“বাঃ, মগের মুলুক নাকি!”
“মশাই, আমিও তো তাই বললাম। রাস্কেল কী বলল জানেন, বলল, হ্যাঁ মগের মুলুকই। দোকানই শুধু জ্বালিয়ে দেব না, আপনার অন্য ক্ষতিও হতে পারে।”
“তার মানে মারধোর–?”
“হবে।” বলে ভেতরদিকটা দেখালেন, “ওই তো আমার কর্মচারীরাও ছোকরার হল্লা শুনেছে।”
কিকিরা বুঝতে পারলেন, ব্যাপারটা একেবারে তুচ্ছ হলে নন্দবাবু রাগের মাথায় থানার দিকে পা বাড়াতে যেতেন না। রাগই হোক, অথবা ভয়, কিংবা উত্তেজনা তাঁকে বিচলিত করেছিল। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনি থানায় যাননি।
চায়ের কাপে বার দুই চুমুক দিলেন কিকিরা। ট্রাম রাস্তার দিকে দেখলেন কয়েক মুহূর্ত। পরে মুখ ফিরিয়ে নন্দবাবুর দিকে তাকালেন। “আর আপনার টাকা, আড়াই হাজার?”
“ফেরত দিয়ে দেবে।”
“আচ্ছা! … আলমারিটা আপনি কাদের বাড়ি থেকে কিনেছিলেন?”
“হাতিবাগানের বিশ্বাসবাড়ি থেকে। বনেদি বাড়ি। দু’-পুরুষ হেসেখেলে কাটিয়েছে। ইংরেজ আমলে বাড়বাড়ন্ত হয়েছিল খুব। পাঁচরকম কারবারে কামিয়েছিল অনেক। যাতেই হাত দেয় তাতেই সোনা উঠে আসে। তিনপুরুষে এসে ভাঙন। শরিকি ঝগড়া, কোর্টকাছারি, ঘরবাড়ি ভাগাভাগি, দেখতে দেখতে ওই বাড়ির এমন দৈন্যদশা হল যে, আর চেনা যায় না।”
কিকিরা অনুমান করতে পারছিলেন, এমন বাড়ি তিনিও দু’-দশটা দেখেছেন বইকি এই কলকাতা শহরে। ভাঙাচোরা, পলেস্তরা-খসা, চুনবালি ঝরে পড়া, বিবর্ণ, আধো অন্ধকার বাড়ি। ধুলোয় ময়লায় ভরা। দরজা জানলা হয় হেলে পড়ছে, না হয় তার আর অস্তিত্ব নেই। কেউ যদি মনে করে এগুলো ইটকাঠের ভগ্নস্তূপ, তবে তাকে তেমন দোষ দেওয়া যায় না।
চা খেতে খেতে কিকিরা বললেন, “আলমারিটার খবর পেলেন কেমন করে?”
“খবর! খবর আমাদের রাখতে হয়। কানে আসে। সব ব্যবসারই নিজের একটা ধরন থাকে রায়বাবু, বিজনেস করব ওল্ড ফার্নিচারের আর খোঁজখবর রাখব না কোথায় কী বেচাকেনা চলছে, কোথায় কী পাব–তাই কি হয়!”
মাথা হেলালেন কিকিরা, ঠিক কথা। বললেন, “বিশ্বাসবাড়ির কোন তরফ মানে শরিকের বাড়ি থেকে পেলেন ওটা?”
“ছোট। সুবর্ণকান্তি বিশ্বাস।”
“সুবর্ণকান্তি! নামটি তো বেশ,” কিকিরা হাসলেন।
“ওদের সবই কান্তি …, সজলকান্তি শুভ্রকান্তি সুবর্ণকান্তি … নামের সঙ্গে কান্তি টা যোগ করে নেয়। ট্রাডিশান।”
“বয়েস কত ভদ্রলোকের?”
“মোটামুটি সত্তর। সোনা না হোক এখনও যা রং গায়ের–পাকা আমের মতন। একসময় যে খুবই সুপুরুষ ছিলেন, বোঝা যায়।”
“তা এখন বোধ হয় কিছু করেন না। চলে কেমন করে?”
