তারাপদ শুনল। পরে বলল, “কাজের কাজ হল কিছু?”
“না, বলার মতন নয়। চেষ্টা করছি।”
চন্দন হঠাৎ বলল, “কিকিরা, একটা কথা আমায় বলুন তো? একজন হাতুড়ে চিনে দাঁতের ডাক্তার। বয়েসও বেশি নয়। সে লাখ টাকা পেল কোথায়? আরও একটা পয়েন্ট আছে, বাড়িটা কিনতে হলে তার আরও কয়েক লাখ টাকা লাগবে? এত টাকা তার আসে কেমন করে?”
কিকিরা বললেন, “তুমি যা ভাবছ তা নয়। জ্যাকির বাবা ভাল রোজগার করত। স্পেশ্যালি দাঁত বাঁধানোয় তার সুনাম ছিল খুব। অনেককে দেখেছি, নিজেরা দাঁত না বাঁধিয়ে ওর কাছে ছাঁচ ফেলে যেত। ও সেট তৈরি করত। আর সোনাদানার কাজ হলে জ্যাকির বাবা ছিল পয়লা নম্বরের। টাকা ওর বাবা ভালই করেছে।”
“কত করতে পারেন?”
“মোটামুটি মন্দ কী! আমার অনুমান। জ্যাকির মা, মাইন্ড দ্যাট, নিষ্কর্মা ছিল না। তারও রোজগার ছিল। আরও একটা কথা জেনে রাখবে। ওদের কমিউনিটির লাইফ স্টাইল আমাদের মতন নয়। পকেট ফাঁকা, কাপ্তেনি করছে–এ তুমি ওদের মধ্যে পাবে না।”
“আপনি জ্যাকিকে টাকার ব্যাপারে বোধ হয় কিছু বলেননি?”
“না। সরাসরি বলিনি। কেননা আমি ওদের অবস্থাটা আন্দাজ করতে পারি।…শোনো চাঁদু, এক বাঙালি ছাড়া, বাকি যারা কলকাতা শহরে টাকা কামায়–তারা সব সময় নিজের ভাই বেরদার বন্ধু–এমনকী আধ-চেনা জাতভাইদের সব সময় দাঁড় করানোর জন্যে হেল্প করে। কাজেই জ্যাকির কাছে টাকা জোগাড়ের ব্যবস্থা করা কঠিন হত না মনে হয়।”
তারাপদ বলল, “জ্যাকির ইনকাম কেমন?”
“এই তো বিপদে ফেললে। আমি কি ইনকাম ট্যাক্স অফিস?”
“তবু?”
“খারাপ নয়। জ্যাকিও দাঁত বাঁধানোর কাজ ভাল করে। বাপের কাছ থেকে শিখেছে।”
“যাক গে, আপনি ওর মায়ের কাছে গিয়েছিলেন?”
“না। যাব একদিন।”
“তা হলে এই ক’দিন…?”
কিকিরা নিজের মাথার চুল ঘাঁটতে ঘাঁটতে বললেন, “একেবারে হাত গুটিয়ে বসে নেই হে! কচ্ছপের স্টাইলে এগুচ্ছি।…রাতারাতি একটা কিছু করে ফেলা এখানে সম্ভব নয়।”
আজ বৃষ্টি নেই। মেঘও নয়। বরং অন্যদিনের তুলনায় গুমোট। সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। কিকিরার কথামতন বগলা শরবত তৈরি করে দিয়ে গেল।
শরবতে চুমুক দিয়ে চন্দন হেসে বলল, “সার, আপনি কচ্ছপের মতন কতটা যাবেন? আমি জ্যাকির ব্যাপারে…”
চন্দনকে থামিয়ে দিয়ে কিকিরা বললেন, “তুমি বিশ্বাস করতে পারছ না জ্যাকিকে। না করতেই পারো। কিন্তু একেবারে অকারণে সে আমার কাছে আসেনি। ওর কাকার কথাই ধরো। বাড়ি কেনার কথা কাকা জানে। এটাও শুনেছে ওই তেরো নম্বর বাড়িটাকে লোকে গুমবাড়ি বলে।”
“জেনেশুনেও জ্যাকি এগিয়ে গিয়েছে।”
“কতটা আগে শুনেছে–কতটা পরে–তা তুমি জানছ কেমন করে! জ্যাকির নিজের কথায় আগেভাগে সব জানত না। যেমন ওই বন্ধ ঘরটার কথা। জানত না, ঘরে কী আছে, কী দেখতে পারে!…হ্যাঁ, বাড়িটাকে গুমবাড়ি বলে সে শুনেছে। তাতে কী! কলকাতার কত পুরনো ধসে পড়া বাড়িকে লোকে ভূতের বাড়ি বলে। তা বলে সেই বাড়িতে কি দু-চারজন মাথা গুঁজে থাকে না? না তোমার ওই বাড়ির বেচাকেনা নিয়ে কথা চলে না?”
