লোকটা দু মুহূর্ত তারাপদদের দেখল। তারপর বলল, “তোমাদের জন্যে ঘর ঠিক করা হয়েছে, এসো।”
তারাপদ বলল, “আমরা ভুজঙ্গবাবুর সঙ্গে দেখা করব।”
“এখন নয়। গুরুজির অসুখ। তিনি বিকেলের পর দেখা করবেন।”
তারাপদ কী ভেবে বলল, “একবার একটুর জন্যে দেখা করা যায় না?”
“না; এখন নয়। দেখা করার সময় তিনি নিজেই দেখা করবেন।”
তারাপদ ঢোক গিলল। চন্দন একটাও কথা বলছিল না। লোকটাকে দেখছিল। তার মনে হল, লোকটা মোটামুটি টেরা, গলার কাছে একটা জায়গা ফোলা, থায়রয়েড় গ্ল্যান্ডের গোলমাল আছে বোধ হয়, চোখ দুটোও যেন সামান্য ঠেলে বেরিয়ে আসার মতন লাগছে।
তারাপদরা ঝোলাঝুলি নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
আবার বারান্দায়। লোকটার পিছু পিছু হেঁটে বাড়ির একেবারে শেষ দিকে একটা ঘরে তারা এসে দাঁড়াল।
তারাপদ কী বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই লোকটা বলল, “আমার নাম মৃত্যুঞ্জয়। এখানে আমায় সকলে ছোট মহারাজ বলে।” বলেই তারাপদর দিকে তাকাল, “গুরুজি আদেশ দিয়েছেন, তোমার কাছে কাগজপত্র যা আছে, আমার হাতে দিতে। গুরুজি দেখবেন।”
তারাপদ ভাবল আপত্তি করে। কাগজপত্রগুলো নিজের হাতে ভুজঙ্গভূষণকে দেবার কথা। অবশ্য মৃণাল দত্ত বলে দেননি যে, হাতে-হাতেই দিতে হবে। পৌঁছে দেবার কথাই তিনি বলেছিলেন। এই মৃত্যুঞ্জয়কে কাগজপত্র দিলে কি কোনো ক্ষতি হবে? তারাপদ বুঝতে পারল না। লোকটা যখন এই বাড়িরই লোক, বোধ হয় ভুজঙ্গভূষণের ডান হাত–তখন একে দিতে আপত্তি কি? তা ছাড়া ভুজঙ্গভূষণ তো বিকেলের আগে দেখাই করবেন না। কাগজপত্রের কথা ভুজঙ্গভূষণ বলে না দিলে এই লোকটা জানবেই বা কোথা থেকে?
তারাপদ একবার চন্দনের দিকে তাকাল। চন্দন চোখের ইশারায় দিয়ে দিতে বলল।
কিট ব্যাগ খুলে যা কিছু দেবার বের করে তারাপদ মৃত্যুঞ্জয়কে দিয়ে দিল।
চন্দন এতক্ষণ পরে কথা বলল। বলল, “কিছু মনে করবেন না, আমরা সারারাত ট্রেন জার্নি করেছি। খিদে-তেষ্টা পেয়েছে। একটু চা পেলে অন্তত ভাল হয়।”
মৃত্যুঞ্জয় বলল, “ও হ্যাঁ, আমি দেখছি। ব্যবস্থা হয়ে গেছে।” বলে চলে যেতে গিয়ে আবার বলল, “এখানে কোনো অসুবিধে হবে না। কিছু দরকার হলে আমাদের জানিও। নাও, বিশ্রাম করো। কলঘরটা ডানদিকে।” বলে হাত দিয়ে বাথরুমের দিকটা দেখাল।
মৃত্যুঞ্জয় চলে যাবার পর তারাপদ নিচু গলায় বলল, “চাঁদু, এ কোথায় এলাম । আমার ভাল লাগছে না। সাধুমামা আমায় চিনতে পারল না। কেমন শরীর হয়ে গেছে! একটাও কথা বলল না। ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারছি না।”
চন্দন বলল, “তোর লোক চিনতে ভুল হয়নি তো?”
“কী বলিস! সাধুমামাকে চিনব না?”
