“কী লক্ষ করলে?” কিকিরা বললেন।
“আমি ইভনিংয়ে আমার চেম্বার থেকে বেরুনোর পর কেউ আমায় ফলো করে।”
“তুমি কখন চেম্বার থেকে ফেরো?”
“আট; হাফ পাস্ট এইট।”
“তুমি স্কুটারে ফেরো?”
“হ্যাঁ, স্কুটারেই আমি ঘুরি।”
“যে ফলো করে তাকে তুমি দেখেছ?”
জ্যাকি বলল, প্রথমটায় সে খেয়াল করেনি। পরে তার চোখে পড়ল কেউ তাকে ফলো করছে।
“তুমি স্কুটারে ফিরছ, লোকটা কেমন করে তোমায় ফলো করবে?”
“সেও স্কুটার নিয়ে ফলো করে।”
“ও। … চিনতে পারো লোকটাকে?”
“না! তফাতে থাকে।” বলে, জ্যাকি মাথা নাড়ল। আবার বলল, “অ্যাঙ্কল, আমি বাড়িটার ভেতর দেখে যেদিন ফিরে এলাম, ওই হরিবল ঘরটা দেখলাম– তার এক দো দিন বাদ থেকে আমার চেম্বারে ঘোস্ট কল আসতে লাগল। কে ফোন করে বুঝতে পারি না। চেম্বার আওয়ার্সের শেষের দিকে কল আসে।”
কিকিরা তাকিয়ে থাকলেন জ্যাকির দিকে। অবাক গলায় বললেন, “কী বলে?”
“বেশি কথা বলে না। রাফ টোন। বলে, বি কেয়ারফুল, বাড়ি কেনার চেষ্টা কোরো না। বিপদ হবে।”
“আশ্চর্য! একই কথা বলে?”
“হ্যাঁ, অ্যাঙ্কল।”
“তোমার কী মনে হয় কথা শুনে? তোমাদের কমিউনিটির কেউ? কী ভাষায় কথা বলে?”
“হিন্দিতে। বাজারি হিন্দি।”
তারাপদ হঠাৎ বলল, “বাড়িটা যে বিক্রি করেছে সে এইসব ঘটনা জানে?”
“বলেছি।”
“লোকটা তোমার চেম্বারে ফোন করে বাড়িতে করে না কেন?”
“বাড়িতে ফোন নেই। ….. চেম্বারের ফোন পুরনো, দরকারে লাগে।”
গলি দিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালেন কিকিরা। চারপাশ দেখলেন। পাড়াটা এতক্ষণে যেন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। লোকজন আসা-যাওয়া করছে। সামান্য তফাতে ট্রামলাইন। দেখা যাচ্ছে না। শব্দ পাওয়া যাচ্ছে ট্রামের। দশ বিশ পা এগিয়ে গেলেই বড় রাস্তা। ট্রামলাইন। কতকগুলো বাচ্চা বল নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে।
তারাপদ আর চন্দন যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। সিগারেট ধরিয়ে নিল একপাশে দাঁড়িয়ে।
কিকিরা কিছু ভাবছিলেন। পরে জ্যাকিকে বললেন, “তুমি ঠিক কী করতে চাও? মানে বাড়িটা কিনবে, না, কিনবে না–সেটা স্থির করতে চাও? না কি, দেখতে চাও কে বা কারা–তোমায় বাড়িটা কিনতে দিতে চায় না বলে ভয় দেখাচ্ছে?”
জ্যাকি বলল, “অ্যাঙ্কল, বাড়ি আমি কিনতেই চাই। তার আগে চাই মিস্ত্রি সভ করতে। ওই ঘরটা কবে থেকে বন্ধ আছে ওভাবে? কে বন্ধ করেছিল? কেন? রুমের মধ্যে কে অত বড় ট্রাঙ্ক রেখেছিল? কেন? ফাঁকা একটা কফিন বাক্স পড়ে আছে কেন এতদিন? কে রেখেছিল…? আর আমায় থ্রেট করার কারণ কী? আমি সবই জানতে চাই।”
তারাপদ বলল, “ঘরের মধ্যে যে ট্রাঙ্ক আর কফিন বাক্স পড়ে আছে–আপনি পুলিশকে জানিয়েছিলেন?”
