কথা বলতে বলতে একটা বাড়ির কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন কিকিরা। তারপর চোখের ইশারায় যে বাড়িটা দেখালেন তাকে ইটকাঠের স্তূপ বললেও বলা যায়। ভাঙাচোরা বাড়ি, নোনাধরা দেওয়াল, ইট বেরিয়ে আছে, ফাটল, চারাগাছ বেরিয়েছে ফাটল থেকে; বাড়িটার ধাঁচ বোঝার উপায় নেই বাইরে থেকে, তবু আন্দাজ হয় ওটা যেন সত্যিই সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মতন দেখতে, কিকিরা যা বলেছিলেন। জমির মাপ বোধ হয় বেশি নয়, তারই মধ্যে সামনের দিক একরকম, পেছনের দিক অন্যরকম। সরু বারান্দা, এখানে-সেখানে বাঁক, দু’-দশ হাত বারান্দার পরই সিঁড়ি, গায়ে গায়ে ঘর, আবার সিঁড়ি, কাঠের ঝুলবারান্দা, দেড়তলা, দোতলা… না, কিছুই ধরা যায় না এখান থেকে।
তারাপদ বলল, “ওই বাড়ি?”
“হ্যাঁ।”
“এ তো সার হরিপালের কাউশেড!”
“হরিপালটা কে হে?”
“আপনি চিনবেন না। শেওড়াফুলি দিয়ে যেতে হয়…”
কিকিরা ঠাট্টাটা বুঝলেন, বললেন না কিছুই।
চন্দন বলল, “লেবাররা কাজ করছে দেখছি।”
“হ্যাঁ, জঞ্জাল সাফ করছে। মাত্র ক’দিন হল হাত লাগিয়েছে। আমি জ্যাকিকে বলেছি, আগে রাবিশ সরিয়ে ফেলো সমস্ত, হাত যখন দিয়েছ, শেষ করো, তারপর দেখা যাবে।”
মজুরের সংখ্যা বেশি নয়। জনা চারেক। সর্দার টাইপের কাউকে দেখা গেল না। মজুররা ধীরেসুস্থে গা এলিয়ে জঞ্জাল পরিষ্কার করছে। কাজের বেলাও ফুরিয়ে এল। আর আধ ঘণ্টা বড় জোর, তারপর আজকের মতন ছুটি।
.
বাড়ির মুখেই রাবিশ জমানো ঢিবি। কয়েকটা নয়নতারা গাছের ঝোঁপ, ফণিমনসা।
পাড়ার কুকুর শুয়ে আছে ঢিবির পাশে।
অনেক কষ্টে, ভাঙা ইটকাঠ, জমা করা ময়লার স্তূপ সরিয়ে কিকিরা তাঁর শাগরেদদের নিয়ে সেই ঘরটার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
তারাপদ বলল, “বাইরে যে তালা ঝোলানো, সার!”
“হ্যাঁ, জ্যাকি ঝুলিয়েছে।”
চন্দন বলল, “সেই তক্তাগুলো, যা দিয়ে ঘরটা নো-এন্ট্রি করে রেখেছিল?”
“সেসব আগেই খুলে নিয়েছে জ্যাকি। তক্তা উঠিয়ে নিয়েছে, পুরনো তালা ভেঙে ফেলেছে। এটা নতুন তালা।”
তালা যে নতুন আর শক্তপোক্ত, বোঝাই যাচ্ছিল। চন্দন একবার দরজার কাছে গিয়ে ভাল করে পাল্লাগুলো দেখল দরজার, হাত বোলালো দু-চার জায়গায়। বলল, “মনে হচ্ছে মস্ত মস্ত গজাল মারা ছিল তক্তায়। দরজায় ফুটোগুলো দেখেছেন?”
তারাপদও দেখল।
কিকিরা বললেন, “জ্যাকির আসার কথা, এখনও আসছে না কেন?”
