কিকিরা বললেন, “শোনো, খুনোখুনির কাজ এটা নয়। সেরেফ গার্ড। ওই তেরো নম্বর বাড়িটা আমি একদিন ঘেরাও করতে চাই।”
“থানায় বলুন না।”
“না। থানায় বললে কাজ হবে না। …আর থানা যদি নজর রাখত ওই বাড়িতে কি গুন্ডাবদমাশদের আখড়া হত! আমি তোমায় বলছি ওখানে একটা ঘাঁটি আছে। জুয়া নেশাভাঙ…”
“আরে এ তো আজকাল শহরের রীতি হয়ে গেছে, মামু! এরা হল পাতি গুন্ডা। নোংরা কাজ করে পেট ভরায়। আমাদের টাইমে ছুঁচোগিরি ছিল না। হ্যাঁ– হাত পা চালাবার আগে হাঁক মারতাম। তাতেই সব ভড়কে যেত।”
“তুমি তা হলে লোক দিচ্ছ?”
“হয়ে যাবে।”
“আমরাও ক’জন আছি।”
“আমার তরফে ক’জন সোলজার লাগবে?”
“দু-তিনজন।”
“ভাববেন না। …সোলজাররা মেশিন তৈরি রাখবে?”
“মেশিন!”
ছেনু যেন মুখ আলো করে হাসল, তারপর হাত আর আঙুলের ইশারায় পিস্তলের ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিল।
কিকিরা সভয়ে মাথা নাড়লেন। “না না, ওসব একেবারেই নয়। অন্যরকম কিছু হলে বিপদে পড়ে যাব।”
ছেনু মাথা নাড়ল। “মামু, ভয় দেখাবার জন্যে বলছিলাম। চালাবে না।”
“না। দরকার নেই।” কিকিরা উঠে পড়বার জন্যে তৈরি। “আমি তোমায় কাল পরশুর মধ্যে দিনটা জানিয়ে দেব। ধরে নাও, এই হপ্তার শেষে। তুমি কথা বলে রাখবে।”
ছেনু মাথা হেলিয়ে সায় দিল।
উঠে পড়ে কিকিরা বললেন, “ছেনু, একটা কথা বলতে পারো? অবশ্য তুমি জানবে কেমন করে? ওই যে ভদ্রলোক নেপালবাবুর কাছে আমায় নিয়ে গিয়েছিলে–উনি কি গল্পগাছা করতেই ওস্তাদ, না, সত্যিই খোঁজখবর রাখেন…?”
ছেনু বলল, “উনি বুড়ো মানুষ। কর্পোরেশনে চরে বেড়িয়েছেন অনেককাল। এমনিতেও শুনেছি পেটে বিদ্যে আছে। এর বেশি কিছু জানি না, মামু!”
কিকিরা ছাতাটা উঠিয়ে নিলেন। ছেনুর ঠিক যা বলা উচিত তার বেশি কিছু বলেনি। সে এর বেশি কী বা জানবে!
“চলি ছেনু। যা বললাম মনে রেখো।”
কিকিরা রাস্তায় নেমে বুঝলেন, বৃষ্টির জোর সামান্য বেড়েছে।
.
দু’-দশ পা এগিয়ে একটা ট্যাক্সিই ধরেছিলেন কিকিরা। ঘড়ি দেখার দরকার নেই। আন্দাজেই বোঝা যায় আটটা বাজেনি এখনও।
জ্যাকির চেম্বারের বাড়িটার সামনে এসে ট্যাক্সি ছেড়ে দিলেন। একহাতে ছাতা ধরে আছেন, অন্য হাতে রুমাল। মুখের একপাশ রুমালে চাপা।
জ্যাকির রোগী দেখা প্রায় শেষ। কার যেন দাঁত ফিলিং করছিল। চেম্বারের ভেতর থেকে অস্পষ্ট কথা ভেসে আসছিল এক-আধবার।
সামান্য পরেই লোকটা বেরিয়ে এল। চিনে। মাঝ বয়েসি।
জ্যাকির চেম্বারে একটা ছোকরা থাকে, হিন্দি সিনেমার ফাইটারদের মতন মাথার চুল, ছোট ছোট, এক কানে একটা তামার আঙটা ঝোলানো।
কিকিরা চেম্বারে ঢুকে পড়লেন।
“অ্যাঙ্কল–?”
