দোকানে এসে বসল দু’জনে। “দু’ কাপ চা।”
তারাপদ সিগারেট খুঁজল।
“তারা?”
“উঁ!”
“কী হল বল তো? কে কাকে গুলি করল? যদি ওই লোকটাই জ্যাকিকে গুলি করে থাকে! হতেও তো পারে।” চন্দন নিচু গলায় বলল, যেন কারও কানে না যায় কথাটা।
তারাপদ সিগারেট ধরিয়েছিল। ধোঁয়া গিলে বলল, “হতেই পারে। হয় এ, না হয় ও!”
“জ্যাকি যদি ইনজিওরড হয়…! বেজায়গায় লাগলে সর্বনাশ…!”
“আমরা কোনও চিৎকার শুনিনি।”
“গলির বাইরে ছিলাম। শুনতে পাইনি হয়তো। পালিয়েও এলাম সঙ্গে সঙ্গে। তবু তুই যা বলছিস ঠিকই। চিৎকার শুনিনি।”
তারাপদ কথা বলল না। চুপচাপ।
চা এল।
চায়ে চুমুক দিয়ে চন্দন বলল, “তুই কাল সকালেই একবার কিকিরার কাছে যা। ব্যাপারটা জানিয়ে আয়।”
“আমার অফিস।”
“সকাল সকাল যাবি। ফিরে এসে চান-খাওয়া করবি। …..ও হয়ে যাবে।”
“তুই?”
“আমি বিকেলে কিকিরার বাড়িতে হাজির থাকব।”
তারপদ মাথা হেলিয়ে জানাল, কাল সকালেই সে কিকিরার বাড়ি যাবে।
“নে, চা শেষ কর তাড়াতাড়ি। আজ রাতে আমার ঘুম গেল! জ্যাকি যদি ফট হয়ে যায়… কী জানি, বুলেট ইনজুরি হল অনেকটা লাক, হাতে পায়ে কাঁধে লাগলে রক্ষে, মাথায় আর বুকে লাগলে…”
“জ্যাকির মাথায় হেলমেট ছিল…”
“মে গড সেভ হিম।”
চা শেষ করে উঠে পড়ল দু’জনে।
.
সাত সকালে তারাপদ কিকিরার বাড়িতে হাজির।
কিকিরা অবাক হয়ে বললেন, “এ কী! তুমি! কী ব্যাপার তারাচাঁদবাবু!”
ঠাট্টার সময় এখন নয়। তারাপদ গম্ভীর হয়ে বলল, “আপনার ভাইপো বেঁচে আছে, না, হাসপাতালে খোঁজ নিন আগে।”
“কেন, কেন?”
তারাপদ গতকালের ঘটনা বলল বিস্তারিত ভাবে।
কিকিরা হকচকিয়ে গেলেন। “বলো কী! এতদিন তো গুলিবন্দুক আমদানি হয়নি। এবার তাও হল…।”
“আগে আপনি খোঁজ নিন।”
“নিচ্ছি।”
“চাঁদু ও-বেলা আসবে। আমার আসতে আসতে ছ’টা। তার আগে পারব না। অফিসে আজ অনেক কাজ…।” তারাপদ বেশিক্ষণ বসল না। চা খেয়েই চলে গেল।
.
০৬.
কিকিরার ঘরে বসেই আলোচনা হচ্ছিল।
জ্যাকির খোঁজ সকালেই নিয়েছেন কিকিরা। না, জ্যাকির কিছু হয়নি; সে ঠিকই আছে।
তা হলে গুলি?
