“যাই। নিজের চোখে দেখে আসি একবার। ঠিক কী ঘটেছে উনি ছাড়া আর কে বলতে পারবে। তার মানে আমি কী বলতে চাইছি বুঝতে পারছ? আমি বলতে চাইছি, নন্দবাবু বিশ্বাসবাড়ির ছোটকর্তার সঙ্গে দেখা করার পর কী কথাবার্তা হয়েছে, তারপর কী ঘটেছে, কেনই বা তাঁকে মোটর সাইকেলের ধাক্কা খেতে হল, সত্যি সত্যি সেই ছোকরা তাঁকে ধাক্কা মেরেছে কি না জানা দরকার।”
তারাপদ ফিরে এল। বলল, “সার, আপনি একটা ফ্রিজ কিনতে পারেন না?”
“কেন?”
“কেন আবার কি! ঠাণ্ডা জল খেতে পারতাম।”
“আমার আদ্যিকালের আইস বক্সে রাখা জলের বোতল ঠাণ্ডা হয় না?”
“হয়, তবে ফ্রিজ বলে কথা…”
“তোমাদের দেখছি পুরনো জিনিসে মন ওঠে না। আরে ফ্রিজ তো হালের জিনিস, আগে সাহেবসুবো থেকে শুরু করে বড়লোকের বাড়িতেও ওই আইস বক্সই থাকত। বুঝলে! এখনও তুমি চাঁদনিতে গেলে আইস বক্স কিনতে পাবে। আমার বাপু ওই বরফ বাক্সেই চলে যায়। ফ্রিজ নিয়ে আমি কী করব? দিব্যি আমার চলে যাচ্ছে।”
“চলুক তা হলে! আমরা আজ উঠি।”
“এসো। কাল তা হলে তুমি যাচ্ছ আমার সঙ্গে?”
তারাপদ তেমন উৎসাহ দেখাল না। “আপনি বললে যেতেই হয়। তবে আলমারির ব্যাপারটায় আমি ইন্টারেস্ট পাচ্ছি না।”
“দেখাই যাক না নন্দবাবু কী বলেন!”
চন্দনরা উঠে পড়ল।
.
০৩.
নন্দবাবু বিছানায় শুয়ে ছিলেন। গায়ে ফতুয়া, সামনের দিকটা শার্ট-পাঞ্জাবি মতন বোতাম লাগানো। পরনে ধুতি, দু’-পাট করে লুঙ্গির মতন জড়ানো রয়েছে কোমরে। বাঁ হাতে প্লাস্টার, টাটকা। পায়ের দিকেও মোটা ব্যান্ডেজ, কপালে একপাশে কালশিটে পড়েছে, তার ওপর কোনও ওষুধ লাগানো। গালেও কালচে দাগ। ভদ্রলোককে বেশ কাতর দেখাচ্ছিল। যন্ত্রণায় চোখমুখ শুকনো।
কিকিরাকে দেখে যেন আশ্বস্ত হলেন। “আসুন রায়বাবু।” বলে তারাপদর দিকে তাকালেন। “এঁকে তো চিনি না।”
কিকিরা পরিচয় করিয়ে দিলেন। “তারাপদ। আমার শাগরেদ, চেলাও বলতে পারেন।”
“বসুন আপনারা।”
বিছানার কাছাকাছি চেয়ার ছিল। টেনে নিয়ে বসলেন কিকিরা, ইশারায় বসতে বললেন তারাপদকে।
“এই অবস্থা হল কবে?” কিকিরা বললেন।
“পরশুর আগের দিন। সন্ধেবেলায়। একটা দিন ডাক্তার বদ্যি করে কাটল। কাল সকালে এক্সরে করেছি। বিকেলে প্লাস্টার। হাতের হাড় দু’-টুকরো হয়ে গিয়েছে। এই রিস্টের ওপরে। পায়ের হাড় ভাঙেনি, তবে মচকে গিয়েছে। মাথায় বেশ লেগেছে মশাই, রক্ষে যে মারাত্মক কিছু হয়নি। সারা পিঠ কোমরে যা ব্যথা…।”
“তা তো হবেই। বয়েস হচ্ছে এখন, অল্প লাগলেও তার জের সহজে ছাড়তে চায় না।”
নন্দবাবু কাকে যেন ডাকলেন। ঘরের ব্যবস্থা দেখে বোঝা যায়, কিকিরা আসবেন জেনে আগেভাগেই সব গোছগাছ করে রাখা হয়েছিল।
