“মেয়ে? না।” তারাপদ অবাক।
“আমি দেখেছি,” চন্দন বলল, “দোতলার দিকে ভেতর বারান্দায় একটা মেয়েকে দেখলাম। একটুর জন্যে। মনে হল, খুব রোগা, ফরসা, বয়স কম।”
তারাপদ বলল, “ভুজঙ্গভূষণ বা তার চেলার কেউ হবে।“
“হতে পারে,” চন্দন একটা সিগারেট ধরাল, “কাপালিকের বাড়িতে অতটুকু মেয়ে কেন?”
তারাপদর বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। আর সঙ্গে সঙ্গে তার কপালকুণ্ডলার কথা মনে পড়ে গেল। বন্ধুর মুখের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে থাকল তারাপদ।
ভুজঙ্গভূষণ যে অতিথিদের ব্যাপারে খুবই যত্নশীল সেটা বোঝা গেল। শীতের বেলা গড়িয়ে যাচ্ছিল, স্নান খাওয়া শেষ করল তারাপদরা। দোতলায় গিয়ে তাদের খেতে হল আসনে বসে। খেতে বসে মনে হল, এতরকম সুখাদ্য তারাপদ জীবনে খায়নি। মৃত্যুঞ্জয় তাদের তদারক করছিল। ঠাকুরগোছের একটা লোক খেতে দিচ্ছিল ওদের। সমস্ত কিছু পরিপাটি, পরিচ্ছন্ন।
নিজেদের ঘরে ফিরে এসে চন্দন বলল, “তারা, তোর পিসেমশাই যে দারুণ খাতির করছে রে? এই রেটে যদি সাত দিন খাই আর ঘুমোই–এই শীতে একটা ফার্স্ট ক্লাস চেঞ্জ হয়ে যাবে।”
তারাপদ ঢেকুর তুলে বলল, “খাতিরের শেষটায় কি হয়, দেখ।”
“কেন, তুই সম্পত্তি পাবি, আর আমরা বগল বাজাতে বাজাতে কলকাতা ফিরব। “
“সাধুমামাকে আর একবারও দেখছি না কেন বল তো?”
“কী জানি! হয়ত তাঁর অন্য কাজ।”
“মৃত্যুঞ্জয়কে তোর কেমন লাগছে?”
“একটা ক্যারেকটার।”
“লোকটা শয়তান বলে মনে হচ্ছে আমার।”
“পাকা শয়তান। …নে এবার একচোট ঘুমিয়ে নে। ট্রেনে ভাই ভাল ঘুম হয়নি।” বলতে বলতে চন্দন বিছানায় শুয়ে পড়ল। হাতের সিগারেটটা টিল করে জানলা দিয়ে ছুঁড়ে বাইরে ফেলে দিল।
তারাপদও প্রচুর খাবার পর একটা সিগারেট খাচ্ছিল। বলল, “চাঁদু, আজ একবার কিকিরার সঙ্গে দেখা করা যায় না? উনি তো বলেছেন বিকেলেই যশিডি থেকে ফিরবেন।”
চন্দন বলল, “আজ আর কী করে হবে? সন্ধের দিকে ভুজঙ্গভূষণের সঙ্গে দেখা হবে তোর। তারপর আর সময় কোথায়? স্টেশন কম দূর নয়।”
তারাপদ চুপ করে থাকল। চন্দন বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল।
তারাপদরও আলস্য লাগছিল। শীতের দুপুরে চন্দন ঘুমোচ্ছে। বিছানায় গা গড়িয়ে নানারকম ভাবতে ভাবতে তারাপদও ঘুমিয়ে পড়ল।
.