চন্দন দু’পা সরে এসে আশপাশ দেখতে লাগল। এখানে গায়ে গায়ে বাড়ি। দু’ বাড়ির বাইরের দেওয়াল অনেকসময় ছোঁয়াছুঁয়ি হয়ে গিয়েছে। এই বাড়িটার গায়ে লাগানো পুবের বাড়িটাও দোতলা। দু’ বাড়ির মধ্যে একটা পেয়ারা গাছ। ও বাড়ির বারান্দা জাল দিয়ে ঢাকা। কয়েকটা প্যাকিং বাক্স গায়ে গায়ে দাঁড় করানো। বুড়ো এক কুকুর বারান্দায় শুয়ে আছে। দক্ষিণের বাড়িটা আড়াই কি তেতলা। জানলার খড়খড়িতে চিনে মেয়েদের পাজামা, গায়ের কুর্তা শুকোতে দেওয়া আছে। ছাদে টিভি অ্যান্টেনা, পাঁচিলের ওপর দু-তিনটে ফুলের টব। ফুল নেই। গাছ চোখে পড়ছে। ওই বাড়িটায় বোধ হয় নানা পরিবারের বাস। একটা কোলাহল কানে যাচ্ছিল।
চন্দন হঠাৎ বলল, “সার, আপনার হ্যাঁমার আসবে তো?”
“হ্যামার–!”
“হাতুড়ে বদ্যি। মানে ডেন্টিস্ট!”
“চাঁদু, এক সময় হাতুড়েরাই ধন্বন্তরি ছিল।”
“রাখুন ধন্বন্তরি। তখন লোকে বুঝত না দন্ত থেকে জীবনান্তও হতে পারে। এখন লোকে অনেক কসাস হয়েছে।”
“জ্যাকিকে তুমি অতটা তুচ্ছ কোরো না, চাঁদু! তোমার নামকরা ডেন্টিস্টও আমি দেখেছি। বড়ুয়া গিয়েছিল ধর্মতলায় দাঁত তোলাতে। ডাক্তার অনেক টানা হেঁচড়া করে আধখানা দাঁত তুলল। বাকি অর্ধেকটা মাড়ির মধ্যে ডুবে থাকল। বড়ুয়া বলল, ছেড়ে দে বাবা তোর পায়ে পড়ি। ডাক্তার বলল, ঠিক আছে, তবে মশাই অর্ধেকটা যখন তুলেছি, আমার ফিজ-এর হাফ টাকা দিয়ে যান।”
তারাপদ হো হো করে হেসে উঠল।
চন্দনও হেসে ফেলেছিল।
এমন সময় স্কুটারের শব্দ শোনা গেল গলিতে।
সামান্য পরে জ্যাকি এসে হাজির।
চন্দন নতুন মানুষ, তারাপদকে আগের দিন দেখেছে জ্যাকি। নতুন মানুষটিকে ক’ মুহূর্ত দেখল জ্যাকি; তারপর কিকিরার দিকে তাকাল। “সরি অ্যাঙ্কল, আই অ্যাম লেট!”
কিকিরা মাথা নাড়লেন, “বেশি নয়। ঠিক আছে।” বলে চন্দনকে দেখালেন, পরিচয় করিয়ে দিলেন।
জ্যাকি হাত বাড়াল। “ডক্টর?”।
চন্দন হাতে হাত মিলিয়ে একটু হাসল। ভদ্রতার হাসি।
কিকিরা বললেন, “জ্যাকি, তোমার লেবাররা বড় স্লো। এখনও ঠিকমতন সাফসুফ করতে পারল না। আর কদিন লাগবে?”
জ্যাকি বলল, “ওয়ান উইক মোর। লেবার কম অ্যাংকল, আমিও জলদি করছি না। হয়ে যাবে।”
“একটু জলদি করো।” বলে দু’পা বাড়ালেন। “ওই ঘরটার চাবি এনেছ?”
জ্যাকি মাথা নাড়ল। এনেছে।
“চলো তা হলে!”
এই ঘরটার সামনে আসার আগে তারাপদরা একটা সরু প্যাসেজ পেরিয়ে চার ধাপ সিঁড়ি ভেঙেছিল। ভাঙাচোরা রেলিং। একটা বাঁক। বদখত সিঁড়ির ধাপ উঠতেই বন্ধ ঘর।
আলো অনেক কমে এসেছে, খানিকটা পড়ন্ত বেলা আর বাইরের মেঘলার জন্যে, বাকিটা আশপাশের ইটকাঠের বাধার জন্যে। মজুরগুলো বোধ হয় হাত গুটিয়ে ফেলেছে, তাদের সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে অন্য অন্য বাড়ির লোকজনের কথা, চেঁচামেচি, কুকুরের ডাক– সব মিলিয়ে মিশিয়ে একটা শব্দ ভেসে আসছিল।
