জ্যাকি মাথা নাড়ল। বলল, “অ্যাঙ্কল, ফোন যদি না আসে। এই উইকে এল না?”
“পরের হপ্তায় আসবে। জ্যাকি, সোজা ব্যাপারটা ভেবে দেখো। ওরা তোমায় নজরে রেখেছে দিনের পর দিন। রেখেছে কিনা!”
“আমি ওই তেরো নম্বর বাড়িতে যাওয়ার পর থেকেই।”
“মোর দ্যান এ মান্থ!”
“হ্যাঁ।”
“তুমি আজকাল একা তোমার ভাইকে নিয়ে কতবার গিয়েছ আমি জানি না। আমাদের নিয়ে ক’বারই গিয়েছ। ওরা সেটা দেখেছে।”
“আপনি পাঁচবার গিয়েছেন। আপনারা সবাই তিন-চারবার।”
“ফোন তুমি পাবে।”
জ্যাকি আর কিছু বলল না।
কিকিরাও আর দাঁড়ালেন না চেম্বারে।
নীচে নেমে পানের দোকানের সামনে দাঁড়ালেন কিকিরা। বৃষ্টি থামেনি। জোরেও পড়ছে না। ছাতা মাথায় কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকলেন। রাস্তার আলো বৃষ্টির জলে ঝাপসা হয়ে রয়েছে।
ট্যাক্সি চোখে পড়ছিল না কিকিরার।
হাঁটতে লাগলেন।
আন্দাজে ঢিল ছোঁড়ার মতন একটা ঢিল তিনি ছুঁড়ে দিয়েছেন, সেটা লাগবে কি লাগবে না তিনি জানেন না। তবে কথায় আছে, ক্রিমিনালদের মনের পাল্লা লোভের দিকেই ঝুঁকে থাকে বেশিটা। দেখা যাক, কথাটা এখানে কতদূর খাটে!
.
১১.
ঘুটঘুটে অন্ধকারে কে যেন হাত রাখল কাঁধে। লোকটি চমকে উঠল। “কে?”
লোকটির গায়ে গায়ে দু’-এক পা পিছনে তার সঙ্গী ছিল। সাবধানে আসছিল সে। চোখ কান সতর্ক। তবু সে বুঝতে পারেনি, অন্য কেউ অন্ধকারে লুকিয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে পকেটে হাত দিল সে৷ দিয়েই বুঝতে পারল, তার ঠিক পিঠের কাছে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
“আসুন!”
“কে আপনি? এভাবে গায়ে হাত দিলেন?”
“গলার স্বর থেকেই আপনি বুঝেছেন আমি কে? তা ছাড়া আপনার মতন বুদ্ধিমান মানুষ নিশ্চয় আন্দাজ করেছিলেন আমি এখানে হাজির থাকতে পারি। আসুন আপনারা…!”
সেই ঘর। প্রথমে টর্চ, পরে দুটো বড় মোমবাতি জ্বেলে দিল জ্যাকি।
কিকিরার গায়ে কালো আলখাল্লা গোছের জামা, প্যান্টটাও কালো। মাথায় কালচে রুমালের ফেট্টি। লোকটির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন কিকিরা। বললেন, “ম্যানেজারবাবু, আমি আদতে ম্যাজিশিয়ান। আমরা কখন কীভাবে কোন খেলা দেখাব সেইভাবে সাজতে পারি। রাজাগজা থেকে সন্ন্যাসী–সবই। ওগুলো চমক। পার্ট অব দ্য গেম! আমাদের যা মানায় আপনাকে মানাবে কেন, মশাই। আপনি তালুকদারদের গদির-সেরেস্তাই ধরুন, গদির ধুতি পাঞ্জাবিপরা ম্যানেজার। চাঁদনির প্যান্ট শার্ট আপনাদের মানাবে কেন? মাথার চুল এতটা কালো নয় আপনার। ওটাও চালে ভুল…।”
ম্যানেজার চুপ করে থাকলেন। ঘরের মধ্যে কালো বাক্সটা দেখতে পাচ্ছিলেন না। কোথায় গেল? কফিন বাক্সই বা কোথায়? তার বদলে এক লম্বাটে সরু বেঞ্চির ওপর যেন চাদর পাতা মাটি পর্যন্ত ঝুলে রয়েছে! ওটাই কি কফিন বাক্স! কিকিরার ঠাট্টা হজম করছিলেন মুখ বুজে।
কিকিরা ম্যানেজারের সঙ্গীর দিকে তাচ্ছিল্যের চোখে তাকালেন। “আপনার বডিগার্ড? এ পাড়ার? রাজা না কী নাম! শের বলে লোকে!”
