“আপনার তামাশা রাখুন! আর কোনও কিছু শুনলেন না?”
“শুনলাম,” কিকিরা বললেন, “পাগলা হ্যারিশ নাকি নিজের জন্যে একটা কফিন বাক্স তৈরি করেছিল। অ্যাডভান্স ব্যবস্থা…!”
চন্দন অবাক! কিকিরাকে দেখছিল। বলল, “মানে?… আমরা যে কফিন বাক্সটা দেখেছি ঘরে, সেটা কি তবে পাগলা হ্যারিশের?”
“খুব সম্ভব।”
“কিন্তু সেটা তো ঘরেই পড়ে আছে, কবরখানায় যায়নি।”
“না। যায়নি, কেননা যারা তার কবরের ব্যবস্থা করেছিল তখন তারা হয়তো জানত না যে হ্যারিশের বাড়িতেই তার নিজের হাতে তৈরি করা কফিন বাক্স পড়ে আছে!… তোমরা ভুলে যাচ্ছ পাগলা হ্যারিশ দাঁতব্য হাসপাতালে মারা যাওয়ার পর- যারা তার শেষকৃত্য করেছে তারা ওদেরই একটা ছোটখাটো প্রতিষ্ঠান। দয়াধর্ম করাই তাদের কাজ। ওদের কি এসব জানার কথা!”
তারাপদ বলল, “আপনি আবার কথা বলছেন, সার! যে-লোক মারা যাওয়ার আগে নিজের নাম ঠিকানা পরিচয় জানিয়ে যেতে পারল, সে তার মনের শেষ ইচ্ছেটা জানিয়ে যাবে না?”
চন্দন মাথা নাড়ল। “ঠিক কথা। তালুকদার আপনাকে এ ব্যাপারে কিছু জানায়নি? সে তো হ্যারিশকে আইডেনটিফাই করতে গিয়েছিল!”
কিকিরা একটা শব্দ করলেন। যেন হতাশ হয়েছেন চন্দনদের কথা শুনে। বললেন, “তোমরা বেলাইনে যাচ্ছ। প্রথম কথা, হ্যারিশ মর্টগেজ মামলায় বাড়িটা খুইয়েছিল। তারপর পালিয়ে যায়, বা খেপাটে হয়ে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। কেউ তার খোঁজ পায়নি। পরে ওদেরই একটা চ্যারিটেবল হাসপাতালে এসে আশ্রয় নেয়। সব কথা বলার মতন অবস্থা ওর হয়তো ছিল না। তা ছাড়া তালুকদাররা নিজেরা হাসপাতালে যাবেন কেন ডেডবডি শনাক্ত করতে, তাঁদের লোক গিয়েছিল।… আর বাপু, মানুষের আয়ুর কথা, হ্যারিশ শেষ সময়ে কতটা বলতে পেরেছে, তার সাধ্য ছিল- কে বলবে! হতে পারে তার ক্ষমতায় কুলোয়নি।”
আপত্তি করা যাক বা না যাক তারাপদরা চুপ করে থাকল।
নিজেই একসময় বললেন কিকিরা, “তবে এসব তো গল্প! শোনা কথা। পাগলা হ্যারিশ সাহেবকে নিয়ে ওদের মহল্লায় গল্পটা চাউর হয়ে থাকতে পারে। নিজেই হয়তো কাউকে ঠাট্টা করে বলেছিল সাহেব।”
তারাপদ বাধা দিয়ে বলল, “সে যাই হোক, ওই বাড়ির একটা ঘরে সত্যিই তো কফিন বাক্স আছে একটা।”
“হ্যাঁ।”
“এর কী উত্তর হতে পারে?”
“ভাবছি!”
“একটা কালো ট্রাঙ্কও ছিল, আছে এখনও। আপনার কথায় হ্যারিশের কাজের বাক্স।”
“কে অস্বীকার করবে হে! আমরা স্বচক্ষে দেখলাম…”
“আপনার জ্যাকি কি হ্যারিশ সাহেবের সব কথা জানে?”
