“পায়নি। ভাবছে পাবে। মাঝে মাঝেই বোধ হয় তল্লাসি চালায়। কিন্তু কী পাবে! হ্যারিশ এখানে কোন গুপ্তধন লুকিয়ে রেখে গিয়েছে? কোথায়?”
তারাপদ বলল, “কিকিরা যে-লোক বাড়ি মর্টগেজ দিয়ে আর ছাড়াতে পারেনি, হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে তার ভিটে, পাগলা আর ভিখিরি হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে– মারা গিয়েছে চ্যারিটেবল হাসপাতালে, তার আর কী গুপ্তধন থাকবে! থাকলে এমন অবস্থা তার হয়!”
জ্যাকি বলল, “ইট ইজ টু, অ্যাঙ্কল। টাকা থাকলে কেউ ভিখ মাগে?”
কিকিরা বললেন, “তোমরা হয়তো ঠিকই বলছ। কিন্তু এমন জিনিস যদি হয়– যা বাজারে বিক্রি করা যাবে না। কিংবা বিক্রি করতে রাজি হয়নি হ্যারিশ।”
“তা হলে সেটা সে এ বাড়িতে ফেলে যাবে কেন? সঙ্গে করে নিয়ে যাবে।”
“তাতে বিপদ হত। …আচ্ছা, এ বাড়িতে সে তো তার নিজের কফিন বাক্সও রেখে গিয়েছিল। সে কোথায় মারা যাবে, কবে মারা যাবে নিজে কি জানত সে! তবু কফিন বাক্সটা রেখে গেল কেন? কেন এই ঘরে বসে বসে নিজের কফিন বাক্স বানাল। তার কি মনে হয়নি– হ্যারিশ মারা যাওয়ার পর কার দায় পড়েছে তার কফিন বাক্স খোঁজ করার!”
কোনও জবাব পাওয়া গেল না।
তারাপদ হঠাৎ বলল, “কিকিরা, তা হলে কি হ্যারিশ মারা যাওয়ার আগে কিছু লিখে গিয়েছিল কাগজে?”
“আমার তো তাই মনে হয়। শিবপুরের ঘটক–তালুকদারদের লোক– সেটা হাতে পেয়ে যায়। তার বাবুদের কাছে আর দেয়নি কাগজটা। নিজেই খুঁজে দেখতে গিয়েছিল ব্যাপারটা কী! দেখতে গিয়ে ও মরেছে।”
“মরেছে।”
“আমার আন্দাজ। এ বাড়িতে প্রথম খুন হয় বছর চারেক আগে। তালুকদারদের কথামতন হিসেবটা মিলে যাচ্ছে না, তারাপদ?”
“হ্যাঁ, সেদিক দিয়ে দেখলে মিলছে একরকম।”
“দ্বিতীয় খুন?” চন্দন জিজ্ঞেস করল।
“বলতে পারছি না। তবে ঘটকের মতন কেউ নাও হতে পারে। গ্যাং কেস।”
“কে সে?” তারাপদ বলল, “অযথা–”
কিকিরা যেন কথাটায় কান দিলেন না। ঘরের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে বললেন, আপন মনে, “আমি দুটো ব্যাপারে প্রায় নিশ্চিত। এক, এই বাড়ি বলো ঘর বলো কতকগুলো মিসক্রিয়েন্টের গুন্ডা খুনি ক্লাসের লোকের মিটিং প্লেস। তারা এখানে এমন অনেক কাজ করে, যা চোখের আড়ালে করা সুবিধের। এটা তাদের জমিদারি, কাউকে হাত বাড়াতে দেবে না। সাধারণ মানুষের সাধ্য নয় তেরো নম্বর কিনে তার পজেশান নিতে পারে। জ্যাকির মতন অবস্থা হবে। ঠিক এইজন্যেই খদ্দের জোটে না বাড়িটার।”
তারাপদ ঠাট্টার গলায় বলল, “আমাদের এখানে এটা নতুন কিছু নয়, সার। কত বাড়ি শুনি বেওয়ারিশ সম্পত্তির মতন পাড়ার মাম্যানরা অকোপাই করে নিয়েছে। তাদের পেছনে আবার সাপোর্ট থাকে…।”
চন্দন অনর্থক কথা থামিয়ে দিয়ে কিকিরাকে বলল, “কিকিরা, এই বাড়ি, ঘর– একটা ‘ডেন অব মিসক্রিয়েন্টস’– সেটা ধরেই নিচ্ছি। আপনার আরও একটা কথা আছে বলবার। সেটা কী?”
