“জ্যাকিকে আপনি বলেছেন- অটোতে আমরা ছিলাম।”
“বলেছি।… সে বলল, এভাবে ওদের পাঠাবেন না, অ্যাঙ্কল! আমার লাইফের রিস্ক আমার, ওরা কেন বিপদে পড়বে!”
তারাপদ সঙ্গে সঙ্গে বলল, “কিকিরা, আমরা নবিশ লোক। গুলি গোলার মধ্যে নেই। আর ও-পথ মাড়াচ্ছি না।”
কিকিরা হাসলেন।
আজ বৃষ্টি নেই। সকাল থেকেই খটখটে দিন। চড়া রোদ উঠেছিল ও-বেলায়, স্যাঁতসেঁতে বাড়িঘর খানিকটা শুকিয়ে গেছে এক বেলার রোদে। এখন শুক্লপক্ষ।
সবে শুরু। বাইরে চাঁদের আলো বোঝা যায় না। এরই মধ্যে একটা কিছু ঘটল রাস্তায়। চেঁচামেচি হইরই। নীচে রাস্তায় এমন হট্টগোল প্রায়ই হয় এখানে। চন্দন একবার দেখে নেওয়ার চেষ্টা করল। ট্যাক্সি ভার্সেস প্রাইভেট গাড়ি। ধাক্কাধাক্কির ব্যাপার।
বগলা একবার ঘরে এসেছিল। এঁটো প্লেট কাপ ডিশ তুলে নিয়ে চলে গিয়েছে।
তারাপদই কথা বলল খানিকটা সময় চুপচাপ থাকার পর। বলল, “কিকিরা, আপনার জ্যাকিকে বলুন না এসব ঝুট-ঝামেলা থেকে সরে দাঁড়াতে। যে-টাকা সে দিয়ে ফেলেছে দাদন হিসেবে সেটা বরং ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করুক।”
কিকিরার গলার অবস্থা এখন ভাল। সর্দি কাশি ফ্লয়ের ভাব কবেই কেটে গিয়েছে। নিজের মনে কী ভাবছিলেন। অন্যমনস্কভাবেই নিজস্ব চুরুট ধরালেন একটা, সরু আঙুলের মতন চুরুট। “কী বললে?”
“বললাম, জ্যাকিকে ব্যাক করতে বলুন।”
“নতুন কথা কী বললে তারা! এ-কথা তো প্রথম থেকেই তার মা কাকা বলছে। কিন্তু সে ব্যাক করবে না।”
“কেন?”
“খানিকটা জেদ। কেনই বা করবে! কেউ যদি বলে পোড়োবাড়ি মানেই ভূতের বাড়ি, হানাবাড়ি– তাই শুনে কি সবাই হাত গুটিয়ে নেয়।”
“এটা অন্যরকম কেস! জ্যাকির লাইফ রিস্ক হয়ে যাচ্ছে।”
“তা হচ্ছে।”
“তা হলে?”
কিকিরা কোনও জবাব দেওয়ার আগে চন্দন বলল, “কিকিরা, আপনি আমি আমরা সবাই বুঝতে পারছি, বাড়িটা পোড়োই হোক আর যাই হোক, এমন কেউ বা কারা আছে যারা জ্যাকিকে বাড়িটার মালিক হতে দিতে চায় না। তাদের মোটিভ ক্লিয়ার, ওই বাড়ি তুমি কিনতে পারবে না..! ঠিক কি না!”
কিকিরা বললেন, “কোনও ভুল নেই কথায়। দুয়ে দুয়ে চার, সহজ অঙ্ক।”
“তবে কেন?”
