কিকিরা কিছু বলার আগেই জ্যাকি বাক্সটার ডালা উঠিয়ে ফেলল।
দু’পা এগিয়ে টর্চের আলো ফেললেন কিকিরা বাক্সর মধ্যে। ফেলে অবাক হয়ে গেলেন। বৃহৎ ট্রাঙ্ক, হাত দুয়েক, কি সোয়া দুই গভীর। বাক্সটার একপাশে দুটি মাত্র পোশাক পড়ে আছে। বাকিটা ফাঁকা নয় পুরোপুরি। কয়েকটা যন্ত্রপাতিও রয়েছে যেন।
তারাপদরাও এগিয়ে এসে ঝুঁকে পড়ল।
কোনও সন্দেহ নেই, বাক্সর মধ্যেটা সামান্য ঝাড়মোছ করা হয়েছে। কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যায়, বন্ধ বাক্সর মধ্যেকার পোকামাকড় দুর্গন্ধ এখনও যায়নি। তেমন করে দেখলে হয়তো মরা আরশোলার দাগ টিকটিকির চ্যাপটানো গায়ের ছালও চোখে পড়তে পারে। আরও কী দেখা যাবে কে জানে! দিনের আলো ছাড়া বোঝা মুশকিল।
কিকিরা বললেন, “ওগুলো একবার বার করতে পারো? দেখি!”।
জ্যাকি হাত তুলে সামান্য অপেক্ষা করতে বলল। তারপর ঘরের বাইরে চলে গেল।
চন্দন বলল, “ব্যাপারটা কী, সার?”
“দেখছি।”
তারাপদ বার কয়েক কাশল খুকখুক করে। এই ঘরের অত্যন্ত ময়লা নোনাধরা দেওয়াল, ঘুণধরা কড়িকাঠের ছাদ থেকে কেমন এক দমবন্ধ করা বাতাস চুঁইয়ে পড়ছে। মুখে রুমাল চাপা দিল তারাপদ। কাশি সামলাচ্ছিল।
জ্যাকি ফিরে এল। হাতে এক সরু কাঠের টুকরো। লম্বা।
নিজে বাক্সের মধ্যে হাত দিল না জ্যাকি, যেন ঘেন্নাতেই, কাঠের টুকরো দিয়েই বাক্সর মধ্যেকার জিনিসগুলো তুলল একটা একটা করে। প্রথমে অ্যাপ্রনটা ঝুলিয়ে ধরল কাঠের টুকরোর আগায়।
কিকিরা দেখলেন। তারাপদরাও। পোশাকটা ধুলো ময়লায় ন্যাতার মতন দেখাচ্ছে। কালো।
অ্যাপ্রনের সঙ্গে একটা স্কার্ফও উঠে এসেছিল। কালোই। তবে বেশ বড় স্কার্ফ। সিল্কের। মাঝে মাঝে পোকায়-কাটা, একটা দাগ একপাশে।
মাথা নাড়লেন কিকিরা। “ওটাও বার করো তো দেখি।”
জ্যাকি স্কার্ফ রেখে অন্য জিনিসটা বার করল। একই ভাবে।
কিকিরা টর্চের আলো ফেলে দেখলেন। তারাপদরাও দেখছিল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কিকিরা বললেন, “এটা গাউন নয়, আলখাল্লা। কাঁধ থেকে পা পর্যন্ত ঝুল। দরবেশ, ফকির-টকিরদের পরতে দেখেছি। তা এটারও অবস্থা তো ওই স্কার্ফের মতন …. ঠিক আছে রেখে দাও।”
জ্যাকি আলখাল্লাটা বাক্সর মধ্যে রেখে দিল।
কিকিরা কী ভাবলেন। পরে বললেন, “এখনকার মতন বাক্সটা বন্ধ করেই দাও।” বলে কফিনের বাক্সর দিকে তাকালেন। “ওর মধ্যেটা দেখেছ?”
বাক্সর ডালা বন্ধ করে জ্যাকি বলল, “দেখেছি।”
“কী আছে?”
“একটা স্টিক। ওয়াকিং স্টিক। গুড কোয়ালিটি কেইন। বেত। মাথার দিকটা লোহা দিয়ে বাঁধানো। বাকি যা আছে,” মাথা ফেরাল জ্যাকি। “ইঁদুর, বিছে, করোচ, কাঠের পোকা। একটা বোর্ড ছিল। কাগজের।”
“আর কিছু নয়?”
