“হ্যাঁ।”
“সেই বাড়ি জ্যাকি কিনেছে। হ্যারিশের কেউ ছিল না?”
“না। স্ত্রী আগেই মারা গিয়েছিল। ছেলেমেয়ে ছিল না।”
চন্দন বলল, “কতকাল বাড়িটা খালি থাকার পর জ্যাকি ওই প্রপার্টি কিনেছে?”
“বাড়ি তো খালিই পড়ে ছিল অনেক বছর! কম করেও বছর দশেক।”
তারাপদ যেন কিছু ভাবছিল। চন্দনের কাছ থেকে সিগারেট নিয়ে ধরাল। শেষে বলল, “জ্যাকি খবর পেল কেমন করে যে মর্টগেজে পাওয়া বাড়িটা তালুকদাররা বিক্রি করবে।”
“দালাল। তা ছাড়া তালুকদাররা যে কোনও প্রপার্টি আর রাখবে না–বেচে দেবে–তা কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা জানিয়েছিল।”
তারাপদ মাথা দোলাল, যেন বুঝতে পেরেছে ব্যাপারটা।
চন্দন বলল, “সার, একটা কথা বলুন। বাড়ি বিক্রির ব্যাপারটা এখানে ক্লিয়ার আইনত। তা হলে জ্যাকি কেন বলছে, লাখ টাকা দাদন দেওয়ার পরও সে শুনছে বাড়ি নিয়ে গোলমাল আছে। মানে মালিকানা নিয়ে।”
“আছে খানিকটা। তালুকদারদের বড় মেজো ছোট ছেলের মধ্যে শরিকি গোলমাল। ওটা ওদের নিজেদের মধ্যে। আমার মনে হয়, নিজেদের পাওনাগণ্ডার মিটমাট হলে সমস্যাটা থাকবে না।”
“আচ্ছা!…তা কিকিরা জ্যাকিকে যে বাড়ির মধ্যেটা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল– সে কে? তালুকদারদের কোন লোক?”
“ম্যানেজারের লোক। নাম তার উপেন। সেও তালুকদার। তবে মালিকদের কেউ নয়। চাকরি করে ম্যানেজারের অফিসে।”
চন্দন ঝট করে বলল, “বেশ, উপেনই হল। কিন্তু ওই বাড়ির একটা বন্ধ ঘরে যে ওই কফিনের বাক্সটাক্স পড়ে ছিল, আপনার ছোট তালুকদার জানত না? কী বলল ছোটকর্তা।”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। বললেন, জানতেন না। বললেন, আমরা কি মশাই, ওসব খবর রাখি! ভেতরে কী আছে জানব কেমন করে। পরে শুনেছি। তবে ও নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। রাবিশগুলোকে ফেলে দিলেই পারে।”
তারাপদ বলল, “টাকা ছাড়া অন্য কিছু বোঝে না ওরা। বাজে লোক।”
.
০৫.
দুপুরেই বৃষ্টি নেমেছিল।
আকাশভাঙা বৃষ্টি নয়। দু’পশলা মাঝারি চালের বারিবর্ষণ। রাস্তাঘাট ভিজে থাকল, জল দাঁড়াল না। বারিবর্ষণ’ কথাটা কিকিরাই বলেন, মজা করে। মাঝেসাঝে সংস্কৃত শব্দটব্দর ওপর তাঁর ঝোঁক আগেও দেখা যেত, এখন যেন আরও বেশি হয়েছে। ওঁর ইংলিশ যেমন থাকার তেমনই আছে, কম-বেশি হয়নি, ‘ফিশ ক্যাচিং’ থেকে ‘লেগিং কোয়ারল’। এসব বোঝা যায় কিকিরার, কিন্তু হালফিল চাণক্য শ্লোকের মতন কোত্থেকে এক ছেঁড়াখোঁড়া হলুদপাতার রত্নদেব পন্ডিতের শ্লোকের বই উদ্ধার করেছেন তিনি, আর হুটহাট পাঁজির পাতায় ছাপা দেবদেবীর স্তোত্রপাঠের সংস্কৃতের মতন স্যানসক্রিট আওড়ে যাচ্ছেন। অদ্ভুত মানুষ। কিকিরা যে এতে মজা পান, তারাপদরা জানে। মজা অবশ্য তারাও পায়, তবে সব সময়ে নয়।
কিকিরা বদখত এক কাজের ভার চাপিয়ে দিয়েছিলেন তারাপদদের ওপর। বলেছিলেন, “জ্যাকির চেম্বার বন্ধ হয় আট থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে। তোমরা ওই সময়টায় ওর চেম্বারের আশেপাশে হাজির থাকবে। আর দেখবে কে তাকে ফলো করছে। কতদূর পর্যন্ত।”
চন্দন বলেছিল, “জ্যাকি তো নিজেই বলেছে ওকে কেউ ফলো করে। তবে?”