গুলির রহস্যটা অদ্ভুতই বলতে হবে। কিকিরা যেমনটি শুনেছেন জ্যাকির কাছে, তারাপদদের বললেন।
আসলে যে-বাড়িতে জ্যাকির চেম্বার, সেই বাড়ির অন্য খুপরিগুলোয় আরও চার-পাঁচজনের ছোট ছোট অফিস আছে। কারও এজেন্সি অফিস, কারও বা এক্সপোর্ট সার্ভিস অফিস। ইনকাম ট্যাক্সের দুই উকিলও একটা ঘরে ভাগাভাগি করে বসে বিকেলবেলায়। এ ছাড়া হালে এক ফিনান্স কর্পোরেশানের কোনও কর্তা একটা ঘর দখল করে বসে আছেন। সেখানে প্রায়ই লোকজন আসে, তারা নাকি ফিল্ড ওয়ার্কার। জ্যাকির এই চেম্বার তার বাবার আমলের। বাড়িটার নীচে যার পানের দোকান সে বেশ চালাক চতুর। নাম রামশঙ্কর, বছর চল্লিশ বয়েস। জ্যাকির সঙ্গে রামশঙ্করের বরাবরই খাতির। দোকানের গায়ে একপাশে ফুটপাথে স্কুটার রাখে জ্যাকি। পানওলা রাম নজরদারি করে স্কুটারের। ইদানীং সে জ্যাকির কথামতন আরও একটা জিনিসের ওপর লক্ষ রাখছে।
তারাপদ বলল, “বুঝেছি। সে ওয়াচ করছে জ্যাকি চেম্বার ছেড়ে বেরনোর পর অন্য কেউ তাকে ফলো করছে কিনা!”
“ধরেছ ঠিক।” কিকিরা বললেন, “পানঅলার পজিশানটা ভাল, এ-পাশ ও পাশ নজর রাখতে পারে। যে-কোনও গলি থেকে ফট করে বেরিয়ে এল দেখতে তার অসুবিধে হয় না।”
“ভাল ব্যবস্থা, সার।”
“কাল যখন জ্যাকি চেম্বার ছেড়ে চলে আসছে, তখন রামশঙ্করকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল, রুটিন পালটে গিয়েছে। অন্য দিন একজন কেউ পিছু নেয়, আজ আরও একটা দল আছে।”
“মানে?”
“একটা অটো অনেকক্ষণ থেকে তফাতে- মিল্ক বুথের কাছে দাঁড়িয়ে আছে।”
তারাপদ চন্দন মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। থমকে গিয়ে বলল, “বলেন কী? আমাদেরও দেখেছিল!”
কিকিরা বললেন, “জ্যাকি জেনেশুনেই কাল খানিকটা ঘুরপথে এ-গলি ও গলিতে ঢুকে পিছু-নেওয়া লোকগুলোকে মিসলিড করেছিল।”
চন্দন বলল, “যা বাব্বা! আমরাও সাসপেক্ট হয়ে গেলাম।”
“তা ওর দোষ কী! ও কেমন করে জানবে তোমরা অটোয় চেপে বসে আছ?”
তারাপদ বলল, “রাম সে রাম! কেচ্ছা! … কিন্তু গুলি।”
“গুলির শব্দ সেও শুনেছে। শুনে তার ধাঁধা লেগে গিয়েছিল। আগে এরকম হয়নি। ভয় পেয়ে কাছাকাছি গলিতে ঢুকে পড়ে পালিয়ে এসেছে।”
চন্দন হাঁ করে কিকিরার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল কয়েক পলক। তারপর বলল, “গুলিটা কে করল, সার?”
“সিমপিল ব্যাপার হে। ভেরি ইজি কোশ্চেন। তোমরা গুলি চালাওনি, জানোই না গুলি চালাতে; জ্যাকি নিজের খুলি নিজে ওড়াবে না; তা হলে রইল ওই থার্ড পার্টি– মানে, দ্য আদার ম্যান- যে স্কুটারে চড়ে জ্যাকিকে ফলো করছিল। সহজ বুদ্ধি তো তাই বলে।”
তারাপদ অনেকটা যেন স্বস্তি পেয়েছে; বলল, “আমরা জোর বেঁচে গিয়েছি।”
চন্দন বলল, “লোকটা জ্যাকিকে ঘায়েল করার চেষ্টা করেছিল। এ তো কিলিং, সার। খুনের চেষ্টা।”
মাথা হেলিয়ে কিকিরা বললেন, “তাই মনে হয়। হওয়া স্বাভাবিক। তবে যদি এমন হয়, লোকটা বুঝতে পেরেছিল তোমরা অটো নিয়ে তাকে ফলো করছ বুঝে তোমাদের তাড়াবার জন্যে, ঘাবড়ে দেওয়ার জন্যে ফাঁকা গুলি চালিয়েছিল তা হলে সার কী বলবে। বে-আন্দাজ গুলি।”
চন্দন আর তারাপদ চুপ! কী বলবে! কিকিরা যা বলছেন– তাও হতে পারে। আবার নাও পারে।
