কিকিরা সিগারেট নিলেন। ধরালেন। অন্যমনস্ক ভাবে রাস্তার দিকে তাকালেন। ফুটপাথের এপাশে ছায়া পড়েছে। ওপারে এখনও ফাল্গুন শেষের রোদ। তেজ হয়তো সামান্য কমে এসেছে। বিকেল প্রায় চারটে। গরম পড়ে আসছে। হাওয়ায় দক্ষিণের ছোঁয়া আছে সামান্য। এলোমেলো। এপার থেকে ওপারে তাকালে– অন্যদিকের ফুটপাথ-ঘেঁষা দোকানগুলো দেখা যায় : একটা দোকান জুয়েলারির, পাশে চশমার দোকান, তার গায়ে গায়ে হোসিয়ারি স্টোর্স, একচিলতে পান সিগারেটের খুপরি। কোল্ড ড্রিংকসও সাজানো আছে। দুই ফুটপাথের মাঝখানে ট্রামলাইন।
কলকাতা শহরের উত্তর-ঘেঁষে এই দোকানটাকে যেন একটেরে দেখায়। অবশ্য কিকিরা জানেন, নন্দবাবুদের পৈতৃক বাড়ি এই পাড়াতেই। ওঁর বাবা যখন দোকান করেন, নিজের সুবিধে অসুবিধে বুঝেই করেছিলেন; আর তখন–বছর সত্তর আগে–এসব অঞ্চল ছিল অন্যরকম। ভিড়ভাড়াক্কা নেই। অনেক নিরিবিলি।
নন্দবাবু কী যেন বললেন।
অন্যমনস্ক থাকায় কিকিরা খেয়াল করেননি। তাঁর চোখ ছিল ফুটপাথের অন্যদিকে একটা আধমরা হেলেপড়া গাছ থেকে পাতা ঝরে পড়ছিল, শুকনো পাতা। ট্রাম চলে যাচ্ছিল।
“কিছু বললেন?” কিকিরা বললেন।
“আপনি এখন আছেন কোথায়?”
কিকিরা নিজের আস্তানা জানালেন। হেসে বললেন, “এবার ভাবছি ঠিকানা পালটাব। ওখানে ক’বছর কেটে গেল। বদল দরকার।”
নন্দবাবু হেসে বললেন, “আপনি তো বরাবরই ঠাঁই পালটান। তা এখন করছেন কী? আগেই তো ম্যাজিক ছেড়েছিলেন!”
“বেকারই বসে আছি বলতে পারেন। হাতে টুকটাক কাজ পেলে করি। আমারও চলে যাচ্ছে কোনওরকমে, আপনার চেয়ে খারাপ ছাড়া ভাল নয়।”
নন্দবাবুও সিগারেট ধরিয়েছিলেন। একমুখ ধোঁয়া গিলে বললেন, “এই দোকান আমি যে ক’দিন আছি, তারপর উঠে যাবে। আমার ছেলের মতিগতি আলাদা। সে-বেটা চাকরি-বাকরির দিকে ঝুঁকছে। পরীক্ষা দেয়, আর হাঁ করে বসে থাকে কবে গাছের ফল তার মুখে এসে পড়বে-এই আশায়। এমনিতে নিরীহ গোবেচারি গোছের। ব্যবসা তার লাইন নয়। পারবেও না।”
“যা পারে সেটা করাই ভাল। … তা আপনি হঠাৎ থানায় যাচ্ছিলেন কেন–তা তো বললেন না!”
গণেশ মিষ্টি নিয়ে এল। এনে একটা কাঁচের প্লেট ধুয়েমুছে সন্দেশ আর জল এনে টেবিলের সামনে রাখল।
কিকিরা বললেন, “আপনি?”
“না না, আমার টিফিন হয়ে গিয়েছে। মিষ্টি আমার বারণ। ব্লাড সুগার ধরব ধরব করছে। মার্জিন লাইন। সামলে থাকতে হয়। বাড়ি থেকে টিফিন আনি, ময়দার দুটো রুটি, সবজি, শশার কুচি। নিন আপনি।” বলে কয়েক মুহূর্ত থামলেন; তারপর বললেন, “দোকান সামলাতে এমনিতেই মেজাজ ভাল থাকে না, তার ওপর একটা ছোকরা-জানি না চিনি না–আমার দোকানে ঢুকে হম্বিতম্বি করে গেল। কী চোটপাট রাস্কেলের।”
কিকিরা অবাক হয়ে বললেন, “সে কী! হঠাৎ দোকানে ঢুকে–?”
