জ্যাকি পকেট থেকে চাবি বার করতে করতে বলল, “ অ্যাঙ্কল, আমিও এই ঘরে আর ঢুকিনি।”
কিকিরা মাথা হেলালেন, “তালাটা খোলো।”
বাড়িটার চারপাশে জমানো ইটকাঠের প্লাস্টারের চাঙড়ের আবর্জনা এখন মোটামুটি পরিষ্কার। কুলিমজুর আর কাজ করছে না। বন্ধ করে রেখেছে জ্যাকি এখনকার মতন। বাইরে থেকে বাড়িটাকে ভাঙাচোরা খাঁচার মতন দেখাচ্ছিল প্রায়।
জ্যাকি দরজার তালা খুলল।
ঘরে আলো নেই। জানলাটা খুলে দিল জ্যাকি। সময় লাগল খুলতে।
চন্দন ঘরটা দেখল। তারপর তারাপদকে নিয়ে জানলার কাছে সরে গেল।
প্রথম থেকেই চন্দনের চোখে পড়েছে–জানলাটা খড়খড়ি করা, অথচ না আছে কাঁচ, না লোহার শিক বা গরাদ। মানে একেবারে ফাঁকা জানলা। তার ওপর একটা পাল্লার সঙ্গে জানলার ফ্রেমের ভাঙা মরচে ধরা কবজা থাকলেও অন্য পাল্লার কবজা নেই। মামুলি তার জড়িয়ে যেন আলগা করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। জানলার গায়ে পেয়ারা গাছ।
চন্দন গাছটা দেখছিল। বর্ষায় তেজি হয়ে উঠেছে।
কিকিরা হঠাৎ বললেন, “জ্যাকি, ওটা কী? কাদার ছাপ?”
জ্যাকি ঝুঁকে পড়ে মেঝে দেখল। দু-তিন জায়গায় দাগ। বলল, “ফুট প্রিন্ট! ছাপ অ্যাঙ্কল?”
“এই ঘরে কেউ এসেছে। আসে। আগে কি পায়ের ছাপ দেখছ?”
জ্যাকি ভাবল কিছুক্ষণ। আগে এই ঘর এত ময়লা আবর্জনায় ভরা ছিল যে, দাগ চোখে পড়ার কথা নয়। পরে সে আর তার ভাই মিলে ঘরটা পরিষ্কার করেছে ঠিকই, তবু কালচে মেঝেতে দু-চারটে দাগ তারা খেয়াল করে লক্ষ করেনি।
জ্যাকি বলল, “বলতে পারব না অ্যাঙ্কল!”
“তুমি বলছ, পায়ের দাগ দেখছ এখন?”
“হ্যাঁ।”
চন্দন জানলার কাছ থেকে বলল, “কিকিরা, আমি একবার নীচে থেকে ঘুরে আসছি।” বলতে বলতে সে পাল্লা-খোলা জানলা দিয়ে গলে গিয়ে পেয়ারা গাছের ডাল ধরল। পুরো ডালটা বেঁকে গেল, শব্দ হল পাতার। তারাপদ আঁতকে উঠল। “পড়বি!”
চন্দন ঝুলতে ঝুলতেই কায়দা করে বড় শক্ত ডাল ধরে ফেলল। তারপর নেমে গেল গাছ বেয়ে।
কিকিরা জানলার কাছে সরে এসেছিলেন তারাপদর আচমকা চিৎকার শুনে। নীচে তাকিয়ে দেখলেন। চন্দন শহুরে ছেলে নয়, গাছে চড়া, সাঁতার কাটা–এসব সে ছেলেবেলা থেকে শিখেছে। কোন গাছের কোন ডালটা বেশি পলকা সে আন্দাজ করতে পারে।
চন্দন মাটিতে নেমে গিয়ে কী দেখতে লাগল।
কিকিরা জ্যাকিকে বললেন, “ঘরটা ভাল করে দেখো, আর কী পাওয়া যায়?”
জ্যাকি প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে ঘরের চারপাশ দেখতে লাগল।
তারাপদ বলল, “কিকিরা এই ঘরের বাইরে তালা থাকলে কী হবে, জানলা দিয়েই তো আসা-যাওয়া করা যায়।”
কিকিরা বললেন, “যায় দেখছি।” বলেই চন্দনকে কী যেন বললেন জানলা দিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে, তারপর তারাপদর দিকে ঘাড় ঘোরালেন। “ব্যাপারটা বুঝতে পারছ?”
