“কেন? আগেও তো একবার করেছেন।”
“সেবার ভদ্রলোক তেমন পাত্তা দিতে চাননি। তাঁদের গদির–মানে দপ্তরের ম্যানেজারের কাছে ঠেলে দিয়েছিলেন।”
চন্দন বলল, “ছোট তালুকদারের বয়েস কত?”
“পঞ্চাশের মধ্যেই।”
“টাকার গরম দেখেছেন? তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে নাকি পাঁচজনকে..”
“না, অতটা নয়। তবে আসুন বসুনও করেন না। মনে হল, অহঙ্কারী ভাব আছে, তবে চাপা। বোধ হয় মূর্খ!”
তারাপদ বলল, “দেখা করে কী করবেন?”
“পাগল হ্যারিশ সম্পর্কে ভাল করে খোঁজখবর করব।”
বগলা চা নিয়ে এল। সামান্য খোঁড়াচ্ছে। গত পরশু পড়ে গিয়েছিল সিঁড়ির মুখে। লেগেছিল হাঁটুতে। মারাত্মক চোট পায়নি।
চা ধরিয়ে দিয়ে বগলা চলে গেল।
তারাপদ বলল, “পাগলা হ্যারিশ তো মারা গিয়েছে। ওর সম্পর্কে নতুন কী খোঁজ নেবেন?”
চায়ে চুমুক দিয়ে কিকিরা বললেন, “পাগলা হ্যারিশের মারা যাওয়া নিয়ে একটা গোলমাল থাকতে পারে। সে কোনও সরকারি হাসপাতালে মারা যায়নি। নেহাতই এক মিশনারি চ্যারিটেবল সিক হোম-এ মারা যায়। এসেও ছিল বেহালার দিকে। কোথায় এক পুওর ওল্ড হোম থেকে। যে লোকটা একদিন নিজে থেকেই বেপাত্তা হয়ে যায়, কোথায় কেউ জানে না, সে মরার আগে কেমন ভাবে সেখানে গিয়ে পড়ল, আর কখনই বা চ্যারিটেবল সিক হোম-এ এল? আর কেনই বা মারা যাওয়ার আগে তালুকদারদের নাম-ঠিকানা দিয়ে গেল, আন্দাজ করতে পারছি না যে।”
“বডি আইডেন্টিফিকেশানের জন্যে।”
“শনাক্তকরণ! হ্যাঁ, তা তো ঠিকই। কিন্তু আরও তো লোক ছিল। তার বাড়ির আশেপাশের লোক, পাড়ার লোক।”
“আপনি তো বলেছিলেন তেমন প্রতিবেশীও এসেছিল।”
“আমাকে তালুকদারের ম্যানেজার যা বলেছিল–তাই বলেছি। কিন্তু কোন প্রতিবেশী? কেমন প্রতিবেশী? তারা যদি জাল সাক্ষীর মতন হয়! তালুকদারদের কথায় এসেছে। তবে–?”
তারাপদ থতমত খেয়ে বলল, “কী বলছেন, সার! আসলের জায়গায় নকলের কবর হয়ে গেল!”
কিকিরা চুপ করে থাকলেন।
.
০৮.
দিন দুইয়ের জায়গায় চারদিন হয়ে গেল। উপায় ছিল না কিকিরার; দরকারি অন্য কাজগুলো না মিটিয়ে তালুকদারের দপ্তরে গিয়ে লাভ হত না।
তারাপদকেই সঙ্গে নিয়েছিলেন কিকিরা। শিখিয়ে পড়িয়ে রেখেছিলেন কখন কী বলতে হবে, চোখ কান খোলা রাখতে হবে কেমন করে!
তালুকদারদের অফিস না গদি দেখে তারাপদ নিচু গলায় বলল, “সার, এটা কি অফিস! এ তো সেরেস্তা টাইপের জমিদারি দপ্তর।”
কিকিরা বললেন, “ওরা তো জমিদারই ছিল একসময়। ধানচালের কারবারও করত শুনেছি আগে। এমন সেরেস্তা তুমি চিৎপুরের দিকে এখনও দু’একটা পাবে। সময়ের হাওয়া গায়ে লাগেনি তেমন, পুরনো ফরাসে বসে আছে।”
কথা না বাড়িয়ে তারাপদ বলল, “বৃহস্পতিবারের বারবেলায় দেখা করতে এলেন, কাজের কাজ হবে তো?”