“সেটা এই যে, এখানে অত্যন্ত মূল্যবান একটা কিছু রয়েছে লুকোনো।”
“কী?”।
“নেপালবাবুর কথা যদি সত্যি হয় তবে বিশ্বাস করতে হয় পর্তুগিজ সাহেব যে ক্রশটি চুরি করেছিলেন পাদরি পেইজ-এর সেই জিনিসটি…”
“অসম্ভব।”
“কেন! কোথাকার পাদরি পেইজ…”
“নেপালবাবু বলেন, আফ্রিকার।… ওটা নাকি গল্প নয়। বিখ্যাত পারি। পর্তুগিজ। নিজের দেশ থেকে আফ্রিকায় গিয়েছিলেন।
“আমি বিশ্বাস করি না। ক’ শো বছর আগেকার এক গল্প…”
“তিন-চারশো বছর আগেকার ধরে নাও। পাদরির ক্রশটা তো তার গলায় তখন ঝুলত না। চার্চে ছিল। হয় অ্যাবেসেনিয়ার, না হয় লিসবনের কোনও চার্চে। কেউ চুরি করেছিল। আমাদের পর্তুগিজ সাহেবের হাতে আসে জিনিসটা। লোকটি আদতে ছিল সেলার। পরে এ দেশে এসে ঠিক কোথায় উঠেছিল, কালিকট না কোচিন বলা মুশকিল। শেষে কবে থেকে গুছিয়ে বসে কলকাতায় এসে…”
জ্যাকিও মাথা নাড়ল। বলল, সে এরকম কোনও কথা আগে শোনেনি, পর্তুগিজ সাহেবের।
তারাপদ বলল, “আপনি এখনও সেই ক্রশের কথা ভাবছেন! যদি সেটা থেকেও থাকে, পাগলা হ্যারিশের হাতে যাবে কেমন করে?”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। “যাওয়ার কথা নয়। তবে ঘটনাচক্রে অনেক অঘটনই ঘটে যায়। দু-চারশো বছরের আগেকার জিনিস হামেশাই হাতে এসে যায় আচমকা। …বেশ তো, তোমরা বিশ্বাস কোরো না। তবে আমি একবার চেষ্টা করব। মনে হয় না, জিনিসটা যদি থাকেও, অবিকল সেইভাবে পাব। তবে পর্তুগিজ সাহেব যদি দয়া করে থাকেন একটা আঁচ পেতে পারি।” চন্দন বলল, “ঠিক আছে। এখন চলুন। বিকেল পড়ে আসছে।”
.
১০.
বাইরের ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। সন্ধেও হয়ে এল।
ছেনুর রেস্তরাঁয় ছোট একটা খুপরি আছে পেছন দিকে। ওই খুপরিতে বসে ছেনু মাঝে মাঝে জিরিয়ে নেয়, হিসেবের খাতাপত্র দেখে কখনও। আবার গল্পগুজবও করে পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে।
কিকিরাকে সেই খুপরিতে বসিয়ে ছেনু কথা বলছিল। কিকিরার সামনে চায়ের কাপ। দুধে একেবারে সাদা। চিনিরও মাত্রা নেই।
কিকিরার কথা শুনে ছেনু তার গোঁফ একটু চুলকে নিল। তারপর বলল, “মামু, আমি নিজে আর কোথাও হাত লাগাই না আপনি জানেন। দীক্ষাটিক্ষাও নিয়ে নিয়েছি। পুজো আর্চা করি না করি, বাড়িতে মা কালীর মূর্তির পায়ে দুটো জবাফুল না দিলে শান্তি পাই না। ও-কথা যাক, আপনার দরকারে দু-চারটে সোলজার আমি জুটিয়ে দিতে পারব।”