“কী?”
“এই ঘরের বাইরের দিকে দরজায় যে কাঠের তক্তা মারা ছিল সেটা স্রেফ ব্লাফ। মানে, তুমি যেন ওই বেয়াড়া তক্তামারা ক্রশ দেখে ভেতরে আসতে না চাও। ভাবো, ঘরে ঢোকা নিষেধ। কিংবা ভয়ের। বা ধরো কোনও আপদ-বিপদ…”
“সার,” চন্দন নীচে নেমে ডাকল।
কিকিরা মাথা ঝোঁকালেন, “কী হল?”
“সার, গাছতলার মাটিতে জুতোর বড় বড় দাগ। বৃষ্টিতে কাদাটে হয়ে রয়েছে। জায়গাটা।”
“বুঝেছি। তুমি চলে এসো।”
জ্যাকি সারা ঘর খুঁজে কয়েকটা জিনিস পেল, দেশলাইয়ের কাঠি, সিগারেটের পোড়া টুকরো, একটা তাস। হরতনের গোলাম।
কিকিরাকে জিনিসগুলো দেখাল জ্যাকি।
“বাঃ, বাঃ, এই ঘরে একটা আসর বসে তবে?” ঠাট্টার গলায় বললেন কিকিরা। “মোমবাতি-টাতির টুকরো পেলে না?”
“না।” জ্যাকি মাথা নাড়ল।
তারাপদ বলল, “মোমবাতির কারবার এখন উঠে যাওয়ার মতন। আজকাল অনেকরকম হালকা আলোর ল্যাম্প পাওয়া যায়। ফ্যান্সি ল্যাম্প, ব্যাটারিতে জ্বলে। মিঠে আলো হয়।”
কিকিরা তাসটা দেখতে দেখতে বললেন, “ঠিক বলেছ! মোমবাতির আলো বাইরে থেকে চোখে পড়ে। মানে উলটো দিকের বাড়ি থেকে আলো চোখে পড়তে পারে। হালকা আলোর বেলায় সেটা হয় না। অতটা ছড়াতে পারে না।”
জ্যাকি বলল, “কারা আসে এখানে অ্যাঙ্কল?”
“ধৰ্মপুত্তুররা আসে না। …গুন্ডা বদমাশদের ভাল আখড়া হয়েছে এখানে। নো ডাউট অ্যাবাউট ইট। কিন্তু তারা কোথাকার? এই পাড়ার?”
চন্দন ফিরে এল। জানলা গলেই।
“সার, নীচে জুতোর দাগ দেখলাম। স্পষ্ট।”
“এগুলোও দেখো।”
চন্দনকে তাস, সিগারেটের টুকরো, দেশলাইকাঠিও দেখানো হল। দেখল চন্দন। বলল, “এ ঘরে যারা লুকিয়ে আসে”
বাধা দিয়ে কিকিরা বললেন, “আমার মনে হয় অনেক আগে থেকেই আসে। এটা তাদের মিটিং প্লেস। ভাঙা পুরনো বাড়ি, একটেরে একটা ঘর ছাদে ওঠার মুখে। এমন সুবিধের জায়গা আর হয় নাকি! জ্যাকি বাড়ি কেনার পর আসা-যাওয়া করছে দেখে হালে হয়তো সাবধান হয়েছে। তারাই বোধ হয় এই ঘরের দরজার বাইরে তক্তা মেরে বন্ধ করে দিয়েছিল, যাতে অন্য কেউ না এসে পড়ে।”
“কেন?”
“কেন! খানিকটা বুঝতে পারছি, পুরোটা পারছি না। এটা গুমঘর। ঘরের মধ্যে তোক বা না হোক- এই বাড়িতে দুটো খুন হয়েছে। এই ঘরে পাগলা হ্যারিশের কফিন বাক্স এখনও পড়ে আছে। লোককে ভয় পাওয়ানোর পক্ষে যথেষ্ট ভাল পাবলিসিটি।
“কালো ট্রাঙ্কটাও।”
“চাঁদু, আমার বিশ্বাস দুষ্কর্মের জায়গা তো বটেই, ঘরটার মধ্যে কিছু খোঁজটোজও চলতে পারে।”
“কী খুঁজবে সার? এতদিনেও খুঁজে পেল না?”