বাড়ির কোনও কাজের লোক মুখ বাড়াল। নন্দবাবু চা জল দিতে বললেন।
কিকিরা বললেন, “ব্যাপারটা আগে সব শুনে নিই।…আপনি যা যা ঘটেছে আমায় বলুন।”
নন্দবাবু বালিশে হেলান দিয়ে যতটা পারেন গুছিয়ে বসলেন।
তারাপদ ঘরটা দেখছিল। পুরনো বাড়ির ঘর যেমন হয়, মাঝারি মাপের, মাথার ছাদে কড়িবরগা, দেয়ালের রং সাদা, জানলায় কাঠের পাল্লা, লোহার গরাদ। ঘরের মধ্যে আসবাবপত্র সবই পুরনো ধাঁচের, কিন্তু দামি এবং সুন্দর। দেখে মনে হল, এই ঘরেই নন্দবাবু থাকেন।
নন্দবাবু বললেন কিকিরার দিকে তাকিয়ে, “আপনার কথামতন আমি পরের দিনই সুবর্ণবাবুর কাছে গেলাম। বললাম তাঁকে সব কথা শুনে উনি ভীষণ অবাক হলেন। বললেন, আমি তো কিছু জানি না। রাজা আমায় একটা কথাও বলেনি।”
“রাজা কে?”
“ওঁর নাতি। ডাকনাম রাজা। ভাল নাম রাজীব। রাজীব নন্দী।”
“ও! সুবর্ণবাবুরা না বিশ্বাস?”
“মেয়ের ছেলে। গোত্র বদল হয়েছে।”
“হ্যাঁ, তা তো হবেই। আর কী বললেন উনি?”
“বললেন, আলমারি ফেরত দিতে হবে না। ও-বাড়িতে যা জিনিসপত্র আছে সবেরই মালিকানা তাঁর। তিনি নিজেই বেচে দিয়েছেন আলমারি। অন্যের তা নিয়ে কথা বলার অধিকার নেই। আগেও তিনি এটা-ওটা বেচে দিয়েছেন। কই তা নিয়ে তো কোনও ঝাট হয়নি। হঠাৎ এটা নিয়ে কেন হবে–তিনি বুঝতে পারছেন না।”
কিকিরা কী ভেবে বললেন, “উনি কি বললেন, নাতির সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলবেন।”
“হ্যাঁ, বললেন–রাজা এখন দিঘায়, চার-পাঁচদিন পরে ফিরবে, তখন কথা বলবেন।”
“তার মানে নাতি ফিরে এলে তিনি নিশ্চয় বলেছেন কথাটা।”
“বলার কথা।”
“রাজা দিঘায় কী করে–শুনেছেন।”
“শুনেছি। এক বন্ধুর সঙ্গে হোটেলের ব্যবসা করবে বলে আদাজল খেয়ে লেগেছে। এখনও হোটেল চালু হয়নি। কাজকর্ম চলছে। মাস দুই আরও হয়তো লাগবে।”
তারাপদ চুপচাপ শুনছিল। দেখছিল নন্দবাবুকে। ভদ্রলোককে একেবারে সাদামাটা নিরীহ বলেই মনে হয়। তবে ব্যবসাদার মানুষ, চোখেমুখে এক ধরনের বুদ্ধির ছাপ তো থাকবেই।
কিকিরা বললেন, “তারপর এই ঘটনা…! আপনি বাইকের ধাক্কা খেলেন?”
“হ্যাঁ। আমি দোকান বন্ধর পর একটা কাজে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধে। একটু আগে হালকা একটা ঝড় উঠেছিল। কালবৈশাখী নয়, ধুলোর ঝড়। থেমেও গেল। আমি বাড়ি ফিরছি। আমাদের পাড়ার কর্পোরেশনের প্রাইমারি স্কুলটার আগে একটা আধমরা পাকুড়গাছ আছে। পাশেই মিল্কবুথ। জায়গাটা নিরিবিলি, আলোও কম। হঠাৎ একটা মোটরসাইকেল এসে আমায় পাশ থেকে ধাক্কা মারল। আমি টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেলাম রাস্তায়।”
