“যাক, ল্যাঠা চুকেছে,” কিকিরা বললেন। “তুমি তবে একটা কথা স্বীকার করছ, ঘটকের প্রাণটা তোমার গুরুর হাতেই গিয়েছে! শুধু আর-একটা কথা বলো, এই ম্যানেজারবাবুই টাকা খাইয়ে খুন-খারাবির কাজটা করিয়েছে কি না?”
রাজা একেবারে অসহায়। কথা লুকোবার চেষ্টা করে লাভ নেই। মাথা হেঁট করে স্বীকার করে নিল।
নরেশ মজুমদার কর্কশ গলায় বললেন, “এটা কোনও প্রমাণ নয়। আইন আদালত করে বুড়ো হয়ে গেলাম মশাই। রাম বলল, শ্যামের কথায় যদু খুন। হয়েছে আর আইন তা মেনে নেবে! মামার বাড়ি!”
ম্যানেজারের কথার কোনও জবাব না দিয়ে কিকিরা রাজাকেই বললেন, “তোমরা এ-বাড়িতে আসো! জানলা টপকে। তোমরাই এই ঘরের দরজা বাইরে থেকে কাঠের তক্তা মেরে বন্ধ করে রেখেছিলে, যাতে কেউ ঘরে আসতে না পারে?”
রাজা চুপ। তার গলায় পাতলা সোনার হার। হারের সঙ্গে একটা লকেট। কার লকেট কে জানে!
“এখানে কেন আসতে?” কিকিরা বললেন। “তুমি না বললেও আমরা জানি। এই ঘর থেকে তোমাদের ব্যবসা হত। চোরাই নেশা–গাঁজা চরস কোকেন– ওই যে কীসব বলে এখানে লুকিয়ে রাখতে আমদানি হলে, পরে বাইরে গিয়ে পার্টির কাছে বিক্রি করতে। নস্যির কৌটোয় কী থাকত হে? নেশা? পাউডার। তেরো নম্বরের ভাঙা পুরনো বাড়ি, ছাদের দিকের ঘর–তোমাদের আড্ডা হয়ে উঠেছিল। জায়গাটা পছন্দসই, তাই না!”
রাজা একবার আড়চোখে ম্যানেজারের দিকে তাকাল, “মজুমদারবাবু আমাদের একটা মাসখরচা দিতেন। বলেছিলেন, বাড়িটা নজরে রাখতে। আমরা সার–
কিকিরা কথা শেষ করতে দিলেন না রাজাকে, বললেন, “জানি, মানে পরে বুঝতে পারলাম।” বলে ম্যানেজারের দিকে তাকালেন, “ঘটকের সেই কাগজটা তো আপনার কাছে নেই। নকলটা আছে। আপনি ঘটককে ধোঁকা দিয়ে কাগজটার নকল করিয়ে নিজের কাছে রেখেছেন। তাই না?”
“কী করেছি সেটা আমার ব্যাপার”
“ব্যাপার আপনারই কিনা বলতে পারব না। তবে কাগজটা যদি দেখান–”
ম্যানেজার বুঝতে পারলেন, গায়ের জোর দেখিয়ে লাভ হবে না। তিনি একা। খানিকটা ইতস্তত করে পকেট থেকে একটা কাগজ বার করে দিলেন। ময়লা চিট হয়ে গিয়েছে কাগজটা। চার ভাঁজে ভাঁজ করা।
কাগজটা নিলেন কিকিরা। মন দিয়ে দেখলেন। দেখালেন জ্যাকিকে। তারাপদ আর চন্দনও দেখল।
অনেকক্ষণ পরে কিকিরা বললেন, “মশাই, এই বাগানের একপাশে একটা জাহাজি কম্পাসের ছবি। অন্য একপাশে একটা হাওয়া-মোরগ বা ওয়েদার কক-এর ছবি। তলায় একটা অঙ্কের মতন কী লেখা আছে। আপনি এরই ভরসায় বসে আছেন কবে লাখ লাখ টাকা কামাবেন!”
“আপনি বেশি পণ্ডিত?”
