চন্দন ঠাট্টা করে বলে, চিরস্থির এই নীর, বুঝলি তারা! এর আর হেরফের হবে না।
সেই চন্দনই অনেক কষ্ট করে জল সাঁতরে তার নতুন হাসপাতালে গেল চাকরি বজায় রাখতে। একদিন গেল, অন্যদিন পারল না।
চারদিনের মাথায় প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছিল শহর। মাঝে মাঝে মেঘলা থাকলেও রোদ উঠছিল। কটকটে রোদও নয়। বাতাসও ছিল বাদলার ঠাণ্ডা মেশানো।
নিজের পুরনো কোয়ার্টার এখনও ছাড়েনি চন্দন। দেরি হবে এক-দুমাস।
সেদিন হাসপাতালে বেরুবার সময় ভবানী এসে হাজির। তার অটো নিয়েই।
“কী রে, তুই! আমি হাসপাতালে বেরুচ্ছি।”
“চলুন আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।”
“চল, ভালই হল।”
অটোয় উঠল চন্দন। ভবানী প্রথমটায় কিছু বলল না। সামান্য পরে বলল, “দাদা, একটা কথা।”
“কী?”
সামান্য ইতস্তত করে ভবানী বলল, “বদুয়ার নাম শুনেছেন? শোনেননি!”
“ব-দুয়া! কে বদুয়া?”
“রাজা শের, তার দলের লোক। মস্তান। রাজাকে লোকে ‘শের’ বলে। হেভি গুন্ডা!”
চন্দন অবাক! রাজা শের, বদুয়া এসব নাম জীবনে সে শোনেনি। শোনার কারণও নেই। বলল, “তোর কাছে গুন্ডা?”
“দাদা, আমাদের লাইনে কমসম খোঁজখবর রাখতে হয়। গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বেরোই। বাঁধা রুট ছাড়াও এদিক-ওদিক যেতে হয়। সব জায়গাতেই এক-আধজন চেনা থাকে।”
“কী নাম বললি গুন্ডাটার! তা নাম যাই হোক, তোর কাছে কেন?”
“ওদের ফড়ে আছে। বদুয়া খোঁজ করে করে আমার কাছে এসেছিল। জানতে চাইছিল সেদিন আমি অটোতে দু’জনকে তুলে নিয়ে তাদের এরিয়ায় গিয়েছিলাম কেন? লোক দুটো কে?”
ভবানী বা ভব আজ অটো চালায়। চন্দন জানে, ছেলেটা একসময় স্কুলে পড়ত। নাইন শেষ করেছে কি তার বাবা মারা গেল। আচমকা। ট্রামের ধাক্কা খেয়েছিল। কায়কষ্টে দুটো দিন বাঁচিয়ে রাখা গিয়েছিল লোকটিকে। ভব বাপের জন্যে হাসপাতালে আসত, ছোটাছুটি করত, হাতেপায়ে ধরত ডাক্তারবাবুদের। তখন থেকেই ছেলেটার সঙ্গে চেনা চন্দনের। বাপ মারা যাওয়ার পর ভবানী মা ভাই বোন নিয়ে পথে বসে গেল। পেট চালাবে কেমন করে। মাঝে ছেলেটা বিগড়েও গিয়েছিল। পরে আবার শুধরে নিল। এই অটো তার নয়, শম্ভু বড়াল বলে একজনের। কারবারি লোক। ভবদের পাড়ার বড়ালবাবু। তা সে যাই হোক অটোটা ভবই চালায়। না চালালে পেট চলত না।
চন্দন বলল, “তোর পাত্তা পেল কেমন করে?”
“ওসব ওদের লোক আছে দাদা। নজর রাখতে। অটোর নম্বর তো আছেই, আমাদের গাড়ি নিয়ে ঘুরতেও দেখে। সেন্ট্রালে ঘুরি। সাউথ হলে ধরতে কষ্ট হত।”
চন্দন অনুমান করে নিল কথাটার অর্থ। মাঝ কলকাতার অটো ভবানীর, ঘোরাফেরাও ধর্মতলা, ওয়েলিংটন, মৌলালি থেকে এপাশে হ্যারিসন রোড, কখনও এলাকার বাইরেও যেতে হয়, কাজেই বদুয়াদের চোখে পড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। সাউথের অটো হলে খোঁজখবর করতে অসুবিধে হত।
ভবানী নিজেই বলল, “দাদা, আমরা হরদম ঘুরি, রাস্তাঘাটে পুলিশ পাবলিক কত হ্যাপা আছে। নিজেদের দু-চারটে ঘাঁটি না রাখলে চলে না। বদুয়া খবর জোগাড় করে নিয়েছে।”
“তুই কী বললি?”