“কিছু জানে নিশ্চয়ই, তবে ওই যে ফাদার পেইজ, কিংবা সোনার ক্রশ, গায়ে মণিমুক্তো বসানো~ এসব গল্প বোধ হয় জানে না। জানার কথাও নয়। আমি আফিংখোর বুড়ো নেপালবাবুর মুখে শুনেছি। গল্পটা তাঁরও শোনা।”
“আপনি বলছেন নেপালবাবুর বয়েস সত্তরের মতন; তিনি সেই আদ্যিকালের কলকাতার কথা জানবেন কেমন করে? কোনও চালু কাহিনী শুনেছেন বোধ হয়।”
চুরুট ফেলে রেখে মাথার চুল ঘাঁটতে ঘাঁটতে কিকিরা দ্বিধার গলায় বললেন, “সে তো আগেই বলেছি। এই কলকাতা শহরের কত কিছু নিয়েই বানানো গল্প চালু আছে। আবার আসল-ভেজাল মেশানো গল্পও আছে। নেপালবাবুর স্টোরিটাকে তুমি আমি না মানতে পারি। কিন্তু একটা কথা মানতেই হবে ভদ্রলোক যে শুধু কর্পোরেশানের অ্যাসেস ডিপার্টমেন্টে এককালে কাজ করতেন– শুধু তা নয়– ওঁর আবার পুরনো কাগজপত্র ঘাঁটা বইপত্র পড়ার শখ ছিল। পাদরি পেইজ নামটা বইয়ে পাওয়া যায়। আফ্রিকায় ছিলেন পাদরি সাহেব। আর উনি বললেন, আজ আমরা সোনা সোনা করে কেঁদে মরি, কিন্তু তিন-চারশো বছর আগে ওইসব পর্তুগিজ স্প্যানিয়ার্ড ডাচরা বাইরে বেরিয়েছে জাহাজ নিয়ে নতুন নতুন দেশ খুঁজতে, ব্যবসা বাণিজ্যর ব্যবস্থা দেখতে– আর এরা যেমন মরেছে জলে ডাঙায়, তেমনই আবার কোথাও পা রাখতে পারলে মাটি গেড়ে বসার চেষ্টা করছে, খুনোখুনি রক্তপাত করেছে সেইভাবে তাল তাল সোনা মুঠো মুঠো মণিমুক্তো নিয়ে নিজেদের দেশে পালিয়ে গিয়েছে…”
তারাপদ জোরে হেসে উঠল। ঠাট্টার গলায় বলল, “কিকিরা সার, আপনি কি মাস্টারি করতেন একসময়?”
কিকিরাও হেসে ফেললেন। বললেন, “না বাপু, পৃথিবীতে দুটো জিনিসকে আমি ভীষণ ভয় পাই। নাম্বার ওয়ান, মাস্টারি; নাম্বার টু স্নেক প্লেয়িং–!”
“স্নেক প্লেয়িং–!” চন্দন অবাক; বুঝল না।
কিকিরা ঘাড় দুলিয়ে বললেন, রসিকতার গলায়, “সাপ খেলানো। সাপুড়েদের আমার ভীষণ ভয়। ওরা যেভাবে খেলা দেখায় গা আমার শিউরে ওঠে।”
রাত হচ্ছিল। তারাপদরা উঠি-উঠি ভাব করল।
“তা হলে শেষ পর্যন্ত– জ্যাকির কেসটা…?”
“কেসটা গিঁট পড়ে যাওয়া। খোলা মুশকিল। জবর গিঁট। তবে একটা ব্যাপারে আমার কোনও সন্দেহ নেই।”
“কী ব্যাপারে?”
“ওই বাড়িতে একটা কিছু লুকনো রহস্য আছে। জ্যাকি কেন, কাউকেই ও বাড়ি ওরা কিনতে দেবে না। …আর আমি বলছি, ওই ঘরটা যেখানে কফিন বাক্স আর ট্রাঙ্ক পড়ে আছে, ওই ঘরই হল রহস্য। মিস্ত্রি।… আর ক’দিন দেখি– তারপর একটা প্যাঁচ কষব। হয় জিতব, না হয় হারব।”
.
০৭.
শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝি কলকাতা শহর জলে ডুবে থাকল দিন দুই। ঘটনাটা নতুন নয়; প্রতি বর্ষাতেই বার কয়েক এমন হয়। জলে তলিয়ে থাকে এমন জায়গা কলকাতায় কম নেই। উনিশ বিশের কথা বাদ দিলে ষাট সত্তর আশি বছর আগেও যেখানে যেখানে জলে ভেলা ভাসিয়ে ছেলের দল মজা করত, আজও সেখানে জল থইথই করে বর্ষার মরশুমে। মাঝে মাঝে।
