“সিগারেট তো সেদিনের বাচ্চা! ছিলিম-সাজা হুঁকোর দোকানেও জাত গোত্র ছিল, বামুন হুঁকো, কায়েত হুঁকো–যার যেটি দরকার টেনে নিত। সিগারেট ক’জন চোখে দেখেছে! আর লেমোনেড জন্মেছে …” বলতে বলতে থেমে গেলেন কিকিরা; কে যেন এসেছে, বগলা দরজা খুলে কথা বলছিল।
কিকিরা ঘরের দরজার দিকে তাকালেন।
বগলা এল। “একজন দেখা করতে এসেছে।”
“কে? নিয়ে এসো।”
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে যে-লোকটি এল কিকিরা তাকে দেখে অবাক। ভাবতেই পারেননি এমন কাউকে দেখবেন! “তুমি নন্দবাবুর দোকানের লোক না! কী নাম যেন, শ্রীকুমার?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি শ্রীকুমার।”
“তা হঠাৎ এখানে?”
“বাবু পাঠিয়েছেন।”
“নন্দবাবু! কী ব্যাপার?”
শ্রীকুমার খানিকটা আড়ষ্ট, চোখেমুখে উদ্বেগও রয়েছে। বলল, “আমাদের বাবু ভীষণ জখম হয়ে পড়ে আছেন।”
“সে কী!” কিকিরা যেন চমকে উঠে সোজা হয়ে বসলেন চেয়ারে। “জখম! নন্দবাবু জখম হয়ে পড়ে আছেন? কোথায়? হাসপাতালে?”
“না, বাড়িতেই আছেন। হাসপাতালে পাঠাবার অবস্থাই হয়েছিল। ভাগ্য ভাল হাসপাতালে পাঠাতে হয়নি, বাড়িতেই বিছানায় পড়ে আছেন।”
কিকিরা একবার তারাপদদের মুখের দিকে তাকালেন। তারপর চোখ সরিয়ে শ্রীকুমারকে দেখতে দেখতে বললেন, “তুমি বোসো। ওই টুলটা টেনে নাও। কী হয়েছে বলো তো?”
শ্রীকুমার বসল না। মাথায় লম্বা, রোগাটে গড়ন তার। নাক লম্বা, চোখ গর্তে ঢোকা। গালে অল্প দাড়ি। পরনে ধুতি, গায়ে খয়েরি রঙের পাঞ্জাবি। মাথার চুল পাতলা। বয়েস চল্লিশের ওপর।
শ্রীকুমার বলল, “আপনি আমাদের দোকানে গিয়েছিলেন–আট-দশ দিন আগে–!”
হিসেব করে কিকিরা বললেন, “হ্যাঁ, এই তো কাল শুক্রবারের আগের শুক্রবার, আজ শনিবার। ন’-দশদিনই হল।”
“আপনি যেদিন গেলেন, তার পরের দিন বাবু হাতিবাগানে ওই বিশ্বাসবাবুদের বাড়িতে বুড়োকর্তার সঙ্গে দেখা করতে যান। তাঁকে সব জানাতে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে বললেন, বুড়োকর্তা তেমনভাবে কানই দিলেন না কথাটায়। বললেন, তাঁর আলমারি তিনি বেচে দিয়েছেন নিজের মরজিতে; কারও কিছু বলার থাকতে পারে না। … আমাদের বাবু তবু বললেন, কিন্তু আপনার নাতি যে আমায় শাসিয়ে এসেছে। বিশ্বাসবাড়ির বুড়োকর্তা বাবুকে বললেন, এখন তো ও নেই, দিঘা থেকে ফিরে আসুক–আমি বলব। ছেলেটা যে জেদি আমি জানি; তবে গুণ্ডা বদমাশ ধরনের নয়। কেন যে ও আপনার দোকানে গিয়ে শাসিয়ে এল–তাও বুঝতে পারছি না। আসুক ও, জিজ্ঞেস করব।” বলে শ্রীকুমার চুপ করে গেল।
কিকিরা একটু ভাবলেন। “নন্দবাবুর ঠিক হয়েছে কী? কবে? কোথায়?”
“আজ্ঞে পরশুদিন। সন্ধেবেলায়, সাড়ে সাতটা নাগাদ বাবু একটা কাজ সেরে বাড়ি ফিরছিলেন। পাড়ার কাছাকাছি, মল্লিক লেনের মুখে একটা লোক আচমকা পাশের গলি থেকে মোটরবাইক নিয়ে বেরিয়ে এসে বাবুকে পাশ থেকে ধাক্কা মারে। মেরেই পালিয়ে যায়।”
“ধাক্কা মারে! ইচ্ছে করে, না, অ্যাক্সিডেন্ট?”
