“যে আপনাকে ধাক্কা মারল তাকে আপনি দেখেছেন?”
“ওই দু’পলকের জন্যে।”
“লোকটা যে রাজীব আপনি চিনলেন কেমন করে?”
“আমি তার মুখ দেখেছি।”
তারাপদ বলল, “মাথায় হেলমেট ছিল না?”
“ছিল।”
“হেলমেট দু’ধরনের হয়। কোনও কোনও হেলমেটের মুখের সামনে আড়াল থাকে–ফাইবার গ্লাসের। আলো যেখানে কম, সেখানে আপনি কেমন করে মুখ দেখবেন ড্রাইভারের?”
“মুখের সামনে আড়াল ছিল না। আমি স্পষ্ট দেখেছি–সেই ছোকরা। ধাক্কা মারার পর আমার দিকে তাকাল, কী একটা বলল–তারপর চলে গেল।”
“কাছাকাছি তখন কেউ ছিল না গলিতে, ধরতে পারল না?”
“না। ফাঁকা ছিল। একটু পরে সত্যবাবুকে দেখলাম। তিনি আমায় রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলেন। আমি যতবার উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছিলাম, পারছিলাম না। মনে হল, পায়ে জোরই পাচ্ছি না। সত্যবাবুই তখন লোকজন ডেকে ধরাধরি করে আমায় বাড়ি পৌঁছে দিলেন।”
কিকিরা মন দিয়ে নন্দবাবুর কথা শুনছিলেন। সামান্য সময় চুপচাপ থাকার পর বললেন, “আপনার চোখের ভুল হয়নি তো?”
“মনে তো হয় না। ওই ছোকরার মুখ ভুল হওয়ার কথা নয়।”
“কেমন দেখতে?”
“ধবধবে ফরসা। মুখের আদল লম্বাটে। খাড়া নাক। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। থুতনির কাছে দাড়ি গোঁফও রেখেছে। গাল পরিষ্কার। স্টাইলের দাড়ি, মশাই।”
কিকিরা কী বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই ভেতর থেকে চা মিষ্টি এল।
“এত কেন? শুধু চা হলেই হত,” কিকিরা বললেন।
“বাড়িতে এসেছেন শুধু চা খাবেন! তা ছাড়া এই ব্যবস্থা আমার গিন্নির।”
“ছেলে কোথায়?”
“কী একটা পড়তে গিয়েছে। আমি ওসব বুঝি না। পরীক্ষা দেবে চাকরির
“ও!… তা নন্দবাবু, বিশ্বাসবাড়িতে গিয়ে সুবর্ণকান্তিবাবুর সঙ্গে যখন কথাবার্তা বলছিলেন তখন আপনার কী মনে হল? মানে নাতি সম্পর্কে দাদুর মনোভাব কেমন দেখলেন? বৃদ্ধ ভদ্রলোক কি নাতির ওপর বিরক্ত? পছন্দ করেন না তাকে? না কি মনে হল, নাতিকে প্রশ্রয় দেন?”
নন্দবাবু বালিশটা কোনওক্রমে টেনে নিলেন ভর দেওয়ার জন্যে। বললেন, “দেখুন, আমি ঠিক বুঝলাম না। বিরক্ত হয়েছেন যে তাও বোঝা গেল না। তবে ওর ওইভাবে দোকানে এসে শাসানো তার পছন্দ হয়নি। বললেন, ও ফিরে এলে কথা বলবেন।”
“দিঘার হোটেল তৈরি কতদিন ধরে চলছে?”
“আমি সেভাবে জানতে চাইনি। কথায় কথায় মনে হল, দু-তিন মাস তো হবেই।”
“হোটেলের নাম ঠিক হয়েছে?”
“জানি না।”
চা মিষ্টি খেতে খেতে তারাপদ বলল, “আপনার দোকান এখন দেখছে কে?”
“আমার কর্মচারীরা। ছেলে মাঝে একদিন গিয়েছিল।”
“দোকানে আর ওই ছোকরা যায়নি।”
“না।”
কিকিরা হঠাৎ বললেন, “নন্দবাবু, আপনার কী মনে হয়? রাজা ওই আলমারি ফেরত পাওয়ার জন্যে এত ব্যস্ত কেন? কী আছে ওর মধ্যে?”
