কিকিরা হালকা গলায় বললেন, “কমই আসা হয়। এক-আধবার ভেবেছি আপনার সঙ্গে দেখা করে যাই। হয়ে ওঠেনি।”
“আজ তা হলে ছাড়ছি না। আসুন। দোকানে বসে একটু চা খাবেন; গল্পগুজব হবে।”
সামান্য তফাতেই নন্দবাবুর দোকান। এখান থেকেই সাইনবোর্ড দেখা যাচ্ছে : ‘দাশ অ্যান্ড কোং’। তলায় ছোট হরফে লেখা, ডিলার্স ইন ওল্ড ফার্নিচারস। তার তলায়, ইএসটিডি; নাইনটিন টুয়েন্টি এইট। মানে, উনিশশো আঠাশ সালে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল দোকানটির।
কিকিরা নন্দবাবুর দোকান সম্পর্কে অল্পবিস্তর জানেন। এককালে চেনাজানা, বন্ধুত্ব ছিল। দোকানে বসে আড্ডাও মেরেছেন। দোকান দিয়েছিলেন নন্দবাবুর বাবা। ভদ্রলোক সেকালের বিখ্যাত এক সাহেব-কোম্পানির আসবাবপত্রের দোকানে কাজ করতেন, হরেকরকম নকশা বুঝতেন, কাজ জানতেন, কাঠ চিনতেন। সেই কোম্পানি অন্য হাতে চলে যাওয়ার পর নন্দবাবুর বাবা নিজেই দাশ কোম্পানির দোকান খোলেন। অবশ্য, সাবেকি আসবাবপত্র কেনা, নিলাম থেকে তুলে আনা, ছোটখাটো মেরামতির কাজ, নতুন করে রং পালিশ–এর বাইরে অন্য কিছুতে হাত দেননি। পুরনো আসবাবপত্র নিয়েই ছিল তাঁর ব্যবসা। ভালই চলত। তখনকার দিনে সাবেকি আর সাহেববাড়ির টেবিল চেয়ার আলমারি দেরাজ সাজ আয়নার ওপর মানুষের ঝোঁক ছিল। পছন্দও করত। শখের জিনিস সস্তাও পড়ত তুলনায়।
নন্দবাবুর বাবা মারা যান প্রৌঢ় বয়েসেই। বাবা বেঁচে থাকতেই উনি দোকানে গিয়ে বসতেন। বছর পঁচিশ বয়েস থেকে মোটামুটি দশ-বারো বছর বাবার সঙ্গে দোকানে কাটানোর পর নন্দবাবু একা হয়ে গেলেন। তখন তাঁর বয়েস পঞ্চাশের এপারে। পঞ্চান্নর মতন।
দোকানের দিকে হাঁটতে হাঁটতে কিকিরা নন্দবাবুকে বললেন, “দোকান ছেড়ে এই শেষ দুপুরে আপনি কোথায় গিয়েছিলেন, মশাই?”
নন্দবাবু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। “থানায়।”
“থানায়?” কিকিরা অবাক।
নন্দবাবু বললেন, “রাগের মাথায় থানা পর্যন্ত গেলাম। থানার একজনকে চিনি। ধীরেন মজুমদার। … তা থানার সামনে গিয়েও কেমন মনে হল, ঝট করে একটা কিছু করে ফেলা কি ভাল হবে! থানা-পুলিশের ঝাটও অনেক। পরে ঠেলা সামলাতে প্রাণ বেরিয়ে যাবে হয়তো।”
কিকিরা কিছুই বুঝলেন না। নন্দবাবুকে দেখছিলেন।
নন্দবাবুর পুরো নাম, নন্দদুলাল দাশ। বছর পঞ্চান্ন বয়েস হলেও বয়েসের তুলনায় আরও সামান্য বেশি মনে হয়। সেটা তাঁর চেহারার জন্যে। মাঝারি মাপের গড়ন হলেও মাথায় প্রায় চুল নেই। যা আছে তারও অর্ধেক সাদা। চৌকোনো মুখ। গালের হাড় স্পষ্ট। তামাটে রং গায়ের চোখে আপাতত খানিকটা বিরক্তি। নন্দবাবুকে রুক্ষ না হোক শুকনো দেখাচ্ছিল। গায়ে শার্ট। পরনে ধুতি। উনি বেশিরভাগ সময়ে সাদা শার্টই পরেন। পরনের ধুতি মিলের।
দোকানের সিঁড়িতে পা দিয়ে নন্দবাবু বললেন, “আসুন।”
কিকিরা মাথা নাড়লেন, “চলুন।”
