কিকিরা জ্যাকিকে ঘরের তালা খুলতে বললেন।
জ্যাকি তালা খুলল।
ঘরে পা দিলে, কিছুই চোখে পড়ে না। অন্ধকার। কোথাও কোনও জানলা আছে কিনা বোঝা যায় না। থাকলেও বন্ধ। ধুলো আর পোড়ো ঘরের ঘন বাসি গন্ধ। টিকটিকি ডেকে উঠল কোথাও।
চোখ সইয়ে নিতে সময় লাগল খানিকটা। তারপর আবছাভাবে যখন ঘরটা দেখা যাচ্ছিল, কিকিরা টর্চ জ্বালালেন। তিনি টর্চ এনেছিলেন পকেটে করে। জানতেন, যে কোনও সময়ে অন্ধকার হয়ে যেতে পারে।
টর্চ জ্বেলে কিকিরা ঘরটার চারপাশে ফেললেন। খড়খড়ি-দেওয়া পুরনো আমলের একটা জানলা অবশ্য আছে। মাঝারি মাপের।
জানলাটা খুলে দিতে বললেন কিকিরা। জানলাটার একটা পাল্লা পুরোপুরি খোলা গেল না। পাট ভাঙা, ফ্রেমের সঙ্গে লোহার তার আর পেরেক মেরে আটকানো। অন্য পাল্লাটা খোলা যায়, তবে কবজা আলগা। আশ্চর্যের ব্যাপার জানলায় কোনও শিক নেই, গরাদহীন। মানে, একেবারে খোলামেলা জানলা।
এবার যেটুকু আলো এল আর কিকিরার টর্চের কল্যাণে মোটামুটি দেখা গেল ঘরটাকে। লম্বাটে ঘর। চওড়ায় কম। হাত দশ-বারো লম্বা হতে পারে। কড়িকাঠের ছাদ। ধসে পড়লেও পড়তে পারে। ফরফর করে আরশোলা উড়ে গেল। হয়তো ইঁদুরও আছে।
কিকিরা বললেন, “এই ঘরটাকে আগে সাফ করিয়ে নিতে বলেছিলাম তোমায়?”
জ্যাকি বলল, “অ্যাঙ্কল, লেবারদের এখন এই ঘরে ঢুকতে দিলে ওরা আর কাজ করবে না।”
“কেন?”
“কফিনের বাক্স! বেটারা ভেগে পড়বে।”
“ও! তা খানিকটা তো পরিষ্কার দেখছি।”
“আমরা করেছি নিজের হাতে। আমি আর আমার ভাই।”
“আচ্ছা! তুমি কি আজ সকালেও এসেছিলে এখানে?”
“ইয়েস অ্যাঙ্কল।”
তারাপদ আর চন্দন তখন অবাক চোখে কফিনের বাক্স, আর কালো বড় ট্রাঙ্ক দেখছিল। ট্রাঙ্কটা সত্যিই বড়। এত বড় বাক্স সচরাচর দেখা যায় না। তার গায়ের রং কালো না খয়েরি, না মরচে রঙের, বোঝা যায় না। কেন যেন বাক্সটা দেখলে অদ্ভুত লাগে। মনের কোথাও খোঁচা লাগে। সন্দেহ, না, ভয়! ওই ট্রাঙ্কের হাত দুই দূরে কফিনের বাক্স। অনেক পুরনো। ভারীও হতে পারে। ডালা কেমন ফোলা, জায়গায় জায়গায় উঁচু হয়ে উঠেছে। রং বোঝা যায় না। কালোই হবে।
তারাপদ চন্দনের দিকে তাকাল। চন্দন অবাক হয়ে জিনিস দুটি দেখছিল। একটি লোহার বাক্স, বা একটা কফিনের বাক্স চোখে দেখা–আশ্চর্যের ব্যাপার নয়। স্বাভাবিক। দেখা যেতেই পারে। কিন্তু এই ঘরের মধ্যে, সত্য মিথ্যা যেমনই হোক, রহস্যময় কিছু কাহিনী শোনার পর–খানিকটা অন্যরকম লাগছিল বইকী!
কিকিরা জ্যাকিকে বললেন, “বাক্সটা তুমি এইভাবেই দেখেছ? তালা দেওয়া ছিল না! খোলা।”
জ্যাকি মাথা হেলিয়ে বলল, এই ভাবেই দেখেছে, তবে তালা ছিল বাক্সে।
“আর ওটা–কফিনের বাক্সটা?”