“না, আমি পণ্ডিত নয়। মুখসুখ মানুষ। তবে একটা কথা আপনাকে বলতে পারি। পর্তুগিজ পাদরি ফাদার পেইজ-এর গলায় পাথরের মালার সঙ্গে যে ক্রশ-লকেটটা ঝুলত, সোনা আর দামি পাথর দিয়ে তৈরি–সেটা চুরি গিয়েছিল ঠিকই–লিসবনের এক গির্জা থেকে। পরে ধরা পড়ে ওটা আসল নয়, নকল।”
“নকল?”
“হ্যারিশও এই ভুল করেছিল।..। অত কথায় দরকার কীসের, এখানকার গঞ্জেলাস কোম্পানিতে গিয়ে খোঁজ করলেই পারেন।”
নরেশ মজুমদার বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
কিকিরা তারাপদদের কী ইশারা করলেন চোখে চোখে।
লম্বাটে টেবিল–মানে কফিন বাক্সটার ওপরে একটা মোটা চাদর পাতা ছিল। ঢাকা দেওয়া ছিল। তারাপদরা চাদরটা সরিয়ে নিল।
কিকিরা যেন কোনও ম্যাজিক দেখাচ্ছেন। বাক্সর মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে জ্যাকিদের বললেন, ওপরের ডালাটা খুলে ফেলতে।
ডালা খোলা হল।
“ম্যানেজারবাবুনা মজুমদারমশাই, কী বলে ডাকব আপনাকে। তা সে যাই হোক, আপনি এবার এই কফিন বাক্সের মধ্যে এসে শুয়ে পড়ুন। আমরা ডালাটা বন্ধ করে দেব। ভাববেন না দরজা জানলা খোলা থাকবে। সব বন্ধ করে দিয়ে চলে যাব আমরা।…আসুন!”
মজুমদার ভয় পেয়ে পালাতে গেল, পারল না।
কিকিরার কাছে তাঁকে ধরে আনল জ্যাকি আর চন্দন।
কফিনের ভেতরের দিকটা দেখালেন কিকিরা। একটা লোক শুয়ে আছে। বাক্সর মাথার দিকের মানে–পাশের কাঠ খুলে ফেলা হয়েছে, যাতে যে শুয়ে আছে তার শ্বাসপ্রশ্বাসের অসুবিধে না হয়।
কিকিরা লোকটিকে উঠতে বললেন। সে উঠে পড়ল।
মজুমদার ঘামছিল।
কিকিরা বললেন, “আপনি ভাববেন না বেঁচে গেলেন। এতক্ষণ যে শুয়ে ছিল সে আমাদের বন্ধু। কিন্তু পুলিশের লোক। ওর নাম অবনীশ। চন্দনের বন্ধু। পুলিশেই আছে। তবে অন্য লাইনে। তবু পুলিশ পুলিশই। আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে রইল ও। বাকিটা কী হয় দেখা যাক।”
রাজা আচমকা মজুমদারের ওপর ঝাঁপ দিয়ে পড়ল।
কিকিরা যেন দেখেও দেখলেন না। চন্দনদের বললেন, “চলো হে! চলো।” বলে অবনীশের দিকে চোখ টিপে হেসে বললেন, “কথায় আছে শিশুরা মাতৃক্রোড়ে সুন্দর! তাই না! কফিন বাক্সের মধ্যে পুলিশের শুয়ে থাকাটাও খারাপ দেখাচ্ছিল না! কী বলো, চাঁদু?”
ওরা হেসে উঠল।
৩.৫ নীল বানরের হাড়
০১.
মুখোমুখি দেখা।
“আরে, রায়বাবু যে!”
কিকিরা হাসলেন। পরিচিতজনকে দেখলে কিকিরা ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে অন্যজনের হাত ধরে ফেলেন। এটা তাঁর অভ্যেস। বরাবরের। “নন্দবাবু! অনেকদিন পরে দেখা। কেমন আছেন?” নবাবুর হাত আলগাভাবে চেপে ধরে কিকিরা বললেন।
“টিকে আছি। আপনি কেমন আছেন? সেই কবে কানাই দত্তর মেয়ের বিয়েতে আপনাকে দেখেছিলাম। বছর চার-পাঁচ হয়ে গেল। তারপর আর দেখাসাক্ষাৎ নেই। এদিকে আসেন না?”
