম। সমুদ্রতট অন্তত শ’খানেক গজ তফাতে। জায়গাটা সত্যিই সুন্দর। তারিফ করতে হয়।
আড়াল থেকে কে যেন বেরিয়ে এল। বাড়িটার বারান্দার দিকে তাকালেন কিকিরা।
