চন্দন বলল, “আসলে নন্দবাবু বোধ হয় কোনও কারণে প্যানিক হয়ে রয়েছেন।”
কিকিরা বললেন, “তারও তো একটা কারণ থাকবে, চাঁদু। নন্দবাবু কচি ছেলে নন। প্রবীণ মানুষ। ব্যবসাও করছেন কতকাল। পুরনো ফার্নিচার কেনা আর বেচা তাঁর কাছে নতুন জিনিস নয়। এতকাল কোনও ঝামেলা হয়েছে বলে শুনিনি। বলেনওনি সেদিন। হঠাৎ এই বিশ্বাসবাড়ির আলমারি নিয়ে কেন তিনি ঝামেলায় পড়বেন! ভয় পাবেন! তোমরা ভুলে যেও না, নন্দবাবুর দোকান যথেষ্ট পুরনো। ওই এলাকাটা তাঁর নিজের এলাকা। ওখানে সবাই তাঁর চেনা, হাঁকডাক করলে দশজন বেরিয়ে পড়বে। তবু একটা ছোকরা কোন সাহসে গিয়ে তাঁকে শাসিয়ে আসতে পারে।” বলে কিকিরা থামলেন কয়েক মুহূর্ত। আবার বললেন, “নন্দবাবুর পাড়ার কাছাকাছি গিয়ে তাঁকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ধক তার হল কেমন করে?”
“আপনি নন্দবাবুর ধারণার কথা ভাবছেন। ওটা সিম্পল অ্যাক্সিডেন্ট কেস হতে পারে। অন্য কেউ ধাক্কা মেরেছে হয়তো।”
“দেখি। কাল একবার নন্দবাবুর কাছে যাই। দেখে আসি ভদ্রলোককে। তখন জানতে পারব।”
তারাপদ বলল, “আপনি যান, দয়া করে আমাদের লেজুড় করবেন না, সার। আপনার বন্ধু, আপনি…”
তারাপদকে থামিয়ে দিয়ে কিকিরা বললেন, “লেজুড় কাকে বলে তুমি তাই জানো না। আমার লেজের সঙ্গে তোমায় জুড়ব কেন! তোমরা হলে আমার শাগরেদ। অ্যান্ড পার্টনার।…আরে বাবা, বিকেলে একটু যাবে তাতে আপত্তি কীসের।…শোনো, তারাবাবু–এই সংসার বড় বিচিত্র জায়গা, মিস্টিরিয়াস প্লেস; লোকজনের সঙ্গে যত মিশবে, চোখ খুলে দেখবে, ততই তোমার জ্ঞানচক্ষু…”
“থাক সার, আর লেকচার শোনাবেন না আপনার।”তারাপদ বলল কিকিরাকে বাধা দিয়ে, “আপনার পাল্লায় পড়ে এরই মধ্যে আমাদের জ্ঞানচক্ষু যথেষ্ট ফুটেছে। আরও বেশি ফুটলে জ্ঞানী বুদ্ধ হয়ে যাব।”
কিকিরা হাসলেন। “বুদ্ধ তো একটাই হয় হে, তবে বুন্ধু হয় হাজারে হাজারে। শোনো বাবা, আমার সার কথা হল–নন্দবাবুই হোক, বিশ্বাসবাড়ির ছোটকর্তা সুবর্ণকান্তি হোক কিংবা তাঁর নাতি সেই ছোকরাই হোক–কে যে কাকে বুদ্ধ বানাতে চাইছে–একবার দেখতে চাই। বুঝলে?”
চন্দন ঠাট্টার গলায় বলল, “এবার তা হলে আপনার কেসটা হবে আলমারি রহস্য।”
“কোন রহস্য বলতে পারছি না। আলমারিটা অবশ্যই রহস্যের লিস্টিতে পয়লা নম্বরে জায়গা পাবে।”
“পাবে বলছেন–কিন্তু কেন পাবে, সার? পুরনো একটা কাঠের ফার্নিচার, তার মধ্যে এমন কী রহস্য থাকতে পারে!”