জ্যাকি বলল, “ঘরের মধ্যে বাক্স পড়ে থাকলে পুলিশ কী করবে? কফিন বাক্স ডেড বডি নয়।”
কিকিরা মাথা হেলিয়ে বললেন, “না, পুলিশকে ইনফর্ম করার কিছু নেই। পুরনো ভাঙা বাড়িতে কী পড়ে আছে জেনে পুলিশ কী করবে? সোনাদানা, ভ্যালুয়েবল কোনও জিনিস পেলে জানানো যেত। কিছুই তো পাওয়া যায়নি। থানায় গেলে তাড়িয়ে দেবে।”
চন্দন বলল, “থানা পুলিশ এখানে আসে না। আইনের কোনও ব্যাপার নেই। তবে বাড়ি-বিক্রির ব্যাপারটা হয়তো ….” কথা শেষ করল না সে। তার মাথাতেই এল না কী বলবে।
কিকিরা জ্যাকির দিকে তাকালেন। “এই কেসটা বড় গোলমেলে, জ্যাকি। আমরা যে তোমায় ভরসা দেব তাও দিতে পারছি না। তা একটা কথা তুমি কি আগে বলেছ? আমার মনে পড়ছে না। বাড়িটা তুমি কার কাছ থেকে কিনতে যাচ্ছ? সে কে?”
জ্যাকি বলল, “তালুকদার এস্টেট অ্যান্ড প্রপার্টিজ থেকে কিনতে যাচ্ছিলাম।”
“তারা কে?”
“তাদের হাতে এদিককার দু-চারটে বাড়ির মালিকানা আছে। ফ্রি স্কুল স্ট্রিটেও আছে জানি। তালুকদারের কাছ থেকে কিনে নেব বলে টাকা অ্যাডভান্স করেছি।”
কিকিরা শুনলেন। পরে বললেন, “ঠিক আছে। আমি ভেবে দেখি। ঝামেলা অনেক। নাও এখন চলো।”
.
০৪.
সপ্তাহখানেক পরের কথা।
কিকিরার ঘরে বসে কথাবার্তা হচ্ছিল। চন্দন রাগ করে ছুটি নিয়েছে হাসপাতাল থেকে। বদলি আর আটকানো গেল না বেচারির। এখন মেজাজ ভাল নয়। বলছে চাকরি ছেড়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে নেমে পড়বে। বাড়িতে আপত্তি আছে বাবার। কলকাতা শহরে অত সহজে প্র্যাকটিস জমানো যায় না। আর নিজের দেশবাড়িতে গিয়ে বসলেও চার-পাঁচ বছরের আগে সুবিধে হবে না। সেখানেও ভাল পসারের ডাক্তার আছে জনা কয়েক, বাকিরা চরে খাচ্ছে। বাবা বলেন, কাক যেভাবে ময়লা ঠুকরে বেড়ায়–এরাও সেইভাবে রোগী হাতে পেলে ঠুকরে বেড়াচ্ছে। আপাতত তাই চন্দন চাকরি ছাড়তে পারছে না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে বিরক্ত।
তারাপদ আর কিকিরাই কথাবার্তা বলছিল বেশি, চন্দন শুনছিল।
শেষে তারাপদ একবার বলল কিকিরাকে, “আপনি নিজের চোখে দেখেছেন–জ্যাকির কেনা ভাঙা বাড়ি সাফসুফ হয়ে গিয়েছে?”
“কালও একবার গিয়েছিলাম। হ্যাঁ, জঞ্জাল প্রায় পরিষ্কার, ভাঙা মালমশলা তুলে নিয়ে গিয়েছে, কাঠকুটোও বেশি পড়ে নেই ….”
“কে নিয়ে গেল?”
“এসব নেওয়ার লোক আছে। কিনে নিয়ে যায়। পুরনো ভাঙা বাড়ির ইট কাঠ সবই বিক্রি হয়ে যায় হে তারাবাবু! এ হল কলকাতা শহর, এখানের ধুলো মাটিও পড়ে থাকে না। তা ছাড়া, পুরনো আমলের বাড়ির কাঠকুটোও উঁচু ক্লাসের। তার দাম রয়েছে।”