“তবু করবে। নিজের চোখে দেখবে।”
“আমরা কি বুঝতে পারব?”
“খুব পারবে। তোমার আজকাল চোখ পেকে উঠেছে।”
“ফলো করতে গিয়ে যদি ধরা পড়ি! বেপাড়া সার। ধোলাই হয়ে যাব। ওদিকটায় আমাদের শেল্টার নেই।”
“শোন চাঁদু, আমি জ্যাকির কথা অবিশ্বাস করি না। তবু শিওর হতে চাই। জ্যাকি যা বলে তাতে মনে হয়, একজন কেউ রুটিন করে তাকে ফলো করে না। হয়তো ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে। বা একই লোক হলে আইডেন্টিফাই করার সুবিধে। আমার মনে হয় কাজটা রোটেশানে হয়। দেখতে হবে বইকী!”
“সার, এই বৃষ্টির দিন, রাত আটটায় আমরা কোথায় গিয়ে মাথা গুঁজে থাকব। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাবে। তেড়ে বৃষ্টি নামলে ভিজে একেবারে নেতিয়ে যাব।”
কিকিরা কান করলেন না কথায়। “নো এক্সকিউজ সার। মনসা চিন্তিতং…”।
“প্লিজ……! ঠিক আছে; বৃষ্টি হলে নো গোয়িং, না হলে গোয়িং।”
কপাল মন্দ চন্দনদের। বৃষ্টি হল, তবে ঝাঁপিয়ে হল না। বিকেলের পর মেঘ সরতে লাগল। আবার জমতে লাগল ছেঁড়া ছেঁড়া ভাবে। টিপটিপ বৃষ্টিও এল, গেল।
তারাপদ আর চন্দন বুদ্ধি খাঁটিয়ে একটা কাজ করেছিল। চেনা একটি ছেলে আজকাল অটো চালায়, চন্দনের চেষ্টায় তার ভাঙা হাত জোড়া লেগেছিল– পাড়ায় থাকে, চন্দন তাকে বলে রেখেছিল, “এই ভব, আমার একটা কাজ করবি?”
“কী দাদা?”
“একদিন তোর অটো নিয়ে–ধর সাড়ে সাতটা থেকে ঘন্টা দেড়েক আমার হয়ে খাটবি?”
“কী যে বলেন দাদা! এটা কোনও কাজ? কবে চাই অটো?”
“বলব।”
.
ভব–বা ভবানীর অটো নিয়ে চন্দন আর তারাপদ আজ রাত আটটার আগে আগে জ্যাকির চেম্বারের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
চন্দন চারপাশ দেখে নিয়ে একটা গলির পাশে বড় রাস্তায় অটো দাঁড় করাল!
“তারা, এই জায়গাটা ভাল। কাছাকাছি দোকানপত্র প্রায় বন্ধ। ওপাশে একটা মিল্ক বুথ। বন্ধ। এপাশে ময়লা-জমানো ভ্যাট। এখানেই…”
তারাপদ বলল, “এখানেই ওয়েট করা যাক। জ্যাকির চেম্বারও সামনে।”
চন্দন আগেই নজর করে দেখেছে, একটা পুরনো বাড়ির দোতলায় জ্যাকির চেম্বার। অনুমান করে নিয়েছে। কিকিরার বর্ণনা মতন মিলে যাচ্ছে বাড়িটা। হাতের ঘড়ি দেখে নিল চন্দন। অটোর ছেলেটাকে বলল, “এই ভব, তুই একটু খুটখাট করবি। বাই চান্স কেউ যদি ভাড়ার জন্যে আসে বলবি, দেখছেন না গাড়িতে যে প্যাসেঞ্জার আছে তাদেরই বসিয়ে রেখেছি, গাড়ি গন্ডগোল করছে। অন্য গাড়ি দেখুন।”