“চলে এলাম। …আজ তুমি কোনও ফোন পেয়েছ?”
মাথা নাড়ল জ্যাকি। এখনও পায়নি।
জ্যাকির অফিস-টেবিলটা দেওয়াল ঘেঁষে। জানলার দিকে দাঁত-তোলার হেলানো চেয়ার। হাত কয়েক তফাতে কাঁচের শেলফের মধ্যে নানা ধরনের যন্ত্রপাতি। একটা র্যাকে গোটা কয়েক ছাঁচ পড়ে রয়েছে দাঁতের।
কিকিরা বললেন, “ক’টা বাজল?”
“এইট ফিফটিন।”
“আর দশ-পনেরো মিনিট দেখো। যদি ফোন আসে ভাল কথা–” বলতে বলতে টেবিলের পাশে রাখা চেয়ারে গিয়ে বসলেন। চুরুট ধরালেন অন্যমনস্কভাবে। বললেন, “যদি আজ ফোন আসে, আমায় একবার গলাটা শুনতে দিয়ে। তবে কথা বলার সময় তোমায় একটা চালাকি করতে হবে। ঘাবড়াবে না, ভয় পাবে না। শুধু বলবে… কী বার যেন আজ, মঙ্গলবার, এগারো তারিখ, …বলবে আসছে রবিবার সাড়ে সন্ধের পর তোমায় তেরো নম্বরে মিট করতে।”
“আমায় মিট করতে বলব?” জ্যাকি কিছুই বুঝল না।
“বলবে। বলবে, তুমি একটা মিটমাট করতে চাও। সেটেলমেন্ট। এভাবে চলতে দিয়ে লাভ নেই। তা ছাড়া, তুমি যদি তার সামনাসামনি বসে কথা বলতে পারো তারও লাভ হবে। তোমার হাতে এমন একটা ইনফরমেশান আছে– যাতে সে হাত লাগালে অনায়াসে কয়েক লাখ টাকা বানাতে পারে। মানে– দু’ জনে ভাগাভাগি হলেও ফিফটি ফিফটি– সে লাখ কয়েক হাতে পেয়ে যেতে পারে।”
জ্যাকি কথা বলতে পারছিল না। মাথায় ঢুকছিল না, কী বলছেন কিকিরা। বোকার মতন তাকিয়ে থাকল। “অ্যাঙ্কল, লাখ টাকা লাখ লাখ টাকা–হোয়ার ফ্রম! আর ইউ ম্যাড?”
কিকিরা বললেন, “কী করব হে বাপু! আর কিছু মাথায় আসছে না। এটা আমার বাজি ধরা। প্লেয়িং লাস্ট কার্ড! লাগলে লাগবে, না লাগলে তোমায় বলব, তেরো নম্বর বাড়ির আশা ছেড়ে দেওয়াই ভাল। দাদনের টাকা তুমি ফেরত পাবে কি পাবে না আমি জানি না। একটা কাঁচা লেখাপড়া কী করেছ তালুকদারদের সঙ্গে, আমি বাপু জানব কেমন করে!”
জ্যাকি বলল, “আজ যদি ফোন না আসে? রোজ তো আসে না।”
“কাল আসবে, পরশু আসবে…! এলেই যেমনটি শিখিয়ে দিলাম বলবে লোকটাকে। তারপর আমায় খবর দিয়ে আসবে। হাতে আমার অন্তত দু’-একটা দিন থাকা দরকার। …মাঝে চারটে দিন রইল। দেখো কী হয়।”
সাড়ে আটটা বেজে গেল।
জ্যাকি বলল, “আর ওয়েট করবেন?”
“না, চলো।”
“আমি সঙ্গে যাই।”
“না। আমি পেশেন্টের মতন এসেছি। পেশেন্টের মতন চলে যাব।”
“অ্যাঙ্কল ওদের ওয়াচ-ম্যান আছে…”
“আমার কিছু হবে না। এখানে ট্যাক্সি পেয়ে যাব।”
“নীচে পানওয়ালা আছে। আপনি ওয়েট করবেন। ট্যাক্সি পেলে তবে–”
“ঠিক আছে।”
কিকিরা ছাতা তুলে নিয়ে চলে যাওয়ার আগে আরও একবার মনে করিয়ে দিলেন জ্যাকিকে কী কী বলতে হবে ফোন পেলে।
