ছোটবাবু ঘামতে লাগলেন। তারপর হাত জোড় করে বললেন,”মশাই, প্লিজ এসব বন্ধ করুন।”
কিকিরা তারাপদকে ইশারা করলেন। দড়ি ছেড়ে দিল তারাপদ।
গলার ফাস খুলতে খুলতে কিকিরা বললেন, “এতেই আপনি ঘাবড়ে গেলেন। এটা কিছু নয়। ভ্যাসি বলে এক ম্যাজিশিয়ান ছিল। বত্রিশ রকম নট’ মানে ওই গিট আর রোপ ট্রিকস– সাফাইয়ের খেলা দেখাত। একে বলে ‘জিরো নট’ মানে যে ভাবে গিট বেঁধে দেব, তার চেয়ে এক সুতোও আর আগু-পিছু নড়বে না।”
কপাল চোখমুখের ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, “চুলোয় যাক আপনার ভ্যানসি ফ্যাসি। এবার দয়া করুন, আসুন।”
“যাব ঠিকই। কিন্তু কথাটা শেষ হল না যে!”
“আবার কী কথা!”
“বাড়িটার হাত বদল?”
তারাপদ কিকিরাকে বলল, “আমি বেশিদিন বসে থাকতে পারব না।” শেখানো কথা ছাড়া কিছু নয়।
ছোটবাবু বললেন, “এখন আপনারা যান, পরে ভেবে দেখব।”
কিকিরা বললেন, “শুনুন তালুকদারবাবু! আপনি হয়তো ঘাবড়ে যাবেন–তবু বলি, আমরা খোঁজখবর করে জেনেছি, পাগলা হ্যারিশ বলে যাকে আপনার লোক শনাক্ত করে এসেছিল সে একটা জিনিস লুকিয়েছে।”
ছোটবাবু ভয়ে কেমন আঁতকে উঠলেন, “কী বলছেন আপনি!”
“আমি ঠিক বলছি। পাগলা হ্যারিশ বেহালার যে চ্যারিটেবল মিশনারি সিক হোমে ছিল সেখানে আমরা দু’দিন আগে গিয়েছিলাম। হ্যারিশের শরীরের অবস্থা এত খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে, তার কোনও প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না। ওষুধবিষুধ কাজ করছিল না আর। নিউমোনিয়া হয়ে সে মারা যায়।”
তালুকদার অস্বীকার করলেন না।
“আপনার কাছে বলতে আপত্তি নেই, আমি একা বেহালায় যাইনি, সঙ্গে আমার একজন ডাক্তার ছিল।” কিকিরা আর চন্দনের নাম বললেন না। “ঠিক কীভাবে হ্যারিশ মারা গেল, তা নিয়ে সে কথাবার্তাও বলল।”
“তা আমি কী করব! আমি কি তাকে মেরেছি?”
‘না! আপনি মারেননি। কিন্তু হ্যারিশ মারা যাওয়ার আগে একটা ডাইরি বইয়ের মধ্যে পেনসিলে কয়েকটা কথা লিখে রেখেছিল। লিখে একটা খামে ঢুকিয়ে রেখেছিল। আপনার লোক সেটা নিয়ে আসে।”
তালুকদার যেন আকাশ থেকে পড়ছেন। “কী বলছেন?”
“আমি ঠিক বলছি। সেই ডাইরিটা কোথায়?”
“কী মুশকিল” ছোটবাবু যেন ধৈর্য হারিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “মশাই একটা পাগলার দু’-চার ছত্র লেখা নিয়ে আমি কী করব! ও যদি আমাদের কথা নিজে না জানিয়ে যেত, আমরা ওর মারা যাওয়ার কথাও জানতাম না। নেহাত একসময়ের চেনা লোক বলে খবর পেয়ে আমার এখান থেকে একজন গিয়েছিল। নয়তো কেউ যেত না। এ দেখছি, রাস্তার আপদ ঘরে টেনে আনা!”
“আপনি সত্যি কথা বলছেন?”
“কেন! কী দুঃখে মিথ্যে বলব!”
“বেশ। কে গিয়েছিল আপনার এখান থেকে?”
“ম্যানেজার জানে! ডাকব তাকে?”
