ভবানী বলল, “দাদা, আপনারা বসে থাকুন। ভাববেন না। কিন্তু এখানে দাঁড়িয়ে…”
“তুই বুঝবি না। আমরা এক বেটাকে ধরব। ছ’মাস আগে ধাপ্পা মেরে হাজারখানেক টাকা ধার নিয়ে পালিয়ে এসেছে। আর ও-মুখো হচ্ছে না। শুনেছি এদিকেই কোথাও আসে রোজ।”
ভবানী বিশ্বাস করল কিনা কে জানে। তবে অটোটাকে নিয়ে ঝামেলায় পড়েছে, এমন ভাব করে বসে থাকল।
তারাপদ নজর করে জায়গাটা দেখছিল। হাতে সিগারেট। রাস্তাঘাট একেবারে ফাঁকা নয়। বৃষ্টির দরুন মানুষজনের চলাচল কম। দোকানপত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অন্ধকার জমেছে মাঝে মাঝে! রাস্তার আলো যেমন থাকে ততটাই রয়েছে। শাটার-টানা দোকানগুলো হরেক রকমের, সাইনবোর্ড নজর করলে মনে হয় এখানে রেডিয়ো স্টোর্স, ফোম গদি, চশমা ঘড়ি থেকে পোশাকআশাক ওষুধপত্র মায় স্টেশনারি সবরকম দোকানই আছে। গাড়িঘোড়া আপাতত কম।
দেখতে দেখতে আটটা বাজল। সোয়া আট…..। দু’ পাশের দোতলা তেতলা পুরনো বাড়িগুলো যেন চুপচাপ হয়ে গিয়েছে। বোধ হয় এসব বাড়িতে পরিবার নিয়ে লোকজন কমই থাকে, বেশিরভাগই হয় অফিস-খুপরি, না হয় দোকানের মালপত্র রাখার গুদাম।
চন্দন হঠাৎ ঠেলা মারল তারাপদকে। “ওই যে!”
তারাপদ দেখল।
জ্যাকি নীচে নেমে এসেছে। বাড়িটার নীচে ফুটপাথ ঘেঁষে পান সিগারেট ঠাণ্ডি পানির দোকান। জ্যাকির স্কুটার ফুটপাথের ওপর থাকে। পানের দোকানের সামনে। পানঅলার সঙ্গে কথা বলে জ্যাকি কী কিনে পকেটে রাখল। তারপর হেলমেট মাথায় চাপাল।
চন্দন ভবানীকে খোঁচা মারল। “বি রেডি। তৈরি হ’।”
ভবানী তৈরি।
“একটু দাঁড়া, ওই স্কুটারটা এগিয়ে যাক খানিক, তারপর তোকে বলব…”
জ্যাকি স্কুটারে স্টার্ট দিয়ে পঞ্চাশ গজ মতন এগুতে না এগুতেই কোন গলির অন্ধকার থেকে আরও একটা স্কুটার বেরিয়ে এল। লোকটাকে বোঝা যাচ্ছে না। গায়ে পলিথিন রেনকোট, মাথায় হেলমেট পরেনি, ফেল্ট হ্যাঁটের মতন সস্তা বর্ষাতি টুপি। মুখ মাথা দেখা যায় না। এমন টুপি হরদম দেখা যায় চাঁদনির ফুটপাথে। বর্ষাকালেই বেশি।
লোকটা জ্যাকির পিছু পিছু এগুতে লাগল। সামান্য দূরত্ব রেখে।
চন্দন ভবানীকে বলল, “নে, ওদের পেছন পেছন চল। ফলো করবি। এগিয়ে যাবি না।”
ভবানী প্রথমটায় অবাক হয়েছিল, পরে অটোতে স্টার্ট দিল।
সোজা রাস্তা। একটা মোড় বাঁদিকে। পরে ছোট রাস্তা। বৃষ্টি পড়ছে ঝিরঝির করে। মেঘও ডাকল।
“জ্যাকি বুঝতে পেরেছে, তারাপদ বলল, “একবার ঘাড় ঘোরাল। ও জানে ওকে কেউ ফলো করছে।”
“হ্যাঁ। স্পিড বাড়িয়ে দিয়েছে গাড়ির।”
“লোকটাও বাড়াবে।”
ভবানী বলল, “দাদা আর একটু কাছাকাছি যাব?”
