অবনীশ এবার হেসে ফেলল। “রাস্তায়।”
“তুই গাধা ট্রাফিক লাইনে নাকি? লাল মোটরবাইক? …ইস, গুন্ডা পেটাবার চাকরি পেলি না?”
“তোর দরকার! বলিস, পিটিয়ে দেব।” হাসতে হাসতে অবনীশ বলল, “একদিন বাড়ি আয়। জমিয়ে গল্প হবে। এভাবে আড্ডা হয়!”
“তুই থাকিস কোথায়?”
“বেকবাগান।” অবনীশ ঠিকানা বলল। “চলে আসিস একদিন। একটু খবর দিয়ে আসবি। ফোন নম্বর…”
চন্দন মাথা নাড়ল। যাবে।
চলে যাচ্ছিল অবনীশ, হঠাৎ কী মনে করে চন্দন বলল, “এই শোন, তোর ট্রাফিক তো জুতসই হল না। ধর, কোনও ব্যাপারে হেল্প দরকার হল। পারবি না?”
“কেমন হেল্প?”
“আরে না না, এমন কিছু নয়; জেনে রাখছি… ভবিষ্যতে যদি কাজে লাগে।”
“ভবিষ্যৎ! …সে তখন দেখা যাবে। চলি।” চলে গেল অবনীশ। খানিকটা তফাতে গাছতলায় তার মোটরবাইক রাখা ছিল।
হাসপাতাল শেষ করে বাড়ি ফিরল চন্দন। বিশ্রাম করল খানিক। বিকেল ফুরিয়ে এল। কেমন একটা অস্বস্তি লাগছে। কী যেন খচখচ করছে মনে। স্নান সেরে পাজামা পাঞ্জাবি পরে বেরিয়ে পড়ল। কিকিরার কাছে যাবে।
.
কিকিরা বাড়িতেই ছিলেন। বসে বসে তাসের খেলা প্র্যাকটিস করছিলেন। আসলে, চন্দনরা দেখেছে, কিকিরার একটা অভ্যেস হল– গভীরভাবে যখন কিছু ভাবেন তখন স্থির থাকতে পারেন না। বাইরে কেমন চঞ্চল হয়ে ওঠেন।
“এসো চাঁদু!”
চন্দন এগিয়ে গিয়ে বসল। “তারা আসেনি?”
“কদিন ওর মুখ দেখিনি। আজ যদি বাবু আসেন! সামান্য কাজ বলেছি করতে, তাতেই কাবু হয়ে পড়েছেন।”
চন্দন বলল, “সার, আজ একটা ব্যাপার হয়েছে।
তাকালেন কিকিরা।
চন্দন সকালের ঘটনার কথা বলল, ভবানীর কাছে যা যা শুনেছে। কোনও কথাই বাদ দিল না।
কিকিরা মন দিয়ে শুনলেন সব। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর বললেন, “ওই ছেলেটাকে আর ওদিকে যেতে দিয়ো না। বারণ করো।”
“বলে দেব। তবে ও নিজেই আর ওদিকে ভিড়বে না।”
“তুমি..”
“আমার ব্যাপারটা ভাল লাগেনি।” চন্দন বিরক্ত হয়ে বলল, “একটা গুণ্ডা আমাকে শাসাবে!”
“মুখোমুখি তো শাসাতে আসেনি।”
“না হোক। তবু এটা তার থ্রেট।”
“কলকাতা শহরে আজকাল গুণ্ডা বদমাইশ এত বেড়ে গিয়েছে যে, পুঁটিমাছের সাইজ যারা, মানে তুচ্ছ গুণ্ডা, তারাও শাসায়। কী করবে বলো! ওদের ইউনিয়ন আছে কিনা জানি না, তবে ছোরা ভোজালি সঙ্গেই থাকে। ঝুপ করে একটা চাকু যদি চালিয়েই দেয়…”
“আপনি আমায় ভয় দেখাচ্ছেন! সার, আমি তারাপদ নই। রাজা না বদু সে বেটা আমার কী করবে?”
কিকিরা হাসলেন। “কী করবে জানি না। তোমার মাথা গরম করারও দরকার নেই। রাস্তার কুকুরও কামড়ায়। যেচে তার লেজ ধরে টানতে যাবে কেন! একটু সাবধান হওয়া ভাল।”
চন্দন মাথা নাড়ল। “সাবধান হওয়া মানে ঘরে লুকিয়ে বসে থাকা! ও কি হয় নাকি!”
