“ঘুরে এসে বলব।” বলে তারাপদকে উঠতে বললেন ইশারায়।
“তাড়াতাড়ি করবেন। ছোটবাবু আধঘুমে ছিলেন। তাঁকে বিরক্ত করবেন না বেশি।”
“না না–তাই কি করি! কাজের কথা বলেই চলে আসব।”
তারাপদকে নিয়ে কিকিরা ছোটবাবুর ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। ফিসফিস করে বললেন, “যা যা শিখিয়েছি তার বাইরে একটাও কথা বলবে না। ধরা পড়লেই মুশকিল।”
মাথা নাড়ল তারাপদ।
ম্যানেজারমশাইয়ের দফতরখানার বাইরে এসে ঢাকা বারান্দা দিয়ে ডাইনে হাঁটলে কোনাকুনি একটা বাঁক, তার গায়েই ছোটবাবুর ঘর। কিকিরা আগে একবার এসেছেন। ঘরটা চেনেন।
তালুকদারদের ছোটবাবুর ঘরের দরজা খোলাই ছিল। গরমকালে একটা পরদা ঝুলত খসের। এখন সেটা গুটোনো।
কিকিরা তারাপদকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন ছোটবাবুর। ঢুকেই হাত জোড় করে নমস্কার করলেন। তারাপদ খেয়াল করেনি প্রথমে, পরে আধাআধি একটা নমস্কার সেরে ফেলল।
ছোটবাবুর ঘরে ফরাস পাতা। আবার একপাশে লম্বাটে সোফাও। তিন-চারটি চেয়ার টেবিলও আছে একটা। দেওয়ালের সঙ্গে গেঁথে-রাখা ছোট সিন্দুকবা আয়রন চেস্ট। পাখা ঘুরছিল। সস্তা এক ম্যাপ টাঙানো কলকাতা শহরের। দেওয়াল ঘড়ি, ক্যালেন্ডার।
ছোটবাবুর চেহারা দেখে বোঝা যায় ভদ্রলোক একসময় রীতিমতন স্বাস্থ্যবান ছিলেন। এখন স্বাস্থ্য নেই, কাঠামোটা রয়েছে। গায়ের রং কালো। ধারালো ধাঁচ মুখের। চকচকে চোখ। চশমা পরেন। মাথার চুল ছোট ছোট। বয়েস পঞ্চাশের গায়ে গায়ে।
ফরাসের ওপরেই তাকিয়ায় হেলান দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় ছিলেন ছোটবাবু। কিকিরাদের দেখলেন।
“আপনি ক’দিন আগে একবার এসেছিলেন না?” ছোটবাবু বললেন।
“আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনার মনে আছে”
“তেরো নম্বর বাড়িটার খোঁজখবর করছিলেন?”
“যথার্থ।”
“আজ আবার কেন?”
কিকিরা তারাপদকে দেখালেন। “এটি আমার মক্কেল বলতে পারেন। বাইরের দিকে প্রমোটারি শুরু করেছে, চুঁচড়ো বাঁশবেড়ে..! বেশিদিন হয়নি। বছর দুই তিন। তাতেই দু’পয়সা এসেছে। না, সেরকম কিছু নয়। তবে হালে ও কলকাতায় কাজকর্ম করতে চায় অল্পস্বল্প। ধরুন লাখ আট-দশ..”।
ছোটবাবু তারাপদকে দেখলেন। চেহারা দেখে দু’ লাখের কারবারিও মনে হয় না। তবে আজকাল যা অবস্থা হয়েছে, কার পকেটে কালো তাসের ক’টা টেক্কা সাহেব বিবি, বোঝা যায় না। “তা আমি কী করব?”
“আজ্ঞে, আমি একটা কথা ভাবছিলাম। আপনি একটু বিবেচনা করুন। … বলছিলাম যে ওই তেরো নম্বর বাড়ির জন্যে আপনি লাখখানেক টাকা দাদন নিয়েছেন। কিন্তু বাড়িটা শেষ পর্যন্ত কি বিক্রি হবে?”
“কেন?”
“দাঁতের ওই চিনে ডাক্তার বোধ হয় ও-বাড়ি আর কিনবে না।”
“কে বলল?”
