“আছে এখানে? দেখতে পাব?”
“নেবেন নাকি?” নন্দবাবু হালকাভাবে বললেন।
“কী যে বলেন! আমার কি দশ হাজারের পুঁজি আছে? এই একটু চোখের দেখা দেখতাম।”
“আরে, ঠাট্টা করছিলাম।” বলে হাত তুলে দোকানের ভেতর দিকের একটা জায়গা দেখালেন আঙুল দিয়ে, “ওই যে, পলিথিন দিয়ে ঢাকা দেওয়া আছে। চলুন, দেখবেন।” উঠে পড়লেন চেয়ার সরিয়ে।
নন্দবাবু কিকিরাকে নিয়ে কয়েক পা এগিয়ে গেলেন। “শ্রীকুমার, পলিথিনটা নামিয়ে দাও তো!”
শ্রীকুমার পালিশের কাজ করছিল। উঠে এসে পলিথিনের ‘শিট’-টা সরিয়ে দিল।
কিকিরা দেখলেন আলমারিটা। দেখার মতনই। পুরনো বলে বাইরের ঝকঝকে ভাবটা নেই, কাঠেও ময়লা ধরে, তবে একনজরেই বোঝা যায়–মামুলি আসবাব এটা নয়। সত্যিই সুন্দর। হিসেব করে গড়ন, নকশা, হাতের কাজ দেখে বোঝা যায়, পাকা মিস্ত্রিদের হাতে তৈরি আসবাব। বনেদিয়ানার একটা চেহারা রয়েছে আলমারিটার গায়ে। কিকিরার মনে হল, মাথার দিকে ওটা ছ’ ফুটের মতন, চওড়ায় তিনের কাছাকাছি, ভেতরের দিকটা–যাকে ডেথ বলে, মন্দ হবে না। আপাতত মরা-মরা রং দেখেও অনুমান করা যায়, ওটা মেহগনি রঙেরই ছিল।
আলমারির আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখতে দেখতে কিকিরা বললেন, “খাঁটি জিনিসই বটে নন্দবাবু, কিন্তু আয়নার তলার দিকে কাচটা ফেটে গিয়েছে না?”
“হ্যাঁ। ওই কাচ তো আর পালটানো যাবে না, দেখি কীভাবে ম্যানেজ করতে পারি।”
“ভেতরটা একবার দেখা যায় না?”
“কেন যাবে না!” বলে নন্দবাবু গণেশকে ডাকলেন, “গণেশ, আমার টেবিলের তলার ড্রয়ার থেকে চাবিটা এনে দাও। অন্য চাবি নয়, দেখবে টোয়াইন সুতোয় বাঁধা গোটা চারেক বড়-ছোট চাবি রয়েছে। সুতোয় একটু লাল রং লাগানো।”
গণেশ ড্রয়ার হাতড়ে চাবি এনে দিল।
নন্দবাবু আলমারির পাল্লা খুলতে খুলতে বললেন, “এর আবার ডবল লক সিস্টেম। একটায় খুলবে না। প্রথমে একটা, ওপরের দিকের গর্তে, পরে নীচের দিকে। আলাদা আলাদা চাবি। আগেকার দিনে এরকম অনেক আলমারিতেই থাকত।”
পাল্লা খুলতে সামান্য সময় লাগল নন্দবাবুর। চাবির গোলমাল হচ্ছিল। “দেখুন!”নন্দবাবু বললেন, “ভেতরটা দেখুন, মশাই! কত স্পেস। এক-একটা তাকে বিশ-পঁচিশটা শাড়ি জামা ঢুকে যায় অনায়াসে। ওপরের তাকটা দেখছেন?”
