চন্দন বলল, “জোক রাখুন! কী বলল ছেনু?”
“ছেনু কিছু বলেনি। সে দিন দুয়েক সময় চাইল। তারপর আমাকে এক বুড়োর কাছে নিয়ে গেল। বুড়ো একসময় কলকাতা কর্পোরেশানে কাজ করতেন। নেপালচন্দ্র সাধুখাঁ। নেপালবাবুর বয়েস এখন সত্তরের কাছাকাছি। থিন এরারুট বিস্কুটের মতন গায়ের রং এবং পাতলা চেহারা। উনি ঠিক হায়দার লেনের বাসিন্দ নন; এলাকাটা নাগালের মধ্যে। তার চেয়েও বড় কথা– কর্পোরেশানে অ্যাসেসমেন্ট ডিপার্টমেন্টে কাজ করার সময় ওঁর নজরদারিতে ছিল জায়গাটা…”
“মানে?”
“মানে নেপালবাবুর এক্তিয়ারের মধ্যে ছিল পাড়াটা। তিনি খোঁজখবর রাখতেন ওদিককার। তা ছাড়া ভদ্রলোকের জ্ঞানচর্চায় মতি আছে শুনলাম, একটু ন্যাক।”
চন্দন, তারাপদ প্রায় একই সঙ্গে বলল, “তেরো নম্বর বাড়িটা চিনতেন উনি?”
চুরুট টানতে টানতে কিকিরা বললেন, “চেনারই কথা। অসুবিধে কী জানো হে, ভদ্রলোকের একে বয়েস হয়েছে, তাতে পেটরোগা মানুষ। কে যে তাঁকে এক গুলি আফিং খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল পেটের জন্যে, ফলে বুড়ো সন্ধেবেলায় একটু মৌতাতে থাকেন।”
“তা থাকুন, আসল কথা কী বললেন?”
“বললেন, ওই বাড়িটা নিয়ে একটা গল্প চালু আছে। এমন গল্প কত বাড়ি নিয়েই থাকে। শ’ সোয়া শ’ বছর আগে ওই এলাকা ছিল প্রায় অস্পৃশ্য। লোকজন ঘেঁষত না। পরে দু-চারটে করে ঘরবাড়ি হতে হতে রাজা পঞ্চম জর্জের আমল নাগাদ ফ্যান্সি পাড়া হয়ে উঠল। অ্যাংলো সাহেবদেরই আস্তানা। তারপর বিশ-পঁচিশ বছর পরে জমে উঠল জায়গাটা। আর যুদ্ধের পর তো রথের মেলা। হালের তিরিশ চল্লিশ বছরে ওখানে যত্রতত্র যার যেমন খুশি পায়রার খুপরি করে হরেকরকম লোক থাকে…”
“তেরো নম্বর বাড়ির কী হল?” তারাপদ বলল। কিকিরা বললেন, “নেপালবাবুর কথা যদি মানতে হয় তবে বলতে হবে এক পর্তুগিজ সাহেব একদা ওই বাড়িতে সংসার পেতেছিলেন। স্ত্রী, মেয়ে আর তিনি৷ উনি নাকি আফ্রিকা থেকে এ-দেশের কালিকট পর্যন্ত জাহাজি কাজ করেছেন। পরে এখানে। সাহেব কলকাতা শহরে একটা বেকারি চালু করেন। নিজেই মালিক। সাহেবি বাড়িতে তাঁর বেকারির পাঁউরুটি কেকটেকের বিক্রিবাটা ছিল ভালই।”
চন্দন বলল, “তার মানে বেকারি করে ফেঁপে উঠেছিলেন!”
“হতে পারে দুটো পয়সা হয়েছিল। কিন্তু কপাল মন্দ সাহেবের। কলকাতায় বেরিবেরি ধরনের কী-এক রোগ লাগল। তাতেই মারা গেল স্ত্রী আর মেয়ে।”
“আর সাহেব?”
“ক’ বছরের মধ্যে তিনিও কবরের মধ্যে।… এই দেখো একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছি। সাহেব রীতিমতন গোঁড়া খ্রিস্টভক্ত ছিলেন।”
“কলকাতায় একটা পর্তুগিজ চার্চ আছে না?”