“ঘরে বসে থাকবে কেন! যেমন আছ থাকবে।…..তা একটা কথা তোমার ছেলেটি ঠিকই বলেছে। ওরা–মানে জ্যাকিকে যারা বাড়িটা কিনতে দিতে চায় না–তারা কিন্তু তেমন তেমন হলে কেনা গুণ্ডা-বা ভাড়াটে খুনেকে দিয়ে একে খুন পর্যন্ত করতে পারে। করবে। আমিও সেটা জেনেছি।”
“পারচেজর কিলার তবে ওই রাজা…”
“রাজা গজা যেই হোক, নামে যায় আসে না। সোজা কথা ওদের হাতে কেনা খুনে আছে।”
কিকিরার কথা শেষ হওয়ার আগেই তারাপদর গলা শোনা গেল।
ঘরে এসে চন্দনকে দেখল তারাপদ। “আমার মনে হচ্ছিল তুই আসবি।”
“তোর মনের বাহাদুরি আছে।” চন্দন ঠাট্টা করে বলল, “আমি অনেকক্ষণ এসেছি। তুই বরং দেরি করলি!”
তারপদ হাতের ঘড়ি দেখল। বলল না কিছু। ঘরের বাতির দিকে তাকাল। জোর নেই আলোয়। পাখাটাও গোরুর গাড়ির চাকার মতন ঘুরছে। ভোল্টেজ কম নিশ্চয়। ঝপ করে একসময় বেড়ে যাবে।
তারাপদ বলল, “আজ ওয়েদারটা ভাল। ফাইন। ক’দিন একেবারে নেতিয়ে রেখেছিল।”
বগলা জল এনে তারাপদকে দিল। আসবার সময়েই জল চেয়েছিল সে। তেষ্টা পেয়েছিল খুব। শ্যামলালের দোকানের কচুরির এফেক্ট। খাব না খাব না করেও খেয়ে ফেলেছিল অফিস থেকে বেরিয়ে।
কিকিরা বললেন, “ চাঁদুর কথা শুনেছ? শোনো।”
তাকাল তারাপদ। “কী রে?”
চন্দন ছোট্ট করে ভবানী বৃত্তান্ত বলল।
শুনল তারাপদ। চুপ করে থাকল কমুহূর্ত। শেষে বলল, “আরে রাখ। অত সস্তা নাকি! রাজা মহারাজার মরজিতে বেঁচে আছি! আমাদের কানুকে বললে, অমন গুণ্ডা পাড়াতেই পাওয়া যাবে।”
তারাপদ যেন নিতান্তই বন্ধুকে ভরসা দেওয়ার জন্যে বলল কথাগুলো, যদিও সে জানে চন্দন যথেষ্ট সাহসী, গায়ে খানিকটা ক্ষমতাও রাখে। ভেতরে ভেতরে তার সামান্য অস্বস্তিও হচ্ছিল।
কিকিরা অন্য কথায় চলে গেলেন। যেন রাজা-গজার চিন্তাটা আপাতত করার কোনও কারণ দেখছেন না উনি। তারাপদকে বললেন, “তোমায় যে কাজটা করতে বলেছিলাম করেছ?”
তারাপদ মাথা নাড়ল। “যা বৃষ্টি গেল, বেরুতেই পারলাম না। তবু ফরটি পার্সেন্ট করেছি। আমাদের অফিসের চণ্ডীদা জানবাজারের অনেক খোঁজখবর রাখে। তার মামার বাড়ি ওদিকেই। বলল, তালুকদারদের নাম জানে অনেকে। ওরা বাড়ি জমি কেনাবেচা থেকে সুদে টাকা খাটানো, সব ব্যবসাই করে। মামলা মোকদ্দমার লাইনে ফেমাস। ওরা দোকান বাজারেরও মালিকানা করে। একবার কি দু’বার ফিল্ম লাইনেও টাকা ঢেলে মার খেয়েছিল। তারপর থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছে।”
কিকিরা মাথা নাড়তে লাগলেন ধীরে ধীরে। শেষে বললেন, “আমি কাল-পরশু একবার ছোট তালুকদারের সঙ্গে দেখা করব।”