তারাপদ বুঝতে পারল, চন্দনের মনোভাব গোড়া থেকেই যে জ্যাকির বিরুদ্ধে–এটা কিকিরা বুঝতে পেরেছেন। তিনি হয়তো খুশিও হচ্ছেন না। হওয়ার কথা নয়। জ্যাকিদের পরিবার ও জ্যাকিকে তিনি যতটা চেনেন, চন্দন তার কতটুকু জানতে পারে! কিছুই নয়।
কথা ঘুরিয়ে নিল তারাপদ। হেসে বলল, “ছাড়ুন ওসব কথা। এবার বলুন তো আপনার কচ্ছপ গতিতে কতটা এগুতে পারলেন?”
কিকিরা শরবত খেতে খেতে বললেন, “তালুকদারদের অফিসে গিয়েছিলাম।”
“অফিস?”
“আছে বাবা, অফিস আছে। রাসমণির বাড়ির খানিকটা আগে। জায়গাটা হাট বললেও চলে, একটা বাড়ির দোতলায় তালুকদারদের অফিস। আগের দিনের নায়েব গোমস্তার কাছারিবাড়ি টাইপের। দেখলে তোমার অভক্তি হবে। তা সেখানে ভাবসাব জমিয়ে দশ-বিশটা বাজে কথার পর তালুকদারদের ঘুঘু ম্যানেজারটিকে পটালাম। রুপোর আংটি সোনার আংটি হল, দশের নোট হল বিশ। হাত সাফাইকা খেল। নজরানা দিলাম। ম্যনেজার আমায় ওদের ছোটবাবুর কাছে নিয়ে গেল।”
চন্দন খানিকটা শান্ত। হাতের গ্লাস নামিয়ে রাখল মাটিতে। মুখ মুছে নিল।
কিকিরা বললেন, “কথাবার্তায় বুঝলাম তালুকদাররা দু’-তিন পুরুষ ধরে প্রপার্টি বিজনেসে আছে। বাজার বসানো, দোকান ভাড়া, পুরনো বাড়ি সম্পত্তি কেনাবেচা থেকে শুরু করে আরও কিছু ব্যবসা। ওদের একটা সলিসিটার ফার্মও আছে পার্টনারশিপের।”
“মানে ধনী লোক!”
“তা তো বটেই।”
“বাড়িটার কথা কী বলল?”
“বললেন, ছোটবাবুই বললেন, মর্টগেজ প্রপার্টি ছিল বাড়িটা। ছোটবাবুর বাবা টাকা ধার দিয়েছিলেন বাড়ি বন্ধক নিয়ে।”
“কাকে?”
“হ্যারিশ বলে এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ানকে। সে আর টাকা শোধ করতে পারেনি। মূল টাকা আর সুদ মিলে যখন টাকার অঙ্কটা বিরাট হয়ে দাঁড়াল, হ্যারিশ পাগল হয়ে একদিন বেপাত্তা হয়ে গেল। মারাও গেল।”
“মারা গেল কেমন করে বুঝল তালুকদাররা? হ্যারিশ তো বেপাত্তা ছিল।”
“মরার আগে হ্যারিশ রাস্তার ভিখিরির মতন চেহারা আর পেটে আলসার নিয়ে চ্যারিটেবল হাসপাতালে ভর্তি হয়। দিন কয়েক বেঁচে ছিল। মারা যাওয়ার আগে নিজের নাম ঠিকানার সঙ্গে তালুকদারদের ঠিকানা দিয়ে যায়।”
“আইডেন্টিফিকেশান হয়েছিল তবে?”
