“আনতে পারেন। তবে তাতে কি লাভ হবে?”
“না, লাভ আর কী হবে! বরং বাইরের বিপদ ঘরে টেনে আনা হতে পারে।”
“আপনার কাঠকুটো ফার্নিচারের দোকান! হঠাৎ যদি কোনওভাবে আগুন লেগে যায়, দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে। ইনসিওর করানো নেই?”
আচমকা এই প্রশ্নে নন্দবাবু যেন থতমত খেয়ে গেলেন। পরে বললেন, “আছে। আজকাল কে আর ইনসিওর না করায়! তবে কী জানেন, যা যায় তা তো আর ফিরে আসে না। ব্যবসা দোকান- তাও দু’পুরুষের, পুড়ে ছাই হয়ে গেল, বদলে কিছু টাকা পেলাম, তাতে কি আর মনে শান্তি আসে!”
কিকিরা প্রায় মুখ ফসকে বলতে যাচ্ছিলেন, ‘ইনসিওর থেকে কী রকম টাকা পাওয়া যাবে!’ বললেন না কথাটা।
ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে কিকিরা বললেন, “আজ তো উঠতে হয়, নন্দবাবু। পরে আবার খোঁজ করে যাব।”
“রায়মশাই একটা কথা।”
“বলুন।”
“আপনাকে আমি একবার দেখা করতে অনুরোধ করেছিলাম দু একটা কারণে।”
“সঙ্কোচের কী আছে, বলুন!”
“আপনি আমায় পরামর্শ দিন কী করব। সেদিন আপনার সঙ্গে ওই ভাবে আচমকা দেখা না হলে আমি কি আপনাকে খুঁজে পেতাম? না, আমার মাথায় আসত! ভাগ্য ভাল সেদিন আপনাকে পেয়ে গিয়েছিলাম। … আমি এখন কী করব বলুন তো?”
“কী করতে চান?”
“আমার উকিলকে বলে ছেলেকে সঙ্গে দিয়ে থানায় পাঠাব? একটা ডায়েরি করে আসবে?”
“না করাই ভাল আপাতত। সেদিন আপনি থানা পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এসেছিলেন। আবার এখন আপনি সন্দেহ করছেন সেই একই ছোকরা আপনাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে মারবার চেষ্টা করেছে। সন্দেহ তো প্রমাণ নয়। অযথা খুঁচিয়ে ঘা করবেন কেন! আরও একটু দেখুন।”
“তা হলে আপনি দয়া করে যদি আমার তরফে একটু খোঁজখবর করেন–!”
কিকিরা হাসলেন। “আচ্ছা দেখি। আমার বিদ্যে আর কতটুকু! তবু দেখব, আপনি যখন বলছেন।” বলে উঠে দাঁড়ালেন। তারাপদও উঠে পড়ল।
.
০৪.
চন্দনের ইচ্ছে ছিল না, গরজও নয়; তবে কিকিরার পাল্লায় পড়ে তাকে আসতে হল। তারাপদর অবশ্য অতটা অনিচ্ছে ছিল না। দিঘায় তারা আগেও এসেছে, সে আর চন্দন, সঙ্গে চন্দনের এক বন্ধু পবিত্র। কিকিরা সঙ্গে ছিলেন না তখন। আগেরবার তারা এসেছিল শীতকালে। বড়দিনের ছুটির পর। দিঘায় তখন ভিড় নেই, অনেকটাই ফাঁকা। নয়তো আজকাল ছুটিছাটার সময় দিঘা মানেই রথের মেলা।
এবার গরমের সময়, চৈত্র মাসে দিঘায় এসে তারাপদরা দেখল, লোকজন কম। কারণ কাছাকাছি কোনও ছুটি নেই। তার ওপর মাত্র দিন দুই আগে প্রচণ্ড এক কালবৈশাখীতে ইলেকট্রিক লাইনের ক্ষতি হয়েছে খুব। আলো-পাখা, মায় হোটেলে জলের ব্যবস্থা ঠিকমতন করা যাচ্ছে না। যারা বেড়াতে আসে হুটহাট তারা হয়তো এসব খবর রাখে। ফলে আপাতত লোক কম। ঝড় জল থেমে যাওয়ার পর দিঘা এখন শান্ত। ইলেকট্রিক লাইনের মেরামতিও প্রায় শেষ।
কিকিরারা এসেছিলেন সরকারি বাসে। সকালের বাস। দিঘা পৌঁছতে বেলা গড়িয়ে প্রায় দুপুর। রোদে তাপে, গরম দমকা হাওয়ায় কষ্ট হওয়ারই কথা। তবে বিকেলের পর আরামই লাগছিল।
চন্দন দিঘার সমুদ্রকে কোনওদিনই পাত্তা দেয় না। বলে, ‘ধ্যুত এই কি সমুদ্র! পুরী অনেক ভাল। জলের চেহারাই আলাদা। দিঘার সমুদ্রের জল দেখলে খালের জল মনে হয়।
চন্দন যাই বলুক, খানিকটা পড়ন্ত বিকেলে কিকিরারা তিনজনে টহল দিতে বেরোলেন। সমুদ্রের ধার ঘেঁষে বালির ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কিকিরা হঠাৎ বললেন, “চাঁদু ডাক্তার, তুমি কপালকুণ্ডলা পড়েছ?”