“জানি না মশাই,” নন্দবাবু বিরক্তির সঙ্গে বললেন; রেগে উঠছিলেন ভদ্রলোক। “আমি করি ব্যবসা; চুরিও নয়, ডাকাতিও নয়। কোন সেকেলে বনেদি বাড়ির অবস্থা একেবারে পড়ে গিয়েছে, শরিকি ঝগড়ায় ভাগ বাঁটোয়ারায় ছিটকে ছটকে টুকরো-টুকরো; কে কোথায় তার দু’তিন পুরুষের আগলানো জিনিসপত্র বেচে দিচ্ছে একটা একটা করে–এসব খোঁজপত্তর আমায় রাখতে হয়। আমার অবশ্য ফার্নিচারের ব্যাপার; খাট আলমারি দেরাজ ড্রেসিংটেবিল–এসব নিয়ে কারবার। তেমন কিছু পেলে কিনে নিই। দু’-তিনটে কোম্পানি আছে, হপ্তায় হপ্তায় নিলাম ডাকে, তার বেশিরভাগই সাহেববাড়ির ফার্নিচার। তাও কেনার চেষ্টা করি। তারপর দোকানে এনে মেরামত রং পালিশ করে এখান থেকে বেচবার চেষ্টা করি। এই তো আমার ব্যবসা …”।
কিকিরা জানেন সবই। একটুকরো সন্দেশ মুখে দিয়ে বললেন, “ছোকরা এসেছিল কেন?”
“কেন এসেছিল! এসেছিল তার ছোটদাদুর বাড়ি থেকে আমি যে আলমারিটা কিনে এনেছি সেটা ফেরত নিতে।”
“কেন? আপনি তো কিনে এনেছিলেন।”
“আলবাত। নগদ আড়াই হাজার টাকা দিয়ে রসিদ লিখিয়ে কিনে এনেছি।”
“কবে?”
“এই তো হালে। দিন আষ্টেক আগে।”
“ছোকরা জানে না?”
“বলছে তো আগে জানত না। সবে জেনেছে।”
“তার মানে? আগে জানত না, এখন জেনেছে-ব্যাপারটা কী?”
“বলল, সে তখন বাড়িতে–মানে কলকাতায় ছিল না। থাকলে আলমারি বেচতে দিত না দাদুকে।”
“কোথায় ছিল?”
“দিঘা।”
“বেড়াতে গিয়েছিল বুঝি!”
“কে জানে!” তিরিক্ষে মেজাজে নন্দবাবু বললেন। “বারফট্টাই অনেক। বলল, দিঘায় একটা হোটেলের কাজ নিয়ে ব্যস্ত, কলকাতায় থাকতে পারছে না। ও যদি বাড়িতে থাকত আমি নাকি ধাপ্পা মেরে ভুলিয়ে ভালিয়ে বুড়োমানুষের কাছ থেকে ওই আলমারি কিনতে পারতাম না।”
চায়ের দোকান থেকে চা দিয়ে গেল। ধোয়ামোছা পরিষ্কার কাপ, প্লেটও দিয়েছে। বোঝাই যায়, নন্দবাবুর কথামতন স্পেশ্যাল করে বানানো। ওঁর চা আলাদা করে সামনে রাখল। মানে ভদ্রলোকের বোধ হয় চিনির বরাদ্দ নেই, বা নামমাত্র।
কিকিরা চায়ের কাপ টেনে নিলেন। তাঁর নাক গলাবার কথা নয়, তবু কেমন কৌতূহল বোধ করছিলেন। চুরিচামারি ঠগজোচ্চুরি নয়, দাম মিটিয়ে একটা জিনিস কিনে এনেছেন নন্দবাবু, তা হলে দোকানে এসে অন্যায়ভাবে তাঁকে শাসানোর মানে কী? কেন শাসাবে?
“ছোকরা ঠিক কী বলল আপনাকে?” কিকিরা জিজ্ঞেস করলেন।
“বলল, সাতদিনের মধ্যে আলমারি ফেরত দিয়ে আসতে। নয়তো এই দোকান ছাই হয়ে যাবে!”