“চলো না, দেখি।”
যেমন বাড়ি তেমনই সিঁড়ি। বেখাপ্পা চেহারা। চুনের সাদাটে ভাব আর খুঁজে পাওয়া যায় না, হলুদ হয়ে গিয়েছে। খোলা চাতালে শ্যাওলা বসেছে। সিঁড়ির ধাপের ইট নড়বড়ে। একরাশ পায়রা ভেতর দালানের খাঁজে খোঁদলে। একটানা শব্দ করে চলেছে। স্যাঁতানির গন্ধ চারপাশে।
কিকিরা ম্যানেজারের কাছে গিয়ে নমস্কার করে হাসলেন।
মুখ তুললেন ম্যানেজার। ষাটের কাছাকাছি বয়েস। মুখের গড়নটা গোল। তারাপদর মনে হল, শিকারি বেড়ালের মতনই যেন দেখতে। গোল গোল চোখ। গোঁফের অর্ধেক সাদাটে হয়ে গিয়েছে। মাথার চুলও বারো আনা পাকা।
“কী চাই?” চিনেও না-চেনার ভাব, কিংবা ম্যানেজারি মুদ্রাদোষ।
কিকিরা বিনীত ভঙ্গি করে হাসলেন। “আমায় চিনতে পারলেন না! আগে একদিন এসেছিলাম।”
“ও!” মুখটা দেখলেন ভদ্রলোক কিকিরার। চিনতে পেরেছেন যেন, তবু গম্ভীর। “কী দরকার?”
“ছোটবাবুর সঙ্গে একবার দেখা করব!”
“ছোটবাবু! তিনি এখন ব্যস্ত আছেন।”
“দশ বিশ মিনিটের জন্যে দেখা হয় না?”
“বললাম তো?”
“একবার দেখুন না দয়া করে। কাজের কথা। আপনি চাইলে সবই হয়” বলতে বলতে কিকিরা অদ্ভুত কায়দায় দুটো একশো টাকার নোট ম্যানেজারের হাতে গুঁজে দিলেন।
ম্যানেজার প্রথমটায় হকচকিয়ে গিয়েছিলেন। “এ কী?” বলেই তারাপদর দিকে তাকালেন। অন্যের সামনে টাকা নেওয়ার ইতস্তত ভাব।
অবশ্য নিতেও বাধল না।
ম্যানেজার তাঁর পানের চৌকো ডিবের মধ্যে টাকাটা রেখে দিলেন। পান নিয়ে মুখে দিলেন একটা। বাড়ির সাজা পান। শুকিয়ে গিয়েছে। পানের পর জরদা। গন্ধ পাওয়া গেল। আমাকে বললে হত না?”
“আজ্ঞে, কথাটা ছোটবাবুকে না বলে আপনাকে আগে বলি কেমন করে। আপনিও শুনবেন বইকী! আগে ছোটবাবু-”
“ও! দাঁড়ান দেখি।”
ম্যানেজার উঠে গেলেন। চৌকো ঘর। তফাতে বসে জনা চারেক কর্মচারী। টেবিল চেয়ারের বালাই নেই। তক্তপোশ, চিট চাদর, ডেস্ক, খাতাপত্র, কাগজ। দুটো পুরনো পাখা ঘুরছে মাথার ওপর।
তারাপদ চাপা গলায় বলল, “টাকাটা কেমন করে নিল দেখলেন!”
“তুমিই দেখো। …এসব হল দস্তুর। আগের বারে ম্যাজিক দেখিয়েছি, এবার ভেলকি।”
“ছোটবাবু…?”
“দরজার ছিটকিনি খুলে গিয়েছে হে, দেখা হবে।”
সামান্য পরেই ম্যানেজার ফিরে এলেন। “যান। বেশি বিরক্ত করবেন না। ওঁর এখন বিশ্রামের সময়। … আচ্ছা মশাই। এর আগে আপনি একদিন হায়দার লেনের তেরো নম্বর বাড়ির খোঁজ করতে এসেছিলেন না?”
“আপনার মনে আছে? ভাবছিলাম”
“এবার আবার কোন দরকারে?”