“বললাম, গাড়িতে সেদিন ডাক্তারবাবু ছিলেন। আমার চেনা। আর তাঁর এক বন্ধু। আমি চিনি না।”
“কী বলল তোদের বাবুয়া!”
“বদুয়া।” ভবানী নামটা শুধরে দিল। বলল, “বদুয়া জিজ্ঞেস করল কেন গিয়েছিলি ওদিকে? আমি বললাম, ডাক্তারবাবু নিয়ে গিয়েছিলেন। আমি জানি না। বলল, গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখেছিলি কেন? বললাম, এঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। দেখছিলাম কোথায় বিগড়ে গেল।”
“তারপর?”
“বদুয়া বিশ্বাস করল না। শাসিয়ে গেল। বলল, আর যাবি না ওদিকে। কেস রাজার। ফালতু ভোগে চলে যাবি। তোর ডাক্তারবাবুকে বলে দিস রাজা শেরকে থানা পুলিশও সমঝে চলে।”
চন্দন সামান্য উত্তেজিত হয়ে পড়ল। “রাজা কি খুনখারাবি করে?”
“টাকা পেলে সব করে।”
“ভাড়াটে গুন্ডা! কিলার?”
ভবানী বলল, “দাদা, আপনি সাবধানে থাকবেন।”
“দেখি!… এখানে আমাকে ছেড়ে দে। হাসপাতাল সামনে।”
ভবানী অটো থামাল।
.
দুপুরবেলা কাজের ফাঁকে চন্দন ক্যান্টিন থেকে চা খেয়ে ফিরছিল, হঠাৎ অবনীশের সঙ্গে দেখা।
“এ কী রে তুই?” চন্দন অবাক! অবনীশ তার বন্ধু। ছেলেবেলায় স্কুলে পড়েছে একসঙ্গে। কতকাল পরে দেখা। অবনীশের পরনে পুলিশের উর্দি।
অবনীশ বলল, “তুই ডাক্তার হয়েছিস শুনেছি। এখানে আছিস–কই জানতাম না তো!”
“বদলি হয়ে এসেছি সবে। তুই গাধা পুলিশের চাকরি করছিস?”
“কপাল ভাই। যার ভাগ্যে যা লেখা থাকে!”
“আমি তো ভাবতাম তুই সিনেমা থিয়েটারে নেমে যাবি!”
অবনীশের চেহারা সত্যিই সুন্দর। মুখের ছাঁদও নরম। পুলিশ হওয়া যেন তাকে একেবারেই মানায় না। সে হেসে বলল, “বড্ড ভিড়। জায়গা পেলাম না। শেষে এই উর্দি।”
“ক’ বছর হল?”
“বছর সাত-আট।”
“বড়বাবু, না, মেজোবাবু?”
“চরকি বাবু!” অবনীশ হো হো করে হাসল। “নে, সিগারেট খা।”
সিগারেট ধরানো হয়ে গেল। দু-একটা পারিবারিক কথা। শেষে চন্দন বলল, “তুই এখন কোন থানায়?”
“লালবাজারে।”
“আঁ বলিস কী! লালবাজারে! ভয় দেখাচ্ছিস?”
“ভয় তো তোরা দেখাস। এই যে, আজকের কেসটা ধর। আমার এক ডিসটান্ট রিলেটিভ পরশু এখানে ভরতি হয়েছে। ডাক্তাররা প্রথমে সন্দেহ করল, হার্ট, এখন বলছে ব্রঙ্কাইটাল অ্যাজমা। সকালে সময় হয়নি। এখন একবার খবর নিতে এসেছিলাম। ভাল আছে।”
চন্দন বলল, “গুড নিউজ। …তুই লালবাজারে কোথায় আছিস?”