ডাকাডাকির পর ম্যানেজার হাজির।
ছোটবাবু তিরিক্ষে মেজাজে বললেন, “নাগমশাই, ওই পাগলা হ্যারিশকে শনাক্ত করতে কে গিয়েছিল এখান থেকে?”
ম্যানেজার ঘরের অবস্থাটা অনুমান করতে পেরেছিলেন। অল্প সময় চুপ করে থেকে বললেন, “ঘটক গিয়েছিল, সুশীল। কেন বাবু?”
“ও কি একটা খাতাটাতা এনে জমা দিয়েছিল আপনার কাছে?”
“না।”
“ঘটক কোথায়?”
“এ আপনি কী বলছেন বাবু? ঘটক তো কবেই চাকরি ছেড়ে চলে গিয়েছে।”
উত্তেজনার মাথায় কথাটা প্রথমে খেয়াল হয়নি। পরে খেয়াল করতে পারলেন। তিনি কী বলতে কী বলে ফেললেন! ঘটক তো কবেই চলে গিয়েছে। নিজেই। বিব্রতভাবে একবার কিকিরা আরেকবার ম্যানেজারের দিকে তাকালেন, “আমারই মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে।”
কিকিরা ম্যানেজারকে বললেন, “ঘটকের বাড়ি কোথায়?
“শিবপুর। তবে তাকে কি আর আপনি দেখতে পাবেন?”
“কেন?”
“শুনেছি একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল কালীঘাটে পুজো দিতে যাচ্ছি বলে, আর সে বাড়ি ফেরেনি।”
তারাপদ চুপচাপই ছিল। তার অস্বস্তি হচ্ছে। ঘামছিল। হঠাৎ বলল, “কবে ঘটেছে এটা?”
“ক-বে! হিসেব করে বললে মোটামুটি বছর তিন-চার আগে!”
কিকিরার দিকে তাকালেন ছোটবাবু। “সুশীল ঘটকের এক ভাই আমাদের সলিসিটার অফিসে টাইপিস্টের কাজ করে। জেঠতুতো খুড়তুতো ভাই। সে বলতে পারে ঠিকঠাক।”
কিকিরা আর কিছু বললেন না।
খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে ম্যানেজার বললেন, “বাবু আমি যাই?”
ছোটবাবু হাত নাড়ার আগেই কিকিরা বললেন, “আসুন আপনি।”
ম্যানেজার চলে যাওয়ার পর কিকিরা কিছুক্ষণ চুপচাপ ভাবলেন কী যেন; শেষে ছোটবাবুকে বললেন, “আপনি এখানে কতদিন বসছেন? কিছু মনে করবেন না!”
“বছর দশেক।”
“দাদারা কোথায় বসেন?”
“বড়দা আমাদের বৈমাত্রভাই। উনি চা বাগানের ব্যবসা দেখতেন। ডুয়ার্সেই ছিলেন। হার্টের অসুখের পর শিলিগুড়ি।”
“মেজোদাদা?”
“আমরা কলকাতাতেই থাকি। তবে আলাদা বাড়িতে। মেজদা অন্য ব্যবসা অফিস দেখে। সে খানিকটা বেআক্কেলে, টাকাপয়সা নয়ছয় করে, বড় মেজাজি…”
কিকিরা আর কথা বাড়ালেন না। বললেন, “তালুকদারমশাই, আপনি মানে আমার মনে হচ্ছে অনেক কিছুর খোঁজ রাখেন না। তা কিছুদিনের মধ্যে হয়তো শুনবেন আপনাদের হায়দার লেনের তেরো নম্বর বাড়ি নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছে। অবাক হবেন না। আজ আমরা চলি। পরে আবার দেখা হতে পারে। ভাল কথা, দাঁতের ডাক্তার জ্যাকিকে ঠকাবেন না। অবশ্য সব যদি ভালয় ভালয় মিটে যায়। চলি।”
.
০৯.
তাড়াহুড়ো করার উপায় ছিল না। দিন কয়েক সময় গেল অন্য ক’টা কাজ সারতে।
পরে সদলবলে কিকিরা তেরো নম্বর বাড়িতে এসে হাজির। দুপুর তখন ফুরিয়ে আসছে। আগের দিন বৃষ্টি হয়েছিল। আজ শুকনো।