“আমিও তো তাই ভাবি! কী আছে? পুরনো কাঠের আলমারি, দেখতে সুন্দর– সবই ঠিক। তা এভাবে কত পুরনো বনেদি জিনিস একসময় বাজারে বিক্রি হয়ে যায়। দু’-এক পুরুষের জিনিস তার বংশধররা বিক্রি করে দেয়। বেশিরভাগই টাকার অভাবে বেচে দেয়। কাঠ তো সামান্য জিনিস মশাই, কত মণিমুক্তো, রুপোর বাসন, বিদেশি কাঁচের বাহারি জিনিস, মায় মার্বেলের মূর্তি বিক্রির কি শেষ আছে! আমি একবার একটা লাল পাথরের পাচা কিনেছিলাম। রেয়ার জিনিস।”
“লাল প্যাঁচা?” তারাপদ অবাক হয়ে বলল।
“লাল কেন, সাদা, কালো, মেটে রঙের প্যাচাও পাওয়া যায়। এক এক দেশের কারিগরের তৈরি। শখের ব্যাপার হয়তো, তবে শুনেছি কোনও কোনও দেশে পাচা নাকি বড় পয়মন্ত জিনিস। আমাদের দেশেই তো আমরা পাচাকে লক্ষ্মীর বাহন মনে করি।”
কিকিরা বললেন, “পাচা বিক্রি করে দিয়েছেন?”
“কবে! সে কি আজকের কথা! এক সাহেব তিন হাজার টাকায় কিনে নিয়েছিলেন।”
কিকিরা কী যেন ভাবলেন। চায়ে চুমুক দিয়ে অন্যমনস্কভাবে ঘরের চারদিকে তাকালেন একবার। জানলার দিকে দেয়ালে শ্রীচৈতন্যের পট, অন্যপাশে দেয়াল ঘড়ি। নন্দবাবুর মা-বাবার ফোটোও রয়েছে, বাঁধানো।
“আলমারিটা কেনার পর আপনি ভেতরটা ভাল করে দেখেছিলেন?” কিকিরা বললেন হঠাৎ।
নন্দবাবু সামান্য অবাক হলেন। “কী দেখব! আমি মশাই যখন আলমারিটা কিনি, তখন তো ওটা ফাঁকা! দোকানে নিয়ে আসার পর আলাদাভাবে কিছু দেখিনি। ওই একবার ওপরের ড্রয়ার দুটো টেনে দেখেছিলাম। ফাঁকা। ড্রয়ার দুটোর মাঝখানে যে ছোট ছোট খোপগুলো আপনি সেদিন দেখলেন, সেগুলোও ফঁকা। ধুলো আর দু-চারটে নেপথলিনের শুকনো গুলি ছাড়া কিছুই দেখিনি। তা ছাড়া দোকানে এনে রাখার পর তো ও নিয়ে মাথা ঘামাইনি। দোকানের কর্মচারীরা অন্য কাজ নিয়ে ব্যস্ত। আলমারিটা পড়েই ছিল। মাত্র ক’দিন আগে কেনা। পরে যখন সময় পাওয়া যাবে তখন ওতে হাত পড়বে। আগেভাগে আর কত খুঁটিয়ে দেখব, বলুন?”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। কথাটা ঠিকই। একটা পুরনো আসবাব দোকানে তুলে এনে কে আর সঙ্গে সঙ্গে সেটা নিয়ে মাথা ঘামাতে বসে! এমন তো নয় যে, আজ যা এনেছি–কাল পরশুই তা বিক্রি হয়ে যাবে বলে তাড়া থাকবে সারাইসুরাই রং-পালিশের। একটা খদ্দের জুটতে কত মাস লাগবে কে জানে, কাজেই হুড়োহুড়ি করার দরকার কোথায়?
“আলমারিটা এখনও দোকানেই আছে?” কিকিরা জিজ্ঞেস করলেন।
“হ্যাঁ। এই বাড়ির নীচের তলায় আমার একটা গোডাউন আছে। জায়গা যে বেশি তা নয়, সেখানে ভাঙাচোরা জিনিস পড়ে আছে ক’টা। ভাবছিলাম আলমারিটা সরিয়ে আনব কি না!”