“বাবু বলছেন, ইচ্ছে করে, মতলব নিয়ে।”
“লোকটাকে দেখেছেন নন্দবাবু?”
“ওখানে রাস্তার বাতি ছিল না কাছাকাছি। দু’-এক পলক যা দেখেছেন তাতে সেই ছেলেটার মুখ বলেই তাঁর মনে হল। উনি তখন রাস্তায় ছিটকে পড়েছেন। কোমরে লেগেছে, হাতে-মাথায় চোট, মুখ থুবড়ে পড়ায় গালে নাকে লেগেছে, রক্ত পড়ছিল। …আপনি নিজে গেলেই সব দেখতে পাবেন– শুনবেন। আমি আর কী বলব!”
‘নন্দবাবু আমায় তবে যেতে বলেছেন।”
“আজ্ঞে হ্যাঁ, সেজন্যেই আমায় আপনার ঠিকানা দিয়ে পাঠিয়েছেন। অনেক করে বলেছেন–আপনি যেন একবার যান। তাঁর বাড়িতে। তিনি তো আর দোকানে আসতে পারছেন না।”
কিকিরা চোখ বুজে মাথা নাড়লেন। তারপর তাকালেন। “বাড়িটা কোথায় যেন। অনেক আগে এক-দু’বার গিয়েছি, ঠিক মনে নেই। ঠিকানাটা বলে যাও, আর একটু বুঝিয়ে দাও আমাকে।”
শ্রীকুমার ঠিকানা বলল, নন্দবাবুর বাড়িটা কোথায় হবে বুঝিয়েও দিল।
কিকিরা বার কয়েক ঠিকানাটা আওড়ালেন। বললেন, “ঠিক আছে। আমি কাল বিকেলে যাব, নন্দবাবুকে বোলো। এমনিতেই কথা ছিল, পরে একদিন তাঁর কাছে যাব। তুমি বরং এখন এসো। সাবধানে থাকতে বলবে নন্দবাবুকে। এই বয়েসে চোট-জখম বড় ভোগায়।”
শ্রীকুমার চলে গেল।
অল্পসময় চুপচাপ। কিকিরা অন্যমনস্ক; তারাপদ আর চন্দনও কথা বলল না। ঘরে বাতি জ্বলছে, পাখাও চলছিল। লাফ মেরে মেরে গরম যেন এগিয়ে এসেছে। চৈত্রমাস একেবারে দোরগোড়ায়।
শেষপর্যন্ত কিকিরাই কথা বললেন। অনেকটা অবিশ্বাসের গলায়, “আমি এতটা ভাবিনি।”
তারাপদ বলল, “কী ভাবেননি?”
“ভাবিনি সত্যি সত্যি নন্দবাবুর ওপর হামলা হতে পারে এভাবে। এত তাড়াতাড়ি।”
চন্দন বলল, “এটা সার, অ্যাকসিডেন্ট কেস হতে পারে। কোনও আনাড়ি হয়তো ধাক্কা মেরে পালিয়েছে।”
“অসম্ভব নয়। কিন্তু নন্দবাবু যে বলছেন, ওই ছোকরাটাকেই উনি দেখেছেন।”
“সত্যিই কি দেখেছেন, না, চোখের ভুল? উনি হয়তো উদ্বেগ আতঙ্ক নিয়ে রয়েছেন বলে ভুল দেখেছেন। কিংবা ভাবছেন।”
“এখন কিছু বুঝতে পারছি না। দেখি, কাল ওঁর বাড়ি যাই–কথা বলি–?”
তারাপদ দেশলাইয়ের বাক্স বার করে একটা কাঠি নিল। তারপর কান চুলকোতে চুলকোতে বলল, “আপনার কাছে আলমারির গল্প আমরা শুনেছি। হতে পারে ওটা মূল্যবান আসবাব। কিন্তু একটা কাঠের পুরনো আলমারির জন্যে এত কাণ্ড হয় কেমন করে। একজন বিক্রি করবে, পরে নাতি এসে শাসাবে। তারপরও ধরুন, যিনি কিনলেন তিনি আবার ওই বুড়ো ভদ্রলোককে গিয়ে জানিয়েও এলেন শাসানোর কথাটা। বুড়ো কোনও কানই করলেন না। এর পর আবার হামলা! কীসের এমন মহামূল্যবান আলমারি, সার! আপনি যাই বলুন, ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। আমি কোনও মানে খুঁজে পাচ্ছি না।”