চন্দন অবাক হয়ে বলল, “মানে! আপনি আমাকে গবেট মনে করেন নাকি? আশ্চর্য!”
“আরে না, তুমি যদি গবেট হবে তবে ডাক্তারি বিদ্যেটা শিখলে কেমন করে! এমনি বললাম। বঙ্কিম এদিকে থাকার সময় কপালকুণ্ডলা লিখেছিলেন বলে শুনেছি। কাপালিককে মনে আছে?”
“আছে। আপনি কি কাপালিক খুঁজতে এসেছেন?”
“নো সার, আমরা এসেছি শ্রীমান রাজা–ওরফে রাজীবচন্দ্রকে খুঁজতে।”
“ও কি এখানে আছে?” তারাপদ বলল।
“নন্দবাবু খোঁজখবর নিয়ে বলেছেন, কলকাতায় ছোকরা নেই, দিঘায় চলে এসেছে।”
“পাত্তা করতে পারবেন?”
“তোমাদের তো আগেই বলেছি, এদিকে কোথায় হোটেল তৈরি হচ্ছে খোঁজ করো, আর নন্দবাবুর বর্ণনা মতন একটি ছেলের চেহারা খুঁজে পেলে কাজটা অসাধ্য নয়।”
চন্দন বলল, “তা হলে সমুদ্রের ধারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেন! হোটেল ঘরবাড়ি যেদিকে, সেদিকে হেঁটে বেড়ালেই হত।”
কিকিরা হেসে বললেন, “একটু হাওয়া খেয়ে নিচ্ছি। বিশুদ্ধ বাতাস। তাতে মগজ সাফ হবে। তা ছাড়া উদ্যম বাড়বে।”
“উদ্যম!” চন্দন ঠাট্টা করে বলল।
কিকিরা একই ভাবে হেসে বললেন, “মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণ বারবার পাণ্ডবদের বলেছেন, উদ্যম আর ধৈর্য না থাকলে শত্রুকে জয় করা যায় না। আরে বাবা, আমাদের সাদা বাংলায় কী বলে? উদ্যম বিনে কার পুরে মনোরথ।”
চন্দন বিরক্ত হয়ে বলল, “মহাভারত রাখুন।”
“কেন! মহাভারতে কতরকম কৌশল-শিক্ষা আছে জানো? বড় বড় বীর মহাবীরকে কেমন ছলচাতুরি করে ফিনিশ করছে দ্যাখোনি!” বলেই কিকিরা গম্ভীর গলায় বললেন, “বলং বলো, কৌশলঃ মহাবলং …!”
তারাপদ জোরে হেসে উঠল। “দারুণ স্যাংস্কৃট, সার।”
“মাই স্যাংস্কৃট, সার। আমি পরোয়া করে স্যাংস্কৃট বলি না, আমাদের সময়ে স্কুলে সংস্কৃত পড়ানো হত। পরীক্ষায় আমি কোনওবার পনেরো কুড়ির বেশি নম্বর পাইনি। পণ্ডিতমশাই আমার নাম রেখেছিলেন ব্যাকরণ কৌতুকী’, মানে ‘ব্যাকরণ কৌমুদী’-র ধরনে আর কী!”