না।”
“বেতের ছড়ি ওনলি?”
“কফিনের বাক্সটা দেখবেন অ্যাঙ্কল?”
“পরে দেখব।” বলে কিকিরা একবার দেওয়াল-তাকটার দিকে আলো ফেললেন। “নস্যির কৌটোটা নাকি এখানেই ছিল–জ্যাকি বলেছে।” হঠাৎ মত পালটালেন কিকিরা। “আচ্ছা, দেখি তো ছড়িটা!”
কফিনের বাক্সে হাত ডোবাতে যেন সামান্য ইতস্তত করল জ্যাকি। তারপর ডালা খুলে ছড়িটা বার করল।
প্রথমে টর্চের আলোয় ছড়িটা দেখলেন কিকিরা। কী মনে করে হাত বাড়ালেন, “দেখি।” তারাপদরাও দেখছিল।
কিকিরা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখলেন ছড়িটা। ছড়ির মাথা লোহা-বাঁধানো। কোনওকালে হয়তো ঝকঝকে লোহার পাত বা জার্মান সিলভারের একটা আবরণ ছিল। এখন সবই কালচে। কিঞ্চিৎ কারিকুরিও ছিল আবরণের গায়ে। আপাতত বোঝা যায় না ময়লার জন্যে। কিকিরা ওজন অনুমান করার চেষ্টা করলেন। বেতের জন্যে নয়, লোহার মুণ্ডুর জন্যে ছড়িটা বেশ ভারী লাগছিল। ছড়িটার মাঝামাঝি গোল দাগ। কালচে। অলঙ্করণ বলেই মনে হয়।
“রেখে দাও–” ছড়ি ফেরত দিলেন কিকিরা। দিয়ে দেওয়াল-তাকের দিকে তাকালেন। “ওটা একবার দেখি।”
কফিনের বাক্সর মধ্যে ছড়ি রেখে ডালা বন্ধ করল জ্যাকি।
দেওয়াল-তাক থেকে একটা কৌটো তুলে নিয়ে কিকিরার হাতে দেওয়ার সময় জ্যাকি বলল, “অ্যাঙ্কল, এটা স্নাফ বক্স বলে আমার মনে হয়। শেপটা পিকিউলিয়ার। মাঙ্কির মতন দেখতে।”
কিকিরা হাতে নিয়ে দেখলেন। হাড়ের তৈরি। দেড় ইঞ্চি কি দুই ইঞ্চি লম্বা। হ্যাঁ, বাঁদর বা ওই ধরনের জন্তুর মতন ছাঁদ করে কাটা। হাড়ের তৈরি ছোট্ট হাতি, বেড়াল, নৌকো, বুদ্ধমূর্তি–কত কী তো দেখা যায়। এই কৌটোটার ছাঁদ জন্তুর মতন। তবে বাঁদর, না পেঁচা, না অন্য কিছু বোঝা দায়। কৌটোর মাথায় প্যাঁচ আছে; খোলা যায়। ভেতরে কিছুই নেই। সাদাটে কি বাদামি গুঁড়ো।
তারাপদ বলল, “মোষের শিংয়ের তৈরি নাকি?”
কালোই দেখাচ্ছিল কৌটোটা। কিকিরা কিছু বললেন না। ফেরত দিয়ে দিলেন কৌটোটা। “চলো, ফেরা যাক।”
.
গলিতে এসে বোঝা গেল। বিকেল পড়ে গিয়েছে। মেঘের জন্যে হালকা অন্ধকারও হয়ে এসেছে চারপাশ।
কিকিরা বললেন, “জ্যাকি, তুমি কীসের ভয় পাচ্ছ?”
জ্যাকি বলল, “আমি ভয় পাইনি অ্যাঙ্কল। শুরু মে পাইনি। ওই ঘরটা দেখার পর মামিকে বললাম। মা ভয় পেল। হুন অ্যাঙ্কল নার্ভাস হয়ে গেল। মামি …”
“তোমার মা আমার কাছে পাঠাল তোমাকে?”
জ্যাকি বলল, তার মা যে তাকে কিকিরা অ্যাঙ্কলের সঙ্গে দেখা করতে বলেছে তা ঠিকই। তবে যেদিন ও ওই বাড়ি থেকে ঘুরে এল প্রথম, তখন থেকে একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করতে লাগল।