তারাপদর ঘুম ভাঙল শেষ বেলায়। শীতের দিন। হুহু করে রোদ পালিয়ে আলো মরে আসছে। ঘরের মধ্যে ছায়াছায়া ভাব। কেমন যেন বিষণ্ণ রঙ ধরে গিয়েছে বাগানে।
চন্দন ঘুমোচ্ছিল। তারাপদ হাই তুলতে তুলতে উঠল। জানলার কাছে দাঁড়াল। হাওয়া দিয়েছে শীতের, গাছপালায় সেই হাওয়া লেগেছে। দূরে যেন কোথায় একটা কাক ডাকছে। শব্দটা কানে খারাপ লাগছে না। গাছের পাতা উড়ে গেল বাতাসে, বোধ হয় ওই ইউক্যালিপটাস গাছটার শুকনো পাতা।
তারাপদ চোখেমুখে জল দিয়ে আসতে কলঘরের দিকে চলে গেল।
ফিরে এসে ঘরে ঢুকতেই দেখল জানলার কাছে সাধুমামার মুখ ।
তারাপদ প্রথমটায় কেমন বিশ্বাস করতে পারেনি। যখন তার বিশ্বাস হল, তখন আর সাধুমামা নেই। কী যেন একটা বিছানার দিকে ছুঁড়ে দিয়েই সাধুমামা চলে গেছেন।
তারাপদ তাড়াতাড়ি এসে জানলার কাছে দাঁড়াল। জানলায় গরাদ, মুখ বাড়ানো যায় না। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল তারাপদ–সাধুমামাকে দেখতে পেল না। ডেলাটা তুলে নিল তারাপদ। ধীরে ধীরে খুলল। এক টুকরো কাগজে কী যেন লেখা সিস-পেনসিলে; পড়তে কষ্ট হয় ।
তারাপদ পড়ল : “তুমি শেষ পর্যন্ত যমপুরীতে পা দিয়েছ। এসে ভাল করেছ। খুব সাবধানে থাকবে। আমি আছি । তোমায় পরে সব বলব। আমি বোবা সেজে আছি। এই যন্ত্রণা থেকে তুমি আমাদের উদ্ধার করবে বাবা? একাগজ রেখো না। নষ্ট করে ফেলো।”
অরাপদর সর্বাঙ্গ পাথর হয়ে গেল। সাধুমামা বোবা সেজে রয়েছে। কেন? তারাপদ তাদের উদ্ধার করতে পারে, মানে? কাদের? কারা এখানে বন্দী? কেন?
তারাপদ ভয়ে কেমন যেন হয়ে গিয়ে চন্দনকে ঠেলা মেরে জাগিয়ে তুলতে লাগল ।
“চাঁদু, এই চাঁদু; ওঠ..।”
চন্দন ধড়মড় করে উঠে বসল। ভেবেছিল, না জানি কী ঘটেছে; উঠে বসে দেখল ঘরটা ছায়ায় ভরা, তারাপদ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
তারাপদ বলল, “আচ্ছা ঘুম ঘুমোচ্ছিস? সন্ধে হয়ে গেল। ওঠ। …এইটে পড়ে দেখ।”
ঘুম জড়ানো ছলছলে চোখে চন্দন বলল, “কী ওটা?”
“সাধুমামার চিঠি।“
চন্দন চিঠিটা নিল। চোখ ঝাপসা, কোনো রকমে পড়ল। বার দুই তিন। তারপর বলল, “এখানকার সবই মিস্টিরিয়াস ।”
.
এবাড়ির আরও বড় রহস্য তারাপদরা সন্ধের দিকে জানতে পারল।
শীতের দিন; বিকেল ফুরোতেই সন্ধে। চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল । কলকাতার মানুষ তারাপদরা, অন্ধকার দেখার সুযোগ কমই জোটে; জুটলেও এমন চারপাশ জুড়ে থমথমে অন্ধকার দেখার অভিজ্ঞতা তাদের নেই। তার ওপর শীত। কুয়াশা জমছে মাঠঘাটে। কোনো দিকেই তাকানো যায় না।
মৃত্যুঞ্জয় এসে জানিয়ে গিয়েছে, সামান্য পরে এসে তারাপদদের ভুজঙ্গভূষণের কাছে নিয়ে যাবে। তারাপদরা জামা-প্যান্ট পরে তৈরি হয়ে বসে আছে। সেই ফটফট শব্দটা আবার বিকেলের পর থেকে শোনা যাচ্ছিল । ডায়নামো চলছে আর কি। ঘরে বাতি জ্বলছি।
তারপর বুকের মধ্যেও ধকধক করছিল। ভুজঙ্গভূষণের কাছে যেতে হবে। জীবনে যাকে কোনোদিন দেখেনি, যার নামও তিন দিন আগে পর্যন্ত তার জানা ছিল না, সেই লোকটার কাছে। অথচ এই লোকই তারাপদকে দেড় দুই লাখ টাকার সম্পত্তি দিয়ে যেতে ডেকে পাঠিয়েছে। এমন মানুষকে দেখার আগে এমনিতেই বুক কাঁপার কথা। তার ওপর সেই মানুষ যদি এত রহস্যময় ও ভয়ঙ্কর হয় তবে কেমন লাগে? তারাপদর মুখ গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল, বলে যেন অনবরত কেউ হাতুড়ি পিটছে।