চন্দন কোনো জবাব দিল না। ঘরটা দেখতে লাগল। বড়ঘর। দু পাশে দুই বিছানা। একটা দেরাজ একপাশে। গোটা দুয়েক চেয়ার। মাথার ওপর পাখা। ইলেকট্রিক বাতি ঝুলছে। শীতকাল বলে পাখা চালানোর প্রয়োজন নেই। আর দিনের বেলায় বাতি জ্বালানোর প্রশ্নই ওঠে না। পুবের মস্ত জানলা দিয়ে আলো আসছে, রোদ অবশ্য নেই, সরে গেছে।
চন্দন বলল, “দাঁড়া, আগে মুখ ধুই, চা খাই, তারপর ভাবব। এখন আর মাথা খুলছে না।”
চন্দন কিট ব্যাগ খুলে টুথব্রাশ, পেস্ট, তোয়ালে বার করল। এক টুকরো সাবানও।
তারাপদ তার কিট ব্যাগ খুলতে লাগল। তার মুখ দেখলেই মনে হয় সে বেশ উদ্বেগ এবং হতাশা বোধ করছে।
ঘরের ভেতর দিকের দরজা খুলে চন্দন একটা প্যাসেজ দেখল, তার গায়েই বাথরুম।
তারাপদ জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ঘরটা একেবারে শেষের দিকের। জানলার গা ঘেঁষে বাগান, পেছনের দিকে আস্তাবল। একটা বাদামী রঙের ঘোড়া চরে বেড়াচ্ছে ফাঁকা জমিতে। তারাপদ বুঝতে পারল, ভুজঙ্গভূষণের বাড়িতে ঘোড়ার গাড়ি আছে।
সেই ফটফট শব্দটা হঠাৎ কখন থেমে গেছে তারাপদ বুঝতে পারেনি। আচমকা খেয়াল হল। কান পেতে থাকল সামান্য, না, কোনো শব্দ নেই। সাধুমামার মুখ আবার তার মনে পড়ল। মানুষ না কঙ্কাল? কী হয়েছিল সাধুমামার? সাধুমামা কেন তাকে চিনতে পারল না? কেন কথা বলল না? সাধুমামা কি অসুখবিসুখে বোবা হয়ে গেছে? আশ্চর্য!
চন্দন ফিরে এসে বলল, “যা তারা, মুখটুখ ধুয়ে আয়। ফাইন জল এখানকার রিফ্রেশিং…।”
তারাপদ নিশ্বাস ফেলে মুখ ধুতে চলে গেল।
চা জলখাবার এসেছিল। বাড়িতে তৈরি জলখাবার । মিষ্টিও। চা-টাও মন্দ নয়।
দুই বন্ধু চা খেতে খেতে নিচু গলায় কথা বলছিল।
চন্দন বলল, “শোন তারা, আমি সবই বুঝতে পারছি। কিন্তু এতদূর এসে আর ফিরে যাওয়া যায় না।”
“এমন জানলে আমি আসতাম না, চাঁদু।”
“না এলে সম্পত্তি ফসকে যেত।” চন্দন যেন ঠাট্টাই করল।
তারাপদ মুখ কালো করে বলল, “যেত তো যেত। আমি গরিব ছিলাম, গরিবই থাকতাম; বটুকবাবুর মেসে আমার জীবন কেটে যেত। কিন্তু এ-কোথায় এলাম? মৃণাল দত্ত আমায় এত কথা বলে দেননি।’
চন্দন বলল, “এসে যখন পড়েছিস, দুটো দিন দেখে যা না কী হয়? আমাদের কী করবে ভুজঙ্গভূষণ? খুনও করবে না, জেলেও পাঠাবে না। যদি অবস্থা খারাপ দেখি, পালাব।”
“কেমন করে পালাবি এই দুর্গ থেকে?”
“পালাব। সে-ভার আমার।…এই বাড়িতে অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে, তারা; অ-নেক। এই রহস্যগুলো কী?”
তারাপদ বিরক্ত হয়ে বলল, “তুই শার্লক হোমস্ নাকি?”
চন্দন বলল, “শোন, তুই এ-বাড়িতে একটা মেয়েকে দেখেছিস?”