ফুটপাথ-ঘেঁষে দোকান। বিশাল নয়, আবার ছোটও নয়। এই দোকানের কোনও বাহার নেই। লম্বাটে দোকান-ঘর। চারপাশে পুরনো আসবাবপত্র। টেবিল, দেরাজ, ড্রেসিংটেবিল, আর্মচেয়ার, কাঠের দোলনা-ঘোড়া, আলমারি, খাট, বুককেস–এইসব। অনেক জিনিস আলগা করে খুলে রাখা, যেমন খাটের মাথা আর পায়ের দিক, পাশের লম্বা কাঠ, ড্রেসিং টেবিলের আয়না, টেবিলের মাথা বা টপ। খুলে না রাখলে জায়গা হওয়ার উপায় নেই। প্রায় গুদোম মতন এই দোকানেরই একপাশে বসে জনা দুই কারিগর কাজ করছে। ছোটোখাটো সারাই, পালিশের কাজ। কম বয়েসের একটা ছোকরা ফরমাশ খাটছিল। দোকানের মধ্যে রং পালিশ টারপিন তেলের গন্ধ। ঠাসাঠাসি কাঠকুটোর চাপা গন্ধ তো আছেই।
ওরই মধ্যে দোকানের সামনের দিকে নন্দবাবুর বসার চেয়ার টেবিল। টেবিলে বিশেষ কিছু নেই। খাতাপত্র দু-চারটে, স্কেল, মেজারমেন্ট টেপ, একটা ডেস্ক ক্যালেন্ডার, টেলিফোন, পেপারওয়েট। মাথার ওপর দেয়াল কুলুঙ্গিতে তামার গণেশ, লক্ষ্মীর পটও ঝুলছে একপাশে। শুকনো ফুল, ধূপের কাঠি–সবই নজরে পড়ে।
নন্দবাবু বললেন, “বসুন রায়বাবু। পাখাটা চালিয়ে দিই।” বলে টেবিলের মাথার ওপর ঝুলন্ত পাখাটা চালিয়ে দিলেন। “বেশ গরম পড়ে গেল কী বলুন।”
নন্দবাবুর টেবিলের উলটো দিকে দুটিমাত্র কাঠের চেয়ার। কিকিরা চেয়ার টেনে বসলেন। বললেন, “ফাল্গুন মাস শেষ হয়ে গেল; গরম তো পড়বেই।”
“চা আনতে বলি। তার আগে একটু ঠাণ্ডা কিছু খাবেন?”
“না না। চা হলেই চলবে!”
“শুধু চা! কতদিন পরে দোকানে এলেন, একটু কিছু তো মুখে দেবেন। দুটো সন্দেশ অন্তত।” বলে নন্দবাবু আর অপেক্ষা করলেন না জবাবের, ছোকরা গোছের লোকটিকে ডাকলেন। “গণেশ, ভাল করে দু’কাপ চা, স্পেশ্যাল; আর এঁর জন্যে শ্যামের দোকান থেকে ভাল সন্দেশ আনবে। টাকা নিয়ে যাও।”
গণেশ চলে গেল।
কিকিরা দোকানের চারপাশে তাকাতে তাকাতে বললেন, “কেমন চলছে। ব্যবসাপত্র নন্দবাবু?” মুখে বললেন, কিন্তু মনে মনে তাঁর ধারণা হল, আগে যতটা সাফসুফ তকতকে দেখেছেন দোকানটা এখন আর ততটা নয়। এককালের মোটামুটি চলতি দোকান পড়তির অবস্থা হলে যেমন দেখায়–সেইরকমই দেখাচ্ছে।
নন্দবাবু বললেন, “ওই যে বললাম, টিকে আছি, তাই। কোনওভাবে বেঁচে আছি। সেসব আগের দিনের কাস্টমার কোথায়! কে আর পুরনো জিনিসের কদর বুঝবে! চোখেও দেখেনি, ভালমন্দ বোঝার ক্ষমতাও নেই। কাঠ তো চেনেই না, খানদানি জিনিসের মর্যাদাও বোঝে না। আজকাল যতসব ফিনফিনে ওপর চকমকির দিন।” গলায় ক্ষোভ ও হতাশা লুকোবার চেষ্টা করলেন না নন্দবাবু। একটু থেমে আবার বললেন, “ফার্নিচারের দোকান তো কম নেই কলকাতায়। শয়ে শয়ে। সবই মডার্ন। মানে, সস্তায় কিস্তিমাত করে খদ্দেরের গলা কাটা। আমার মশাই, ওদিকে হাতেখড়ি হল না। বাবা যেখানে বসিয়ে গেলেন সেখানেই থেকে গেলাম।” বলতে বলতে নন্দবাবু পকেট থেকে সস্তা সিগারেটের প্যাকেট আর মামুলি লাইটার বার করে এগিয়ে দিলেন কিকিরাকে।