রাজা যেন খাঁচায় ধরা পড়েছে। রাগে তার চোখ জ্বলছিল, কিন্তু একেবারে অসহায়। জ্যাকির বক্সিংলড়া ভাই, ট্যানারিতে কাজ করতে করতে যেন নিজের গায়ের চামড়াই পালটে ফেলেছে, রাজার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। চাদর ঢাকা লম্বা বস্তুটার মাথার দিকে তারাপদরা।
কিকিরা ম্যানেজারকে বললেন, “আমি আমার মক্কেল জ্যাকির হয়ে কথা বলছি। আপনি তো সেটা বিলক্ষণ বোঝেন। এটা আদালত নয়। তবু একটা বোঝাঁপড়ার কথা ছিল বলে আপনার সঙ্গে কয়েকটা বাতচিত…আলাপ আর কি করতে হচ্ছে। কী নাম আপনার? আমরা জানি নামটা, তবু একবার নিজের মুখে বলুন?”
ম্যানেজার দু মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, “নরেশ মজুমদার।”
“নরেশচন্দ্র মজুমদার,” কিকিরা বললেন মজার গলায়, “মাঝেরটা বাদ দেবেন না, মশাই, মাঝ হল স্যাকরার জোড়। আপনি তো পদ্মপুকুরে থাকেন?”
“হ্যাঁ। তাতে কী?”
“তালুকদারদের কাছে কাজ করেছেন ক’ বছর?”
“ষোলো বছর।”
“ষোলো।… নরেশবাবু, আপনি একটু গোলমাল করছেন। দু’ বছর বড়বাবুর কাছে চা বাগানে ছিলেন। উনি বোধ হয় আপনাকে তাড়িয়ে দেন। তারপর…”
“তাড়িয়ে দেননি। বনিবনা হয়নি।”
“এখন আপনার বয়েস বোধ হয় বাহান্ন-চুয়ান্ন! তা মশাই, আপনি ছোটবাবুর মাথায় কাঁঠাল ভাঙছিলেন–ভালই ছিলেন। হঠাৎ ঘটককে নিয়ে খেলতে গেলেন কেন? আপনি তাকে খুন করিয়েছেন।”
ম্যানেজার নরেশের মুখ ভয়ে আতঙ্কে কেমন যেন হয়ে গেল। চোখ স্থির। পাতা পড়ছিল না।
কিকিরা অপেক্ষা করতে লাগলেন।
নরেশ হঠাৎ চিৎকার করে বলল, “আপনি কে? পুলিশের মতন কথা বলছেন! ঘটককে আমি খুন করিয়েছি? কেন? কে বলেছে এ-কথা? ঘটকের ফ্যামিলি?”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। “না, তার ফ্যামিলির লোক আজও জানে না সে কোথায় হারিয়ে গিয়েছে! থানা পুলিশ ভবানী ভবন কম করেনি। নো ট্রেস! তবে আপনি জানেন ঘটক কেন খুন হয়েছিল।”
“আমি জানি?”
“জানেন। পাগলা হ্যারিশের হাতে লেখা একটা কাগজ আর কিছু লেখার কথা ঘটক দেখেছিল। চুরি করেছিল। আপনি তার কাছে দেখেছিলেন মাত্র; হাতাতে পারেননি। ঠিক সেইজন্যে এই বাড়িতে ঘটককে আপনারা খুন করেন।”
“মিথ্যে কথা। বানানো কথা।”
“মিথ্যে কথা!” কিকিরা রাজার দিকে তাকালেন। “রাজা! এ-বাড়িতে প্রায় চার বছর আগে খুন হয়েছিলেন একজন। তুমি জানো কে খুন করেছিল।”
রাজা বলবে কি বলবে না করে বলল, “আমি করিনি সার, আমাদের গুরু মায়ারাম করেছিল। সে গত বছর ব্যাঙ্ক ডাকাতি করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে।”