“না।”
বলতে না বলতেই জ্যাকি চট করে একটা গলির মধ্যে ঢুকে গেল। অদৃশ্য। লোকটাও চতুর। কয়েক মুহূর্ত থতমত খেয়ে সেও গলির মধ্যে ঢুকে পড়ল।
চন্দনদের অটো গলির মুখে এসে দাঁড়াল।
হঠাৎ শব্দ। এত আচমকা, অপ্রত্যাশিত যে চন্দনরা চমকে গেল। এ তো গুলির আওয়াজ। কলকাতা শহরে আজকাল কে আর বোমা পটকা গুলির আওয়াজ না শোনে কানে।
তারাপদ ঘাবড়ে গেল।
ভবানীও থতমত খেয়ে গিয়েছে। ভয়ও পেয়েছে।
চন্দন এক মুহূর্ত ভাবল, তারপর ভবানীকে বলল, “গলির মধ্যে ঢুকিস না।”
ভবানী বলল, “দাদা, আর এগুলেই বিপদে পড়ব। এদিকে অন্য কোনও গাড়ি নেই। পুলিশ ঢুকে পড়লে আমাদের ধরবে।”
চন্দন জানে। গলির মধ্যে কে কাকে গুলি করেছে সেটা পরের কথা, কিন্তু কেউ যদি অটোটাকে ঢুকতে দেখে ধরে নেবে অটো থেকেই…..। ব্যস্ত হয়ে চন্দন বলল, “না, যাবি না। ঘুরিয়ে নে মুখ। পালা…..”
ভবানী আগেই অটোর মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে।
.
পালিয়ে এসে ভীত গলায় তারাপদ বলল, “কী হল, বল তো?”
“জানি না।”
“গুলি চালিয়ে দিল? জ্যাকিকে মারতে চেয়েছে। জ্যাকির কী হল? আমার ভয় করছে চাঁদু।”
চন্দন বলল, “বুঝতে পারছি না। জ্যাকিই যদি গুলি চালায়।”
“জ্যাকি?”
“ওকে রোজ ফলো করছে দেখে আজ নিজেই ফাঁদ পেতে লোকটাকে যদি গলিখুঁজি ঘুরিয়ে বেজায়গায় নিয়ে গিয়ে গুলি করে।….আমরা ওদিককার কিছুই জানি না।”
তারাপদ ধাঁধার মধ্যে থাকল; বুঝতে পারছিল না, কী হল, কী হতে পারে।
নিজেদের এলাকায় এসে চন্দন অটোর ছেলেটাকে ছেড়ে দিল। সে বেচারি রীতিমতন ঘাবড়ে গিয়েছিল। চন্দনের কথা মতন সে একটা স্কুটারের পিছু পিছু যাচ্ছিল। লোকটা কে সে জানে না। তা জানুক বা না-জানুক, গুলি চলাচলির সময় গলিটার মধ্যে ঢুকে পড়লে বিপদ হত। পুলিশ এসে ধরবার আগেই যদি পাড়ার লোক এসে পড়ত গলিতে, ভবানীদের আর বেঁচে ফিরতে হত না, পিটিয়ে শেষ করে দিত।
ভবানীকে ছেড়ে দিয়ে চন্দন বলল, “কিছু মনে করিস না, আমি নিজেও জানতাম না এমন হবে! তোকে বিপদে পড়তে হবে জানলে কি ডাকতাম তোকে! যাক, শেষ পর্যন্ত কিছু হয়নি। বাড়ি যা এবার। আজকের কথা কাউকে বলিস না।”
“আপনারা জ্যাকি জ্যাকি বলছিলেন, কে সে?”
চন্দন একবার তারাপদকে দেখল। নামটা ভবানীর কানে গিয়েছে। কথা লুকিয়ে লাভ নেই। চন্দন বলল, “যে-লোকটার স্কুটার আগে ছিল সে জ্যাকি।”
“পরের লোকটা?”
“জানি না। তাকেই ফলো করছিলাম।..যা তুই বাড়ি চলে যা। আমরা পরে যাব।”
ভবানী চলে গেল।
তারাপদ আর চন্দন ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে বসার মতন জায়গা খুঁজছিল। মামুলি একটা চায়ের দোকান তখনও খোলা। একটু পরেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