কিকিরা মাথার চুল ঘাঁটতে ঘাঁটতে বললেন, “কথাটা ঠিকই। তবে একবার ভেবে দেখো, এক ভদ্রলোক স্বেচ্ছায়, টাকা নিয়ে, তাঁদের বাড়ির একটা আলমারি বেচে দিয়েছেন। সেটা কিনেছেন নন্দবাবু–যাঁর ব্যবসাই হল পুরনো আসবাব কেনা। এই পর্যন্ত ঠিক আছে। নো প্রবলেম, নো রহস্য! অথচ তারপরই এক রাফ-টাইপের ছোকরা, যিনি আলমারি বেচেছেন তাঁর নাতি এসে নন্দবাবুকে শাসিয়ে গেল, আলমারিটা ফেরত দিয়ে আসতে। না দিলে নন্দবাবু বিপদে পড়বেন। কেন? তার এমন ব্যবহার করার কারণটা কী?”
তারাপদ বলল, “সার, নাতির হয়তো মনে হয়েছে, নিজেদের ঘরের জিনিস ওইভাবে বেচে দেওয়াটা উচিত হয়নি। ওদের আভিজাত্যে লাগে। সেন্টিমেন্ট…।”
“বেশ তো। সেন্টিমেন্টে লাগতেই পারে। তা বলে সে নন্দবাবুর দোকানে এসে বয়স্ক এক ভদ্রলোককে শাসিয়ে যাবে? কী বলছ তুমি? বলার আর ধরন ছিল না! ভদ্রজনের মতন বুঝিয়ে বললেই পারত।”
তারাপদ চুপ। জবাব দিতে পারল না।
কিকিরা বললেন, “তা সে যাই হোক, নন্দবাবু আবার যখন বিশ্বাসবাড়ির ছোটকর্তার কাছে সবকিছু জানাতে গেলেন, তখন ছোটকর্তা কানেই তুললেন না কথাটা। শ্রীকুমার কী বলে গেল, নিজেরাই শুনলে। উনি নাকি বলেছেন, নিজের জিনিস আপন মরজিতে বেচেছেন, কারও কিছু বলার থাকতে পারে না।…এবার বলো নন্দবাবুর দোষটা কোথায়?”
চন্দন মাথা নাড়ল। না, নন্দবাবুর দোষ নেই কোথাও।
“তা হলে সেই ছোকরা আবার কেন নন্দবাবুকে ওভাবে জখম করার চেষ্টা করবে?”
“হ্যাঁ, যদি অবশ্য ওই ছোকরাই ধাক্কা মেরে থাকে?” চন্দন বলল।
“সেটা কাল বুঝতে পারব; নন্দবাবুর সঙ্গে দেখা হলে।”
তারাপদ মুখ মুছে নিল। পাখা চলছে ঠিকই, তবে গুমোট লাগছে। ঘাম হচ্ছিল। জলতেষ্টা পাচ্ছিল তার। উঠে পড়ল। ভেতরে গিয়ে সে খেয়ে আসবে। ২৪৪
যেতে যেতে বলল, “আলমারিটা আপনি দেখেছেন কিকিরা। দেখে কি মনে হয়, ওর মধ্যে কোনও রহস্য থাকতে পারে?”
“বাইরে থেকে দেখেছি। খুবই সুন্দর। ভেতরে–মানে আলমারির ভেতরে, কিংবা জিনিসটাকে জড়িয়ে কী রহস্য আছে–কেমন করে বলব!”
তারাপদ ভেতরে চলে গেল।
চন্দন বোধ হয়, ব্যাপারটার জটিলতা বুঝতে পারছিল খানিক। বলল, “ছোকরার নাম কী? কী করে?”
“নামটাম জানি না। কী করে বলতে পারব না। নন্দবাবু যা বলেছেন তার থেকে মনে হল, ছোকরা দিঘায় কারও সঙ্গে মিলেমিশে বা একলা একটা হোটেল খোলার চেষ্টায় আছে। আজকাল প্রায়ই দিঘায় গিয়ে থাকে, কাজকর্ম দেখে।”
“বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক কেমন?”
“জানি না। দাদুকে চিনি না, নাতিকেও নয়। কেমন করে বলব সম্পর্ক কেমন!” চন্দন একবার নিজের হাতঘড়ি দেখল। আটটা বাজে প্রায়। এবার উঠে পড়তে হবে। “আপনি তা হলে কাল নন্দবাবুর বাড়ি যাচ্ছেন?”