“ওইভাবেই।”
“নাড়াচাড়া করোনি?”
“ঘর সাফ করার সময় ট্রাঙ্ক, কফিনের বাক্স–দুইই সরিয়েছি।”
কিকিরা টর্চের আলো ফেলে ভাল করে দেখলেন আবার।
“জ্যাকি?”
“অ্যাঙ্কল!”
“আমি তোমার কাকার সঙ্গে কাল দেখা করেছিলাম। হুন বলল, এই বাড়িটা, কিনতে ওরা সবাই তোমায় বারণ করেছিল। করেছিল না?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“মর্টগেজ প্রপার্টি ছিল বাড়ি। লাস্ট ওউনার মর্টগেজ দেয় বাড়ি। কিন্তু তার আগে কে কে মালিক হয়েছিল তার পেপার্স নেই ঠিকঠাক। লাস্ট ওউনার অবশ্য হ্যারিশ।”
“গোলমেলে সম্পত্তি আর কী! তা এখানে যে দুটো মার্ডার হয়েছিল ……”
“নেবাররা বলে। আমি বলিনি অ্যাঙ্কল? আই টোল্ড ইউ।”
“বলেছ হয়তো। তবে পাত্তা দিতে চাওনি বলে আমার মনে হয়েছিল।”
“রাইট অ্যাঙ্কল। মার্ডার হয়েছিল নেবাররা বলে। কেউ দেখেনি। দ্যাট মে বি এ স্টোরি।” বলে জ্যাকি বিড়বিড় করে যা বলল তার অর্থ, প্রত্যেক বাড়িতেই মানুষ মারা যায়, দুর্ঘটনা ঘটে, লোকে আত্মহত্যাও করে কোনও কোনও বাড়িতে–তা বলে সেই বাড়িতে কি মানুষ থাকবে না। আর এসব অঞ্চলে কিছু হল্লা, ছোরাছুরি, পটকাবাজি চলে। জ্যাকি ও নিয়ে তেমন মাথা ঘামায়নি। এত কম টাকায় এই জায়গায় একটা বাড়ি পাচ্ছে–সেই লোভে সে হাত বাড়িয়েছিল।
কিন্তু বাড়িটার জন্য লাখখানেক টাকা দাদন দিয়ে পরে যখন একদিন ঘুরেফিরে দেখতে এল, সেদিনও সে জানত না এই বাড়ির ওপরতলার একপাশে ছাদে ওঠার সিঁড়ির মুখে এইরকম একটা ঘর আছে। প্রথমদিন ভাঙাচোরা বাড়ির ভেতর দিকটা দেখার উপায়ও ছিল না। দিন কয়েক পরে ভাঙা ইট-কাঠ মোটামুটি সরিয়ে যখন বাড়ির ভেতরে ঢুকতে পারল তখনই নজরে পড়ল ছাদে ওঠার সিঁড়ির একপাশে একটা ঘরের বাইরের দরজা লম্বা লম্বা কাঠের তক্তা মেরে বন্ধ করা। রয়েছে। দেখে অবাক হল। এভাবে ক্রস করে কাঠের তক্তা মারা কেন? কেনই বা ঘরের দরজায় বিশাল এক পুরনো তালা ঝুলছে?
তারাপদ আর চন্দন ঘরের চারপাশে তাকিয়ে দেখার মতন অন্য কিছু দেখতে পেল না। একটা মামুলি দেওয়াল-তাক একপাশে। ছোটই।
কিকিরা জ্যাকির সঙ্গে কথা বলছিলেন। “বাক্সটার তালা খুলতে পারলে?”
“ভাই খুলতে পেরেছে। মেহনত করল। তালা ভেঙে দিল।”
কিকিরা টর্চের আলো ফেললেন বাক্সর তালা লাগানো আঙটার দিকে। বুঝতে পারলেন, তালা খুলতে গিয়ে আঙটা লাগাবার জায়গাটাই ভেঙেচুরে রেখেছে ওরা।
“কী ছিল বাক্সে?”
জ্যাকি বলল, একটা অ্যাপ্রন টাইপের ড্রেস। মোটা শক্ত কাপড়। ব্ল্যাক। ওয়ান গাউন টাইপের ড্রেস। সিল্কের। ব্ল্যাক। … অ্যাঙ্কল, লেট মি ওপেন ইট!”