কিকিরা একদৃষ্টে দেখছিলেন। চারটে তাক। যথেষ্ট জায়গা। ওপরের তাকে তিনটি ভাগ। পাশের দুটোয় ড্রয়ার, মাঝখানেরটা ফাঁকা। ওর মধ্যে ছোট বড় লম্বাটে চৌকোনো কয়েকটা খুপরি, মানে ‘পকেট। ড্রয়ার দুটোর গায়ে হালকা হাতল, পেতলের। চাবির গর্তও রয়েছে।
কিকিরা মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, “বাঃ! দেখার মতন। আপনার নজর আছে নন্দবাবু! আড়াই হাজারে এ-জিনিস পেয়ে গিয়েছেন, বরাত ভাল আপনার।”
নন্দবাবু হাসলেন সামান্য। “আরও একটা জিনিস আছে তলার দিকে। আপনি বুঝতে পারবেন না। বোর্ড ড্রয়ার। মানে কাঠের তক্তা ড্রয়ার। হালকা, পাতলা।”
কথা বলতে বলতে নন্দবাবু আলমারির পাল্লা বন্ধ করে দিলেন।
টেবিলে ফোন বাজছিল।
নিজেই এগিয়ে গিয়ে ফোন ধরলেন নন্দবাবু। কথা বললেন। কেউ বোধ হয় ফার্নিচার ভাড়া নেওয়ার কথা বলছিল। ভুল জায়গায় ফোন করেছে হয়তো। নন্দবাবু বললেন, না–এখানে ফার্নিচার ভাড়া দেওয়া হয় না। পার্ক সার্কাসের দিকে দেখুন।
কিকিরা এবার উঠবেন। বললেন, “আমি তা হলে আজ চলি, নন্দবাবু।”
“যাবেন! … আচ্ছা কী করি বলুন তো! ছোকরাকে আমার একদম পছন্দ হয়নি।”
কিকিরা ভাবলেন কয়েক মুহূর্ত। বললেন, “আমার মনে হয়–আপনি একবার হাতিবাগানে যান। যাঁর কাছ থেকে আলমারি কিনেছেন–তাঁকেই বলুন। তাঁরই তো নাতি। যা ঘটেছে বলবেন ভদ্রলোককে। দেখুন না উনি কী বলেন।”
নন্দবাবু মন দিয়ে শুনলেন। “আমিও তাই ভাবছি।”
“আজ না হয় কাল–একবার চলে যান। ঘাবড়াবেন না। আমি আজ চলি। দিন কয়েক পরে আমাকে এদিকে আসতে হবে একটা কাজে, তখন বরং খোঁজ নিয়ে। যাব।”
“আসুন তবে। দাঁড়ান, আপনার ঠিকানাটা লিখে রাখি, মশাই। আপনি তো আবার চোর-জোচ্চোর ধরতে জানেন। কখন কী দরকার পড়ে।” বলে নন্দবাবু একটা খাতায় কিকিরার ঠিকানা লিখে নিতে লাগলেন।
.
০২.
কোনও একটা কথায় হাসির হল্লা উঠেছিল। চন্দন তারাপদ কিকিরা–সকলেই হাসছে।
শেষে হাসি থামিয়ে কিকিরা বললেন, “পুরনো কথা শুনলে তোমরা এত হাসো কেন বলো তো? আমি কি বানিয়ে বলছি, না, বাজে কথা বলছি?”
চন্দন বলল, হাসতে হাসতেই, “তা বলে আপনি বিশ্বাস করতে বলেন, আগেকার দিনে এই কলকাতা শহরে থিয়েটার হলের সামনে হুঁকোর দোকান থাকত? তামাক কলকে ফিট করা। বাবুরা মাঝে মাঝে হল থেকে বেরিয়ে এসে হুঁকো টেনে যেতেন?”
“আমি বলছি না চাঁদুবাবু, বইয়ে বলছে। আমি তখন কোথায়, আমার পিতৃপুরুষও জন্মাননি মনে হয়। সে কি এখনকার কথা! শ’খানেক বছর পিছিয়ে যাও। তারও বেশি। ভুবন মুখুজ্যের বইয়ে পড়েছি। তখন থিয়েটার পাড়ায় প্ল্যাকার্ডকে বলত পেলাকাঠ’, অবশ্য যারা মুখুসুখ মানুষ, থিয়েটারে সাধারণ কাজকর্ম করত–তারা। পানের দোকানের ছোঁড়ারা থালায় বরফজলের গ্লাস সাজিয়ে হেঁকে হেঁকে বিক্রি করত, বিলিতি জল–ওয়ান পেয়ালা ওয়ান পাইস, খেয়ে নিন বাবুরা বুক ঠাণ্ডা প্রাণ ঠাণ্ডা …।”
তারাপদ মুখ মুছতে মুছতে বলল, “তখন সিগারেট বিড়ি সোডা লেমোনেড ছিল না?”