বাধা দিলেন কিকিরা। বললেন, “এটা কি মগের মুলুক। আমি টাকা দিয়ে বাড়ি কিনব, তুমি কিনতে দেবে না! হু আর ইউ? তোমার লিগাল অথারিটি কী আছে মশাই! … আর তোমার নিজেরই যদি কেনার ইচ্ছে থাকত- আগে কেন কিনলে না? বাড়ি তো পড়েই ছিল। তখন কেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছিলে! আর আজ আমি যখন কিনতে যাচ্ছি, তুমি আমায় শাসাতে ভয় দেখাতে শুরু করেছ! …”
কথাটা ঠিকই। তুমি কেন ভয় দেখাবে।
সামান্য উত্তেজিত হয়ে উঠলেন কিকিরা। “না, চাঁদু ব্যাপারটা অত সোজা অঙ্ক সত্যিই নয়। হ্যাঁ, জ্যাকি যেন বাড়িটার মালিকানা না পায় এটা তার বিপক্ষের লোকদের মোটিভ অবশ্যই। কিন্তু কেন? কী আছে ওই বাড়িতে? ভাঙা ইট সুরকি কাঠ কড়ি বরগার জন্যে ঘুম হবে না তাদের তা হতে পারে না। কলকাতায় ভাঙা বাড়ির অভাব নেই, সেখানে গিয়ে ইট কাঠ কিনতেই পারে তারা। এ-বাড়িতে তার অনেক বেশি– অনেক বেশি কিছু থাকতে পারে। সেটা কী?”
চন্দন কিকিরার মুখ দেখছিল। ওঁরও যেন জেদ ধরেছে। তারাপদর দিকে মুখ ফেরাল চন্দন।
তারাপদ বলল, “কী সেটা, আমরা কেমন করে জানব, সার! আপনিই বলুন।”
কিকিরা মাথা নাড়ালেন। “এখন বলতে পারছি না। খোঁজখবর নিচ্ছি। তবে একটা কথা মাথায় রাখবে, তেরো নম্বর বাড়ির ওই ঘরটা কালো বাক্স আর কফিন… ওরই সঙ্গে রহস্যটা জড়িয়ে আছে। তবে কালো বাক্সটা দেখে আমার মনে হল হ্যারিশ ওর মধ্যে কাজের জিনিসপত্র রেখেছিল।
চন্দন রুমাল বার করে মুখ মুছল। চকচকে চোখ। বলল, “আপনি জানতে পারলেন কিছু?”
কিকিরা প্রথমে চুপচাপ থাকলেন। পরে বললেন, “আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি। মুশকিল হল, পাড়াটা আমার অজানা, মানে ওদিকে আমার চেনাজানা লোক কেউ নেই। চেলাও নেই। শেষে খুঁজে খুঁজে একজনকে পেলাম– পাড়ার কাছাকাছি লাগোয়া পাড়ায় থাকে। ছেনু গুণ্ডা…”
“ছেনু গুণ্ডা!”
“ভাল নাম শ্রীদাম বা ছিদাম। ওরফে কালু, ওরফে টিকিয়া, ওরফে হাতকাটা ছে। ছেনুর কেরিয়ার বলো আর বায়োডাটা বলো- খারাপ নয়। তিনবার জেল, মার্ডার কেসের আসামি হয়নি একবারও, তবে দাঙ্গা মারামারি, লুঠ, চোরাই পিস্তল বিক্রি, বোমাবাজি– এসব তার কোয়ালিফিকেশনের মধ্যে আছে..”
তারাপদ হাততালি দিয়ে বলল, “বাঃবাঃ, আপনি তবে ছেনু গুণ্ডার গডফাদার?”
“গ্র্যান্ডফাদারও বলতে পারো, কিকিরা ঠাট্টার গলায় বললেন, “এটা অবশ্য সে গ্র্যান্ড নয়, গ্র্যান্ড হোটেলের গ্র্যান্ডের মতন…”
চন্দন হেসে ফেলল।
কিকিরা বললেন, “তোমরা ছোটখাটো চোর ছ্যাচড় গুন্ডাদের যতটা ঘেন্নাপিত্তি করো, বিগদের বেলায় তা করো না! বিগদের বেলায় মিস্টার, রেসপেকূটেড সার…! তা সে যাই হোক, ছেনো বা ছেনু এখন জেন্টলম্যান। রেস্তরাঁ লাগিয়ে দিয়েছে। প্লাস এন্টালি বাজারে মাছের একটা স্টল। ছেনুর গোঁফ পেকে সাদা, মাথার চুলও টুয়েলভ আনা হোয়াইট। ধবধবে সাদা জামা পরে বসে থাকে তার রেস্তরাঁয়। পরনে ধুতি। দেখলে তোমাদের মনে হবে ধর্মপুত্তুর। বেচারির বাঁ-হাতের আধখানা কাটা।… ইয়ে মানে এরা হল আগের জেনারেশানের হিরো। এখন লস্ট। ওরা গজরাত বেশি, বর্ষণ তত হত না।”