“তা থাকুক। ওর হিস্ট্রি আমি বাবা জানি নে। কলকাতায় কী না আছে! আর্মেনি গির্জাও আছে। কত সাহেবসুবো এল গেল বাপু! তা পর্তুগিজ সাহেবরা এখানে কী ব্যবসা বাণিজ্য করত, কতই বা নিজেদের লোক ছিল– তাও বলতে পারব না। সহজ কথাটা হল এই যে, ওই সাহেবের কাছে নাকি বিখ্যাত পাদরি পেইজ-এর (Paiz) একটা ক্রশ ছিল। অমূল্য সম্পদ।”
“ক্রশ?”
“নেপালবাবু বললেন, তিনি তাই শুনেছেন। আধ হাতটাক লম্বা। সোনা দিয়ে তৈরি। ক্রসের ওপর হিরে পান্না চুনির কাজ…। রকমারি দামি পাথরের।”
“সাহেব ওটি পেলেন কেমন করে?”
“কেউ বলে আফ্রিকা থেকে চুরি করেছিলেন। অ্যাবিসিনিয়ার চার্চ থেকে। কেউ বলে লিসবনের কোনও চার্চ থেকে।… তা এ তো সব গল্প হে! সত্যিমিথ্যে কেউ জানে না। জোর করে বলতে পারবে না।”
“গল্পটা আপনি নেপালবাবুর মুখে শুনলেন?”
“তা ছাড়া কার কাছ থেকে শুনব! আমার চৌদ্দপুরুষও জানে না এমনি সাহেব আর পর্তুগিজ সাহেবদের মধ্যে তফাতটা কোথায়! আমাদের চোখে সব সাহেবই সাহেব। ভাগ্যিস ছেলেবেলায় ইতিহাস বইয়ে ভাস্কো দা গামার নাম পড়েছিলাম, নয়তো পর্তুগিজ যে কারা তাও জানতাম না।”
তারাপদ বলল, “সেই ক্রশের কী হল? যদি সত্যিই সেটা থেকে থাকে!”
কিকিরা এবার রহস্য করে বললেন, “শোনা যায়, মানে নেপালবাবু শুনেছেন– সেটি ওই তেরো নম্বর বাড়ির মাটির তলায় কোথাও পোঁতা আছে।”
তারাপদরা যেন খানিকটা চমকে উঠল। চন্দনের চোখে চোখ রাখল সে। যেন বলতে চাইল, কী বুঝছিস রে! চন্দনও ইতস্তত করছিল।
“সার, এটা কি আফিংখোরের গল্প?” চন্দনই বলল শেষে।
মাথা নাড়লেন কিকিরা। “পরমেশ্বরই জানেন।”
“আবার পরমেশ্বর কেন! …আপনি আর কী জানেন? মানে নেপাল সমাচার?”
“এই তো তোমাদের দোষ! বিশ্বাসও করবে না, আবার জোক করবে?”
“বাড়িটার কী হল তারপর? পর্তুগিজ সাহেব মারা যাওয়ার পর?”
“হাত বদল আর জাত বদল! সবই ওদের জাতভাইদের মধ্যে। তবে ওরা আর পর্তুগিজ নয়। দু-তিন দফা হাত বদলের পর এল পাগলা হ্যারিশের হাতে।”
“হোয়াই পাগলা হ্যারিশ?”
“লোকে তাই বলত।”
“কী করত পাগলা হ্যারিশ?”
“কফিন মেকার। কফিন তৈরি করত।”
“কী?”
“কফিনের বাক্স তৈরি করত। অর্ডিনারি কফিন বাক্স থেকে দামি কফিন বাক্স পর্যন্ত। ওহে তারাবাবু, আমাদের যেমন তিলকাঞ্চন থেকে বৃষোৎসর্গ শ্রাদ্ধ পর্যন্ত রয়েছে, গরিব বড়লোক মানুষ যে যেমনটি চায় করে, ওনারাও তেমন বারোয়ারি থেকে মনোহারি- যার যেমনটি ইচ্ছে কফিন বাক্সটি পছন্দ করে নেন।”
“বাঃ! কোন সিনেমায় যেন দেখেছিলাম… রাজকীয় এক বাক্স তৈরি হচ্ছে।”
“দেখতে পারো। আমার বেলায় হিন্দু সৎকার সমিতির ব্যবস্থা করবে! জলের দরে ভাড়া পাবে!”