“এই বয়েসে আর কী করবেন! আগে একটা দোকান ছিল যতীন্দ্রমোহন অ্যাভিনুয়েতে। গ্রামোফোন রেকর্ড রেডিও বিক্রি হত। সাজানো গোছানো দোকান। বিক্রিবাটা মন্দ ছিল না। তবে সে দোকান কবেই উঠে গিয়েছে। পড়তি অবস্থায় মানুষের যেমন করে চলছে- সেইভাবেই চলছে, কুড়িয়ে বাড়িয়ে, এটা ওটা বেচে দিয়ে। উনি আর বাইরে বড় একটা যান না। আর্থারাইটিসে একেবারে কাবু। তার ওপর চোখ নিয়ে ভুগতে ভুগতে এখন প্রায় অন্ধ হয়ে পড়েছেন। মেয়েই ভরসা।”
চা শেষ করলেন কিকিরা? “যে ছোকরা আপনার দোকানে এসেছিল সে কেমন নাতি? মানে ছেলের তরফে, না, মেয়ের …”
“ওঁর ছেলে নেই। দুটি মেয়ে শুনেছি। .. এটি কোন মেয়ের ছেলে আমি জিজ্ঞেস করিনি। কথায়বার্তায় মনে হল, বড় মেয়ের ছেলে। মেয়ে বাবার কাছেই থাকে। বিধবা।”
কিকিরা মনে মনে যেন ব্যাপারটা গুছিয়ে নিলেন। “তা হলে ছোটদাদু কেন? শুধু দাদু বললেই তো হত।”
“ও ওদের ব্যাপার। বড়দাদু এখনও বেঁচে, সেজো মারা গিয়েছেন। হয়তো ছোট বলে, ছোটদাদু বলে।”
কিকিরা দোকানের ভেতরটা দেখলেন একবার। কর্মচারীরা কাজ করছিল। কথাও বলছিল নিজেদের মধ্যে।
“নন্দবাবু, আড়াই হাজার টাকা দিয়ে আপনি যে আলমারিটা কিনেছেন, সেটা আপনি মোটামুটি কী দামে বেচতে পারবেন বলে মনে করেন?”
নন্দবাবু একটু ভাবলেন। বললেন, “মেরামতির কাজ আছে সামান্য। তার ওপর রং-পালিশ। তা তেমন খদ্দের পেলে সাত-আট হাজার। আসলে কী জানেন রায়বাবু, এসব জিনিসের খদ্দের আজকাল টপ করে পাওয়া যায় না। ছ’মাস এক বছর হয়তো পড়েই থাকল দোকানে। গাঁট থেকে যে টাকাটা আগাম গেল, মেরামতির খরচ–সব মিলিয়ে যা দাঁড়ায়–তার ওপর হাজার দুই তিন না রাখলে আমার চলে কেমন করে! আপনাকে মিথ্যে বলব না, আগের দিন হলে যখন শখ শৌখিনতা ভালমন্দ লোকে বুঝত, তখনকার বাজার হলে আমি দশ বারো হাজার কামিয়ে নিতে পারতাম।”
কিকিরা বোধ হয় সামান্য অবাক হলেন। “দশ হাজার!”
“অবাক হওয়ার কী আছে মশাই, কাঠ তো স্টিল নয়, কারখানায় তৈরি হয় না। ভাল কাঠের দাম সোনার মতন। দশ হাজার কেন, বারো-চোদ্দও হতে পারত। কিন্তু আজকাল আর তেমন খদ্দের পাব কোথায়?”
“দামি আসবাব বলুন!”
“বলতে! ও কি এখনকার জিনিস! ল্যাজেরাস কোম্পানির নাম শুনেছেন? ফার্নিচারের কারবারে পয়লা নম্বর ছিল তখন। তারপরেই লিসা কোম্পানি। ওদের ঘরের জিনিস। কাঠ বাইরের, টিক; ডিজাইন বিলেতি। আলমারির একটা পাল্লায় ফুল সাইজ আয়না। ওই আয়না এখন পাওয়া যাবে! ইটালিয়ান গ্লাস, বেলজিয়ান নয়। আয়নার চারপাশে ফ্রেমিং লতাপাতার কাজ করা। যেমন সুন্দর তেমনই সূক্ষ্ম! জিনিসটা বড় ভাল রায়বাবু!”