“আমার সেরকমই মনে হচ্ছে। আপনি তো জানেন, আগের বারই বলেছি, ওর সঙ্গে আমার জানাশোনা আছে খানিকটা। ওর মায়ের সঙ্গেও। বাপের সঙ্গেও ছিল কিন্তু বাপ তো আর নেই। গতবার আমি ওর জন্যেই এসেছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি, ডাক্তারের হাতে টাকা নেই তেমন। ধারধোরের চেষ্টা করছে। তা ছাড়া ওই বাড়িতে পা দেওয়ার আগেই ওকে ঝাট ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে মশাই। লোকে ভয় দেখাচ্ছে, শাসাচ্ছে। চিনে ডাক্তারের মা একেবারেই রাজি নয় এখন।”
“সে ওদের ব্যাপার। দাদনের টাকা আমি ফেরত দেব না তা বলে!”
“আমি বলছিলাম, হাত বদল হয়ে যাক না–” কিকিরা তারাপদকে দেখালেন। “ধরুন, এ যদি আপনাকে লাখ চারেক দাদন দেয়–আপনি আগের পার্টিকে তার টাকা ফেরত দিয়ে ওকে কাটিয়ে দিলেন।”
ছোটবাবু সোজা হয়ে বসলেন। সামান্য চুপ করে থেকে সিগারেটের প্যাকেট তুলে নিয়ে দেশলাই খুঁজতে খুঁজতে বললেন, “আপনি আশ্চর্য লোক মশাই, কদিন আগে একজনের হয়ে দালালি করতে এসেছিলেন, আজ আবার অন্য একজনকে সঙ্গে নিয়েই এসেছেন দালালি করতে! দালালদেরও একটা নীতি থাকে। আপনার সেটাও নেই।”
কিকিরা হাসলেন। মুচকি হাসি। বললেন, “জ্যাকি পারবে না বলে আমি একে এনেছি। নীতির কথা তুলছেন কেন! … তা ছাড়া আপনি তো জ্যাকিকে বাড়িটা বেচে দেননি এখনও। দেব বলেছেন। আপনাদের নিজেদের মধ্যেই গোলমাল। শরিকি বিবাদ। কে কত পাবে …”
“চুপ করুন।” ছোটবাবু ধমকে উঠলেন, “আমাদের গোলমাল আমাদের ব্যাপার। সেটা মিটে যাবে। সেটেল হয়ে যাবে। বাড়ি আমি ওই দাঁতের ডাক্তারকেই দেব–যদি দি।”
কিকিরা তারাপদর দিকে তাকালেন একবার। তারপর কখন যেন পকেট থেকে নাইলনের এক দড়ি বার করে নিলেন। ফাঁস লাগাতে লাগাতে বললেন, “তা হলে তো আপনার চোখের সামনে আমায় গলায় দড়ি দিতে হয়। বাবু আমি যে এর সঙ্গে পঁচিশ হাজার টাকার রফা করেছি। ছি ছি!”
ছোটবাবু সিগারেট ধরিয়ে নিয়েছেন ততক্ষণে।
নাইলনের দড়ির গোল বড় ফাঁসটা কিকিরা নিজের গলায় গলিয়ে তারাপদর হাতে বাকি প্রান্তটা তুলে দিলেন।
“কী করছেন কী?” ছোটবাবু ভয় পেয়ে গেলেন। “আমি চেঁচিয়ে লোক ডাকব।”
“ডাকুন। তারাও সবাই দেখবে।” বলে কিকিরা চোখের ইশারায় তারাপদকে দড়ির প্রান্ত টানতে বললেন। এ বড় অদ্ভুত দৃশ্য। কিকিরার গলায় দড়ির ফাঁস লাগানো গোল করে, আর তারাপদ সেই দড়ির একটা প্রান্ত ধরে টানছে।
ছোটবাবুর মুখ থেকে জ্বলন্ত সিগারেটটা পড়ে গেল কোলের ওপর। লাফিয়ে উঠে তাড়াতাড়ি আগুন নেভালেন।
তারাপদ এমন ভাব করল যেন দড়িটা টানছে। ফাসটাও কিকিরার গলায়। কিন্তু কী অবাক ব্যাপার, দমবন্ধ হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই কিকিরার। ফাস যেন গলা জড়িয়ে আটকেই থাকল, শক্ত হল না, চাপও লাগল না। আর তারাপদর হাতে ধরা দড়ির অংশটা দু-তিনটে টুকরো হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
