চন্দন বলল, “বোগাস। ফালতু কেস। বাড়ি কেনা নিয়ে কে কাকে ঠকাচ্ছে, কার মাথায় কীসের ফন্দি রয়েছে তা জেনে আমাদের লাভ কী! এসব কোর্টকাছারির ব্যাপার, আমাদের নাচবার মানে হয় না। কিকিরার ব্যাপারটা হল, নেই কাজ তো খই ভাজ। যত্ত বাজে ব্যাপার।”
“কিকিরাকে বলিস।”
বৃষ্টি হল না। আকাশ মেঘলাই। বাদলা বাতাসের দমকাও নেই। মোটামুটি আরামই লাগছিল।
কিকিরা তৈরি ছিলেন।
ঘড়িতে সোয়া চার। চন্দনের সঙ্গে দু-চারটে কথা বলেই বেরিয়ে পড়লেন। কাঁচা সর্দির ভাবটা আজ কম। গলা অবশ্য ভারী। মাঝে মাঝে কাশি আসছিল।
চন্দন বলল, “ওষুধ খেয়েছেন?”
“টোটকা। রাত্রে ফুটবাথও নিয়েছি।”
“আপনার উচিত ছিল হেড বাথ নেওয়া।”
“ঠাট্টা করছ! কেন আমার হেডটা কি ফেলনা।” ‘না, কে বলল! আপনার হেড হাজারে এক।”
“শাস্ত্র পড়েছ! পড়োনি! কোত্থেকে পড়বে। আজকের ছেলেছোকরা, বাপ ঠাকুরদার কথাবার্তাই কানে তুলতে চায় না তো শাস্ত্র! আমাদের শাস্ত্রে মাথাকে বলেছে গুণসমনিত্বম অঙ্গ।”
“আপনার শাস্ত্র থাক, সার। শাস্ত্রই আপনার মাথার বারোটা বাজাবে। নিন যেখানে নিয়ে যাচ্ছেন সেখানেই চলুন।”
.
হায়দার লেনের আগে ট্রাম থেকে নেমে পড়লেন কিকিরা। চন্দনরাও নামল। এইসব অঞ্চলে চন্দন তারাপদর ঘোরাফেরা প্রায় নেই বললেও চলে। মাঝ কলকাতার বাঙালি পাড়ার ছাঁদছিরি চোখে পড়ে না এখানে, তবে পুরনো এলাকা নিশ্চয়ই। বাড়িগুলো বিবর্ণ। বৃষ্টিতে জলে স্যাঁতসেঁতে। কোনওটার চেহারা খাঁচার মতন, কোনওটার বা সামনে গাড়িবারান্দার মতন ছাদ আছে। দোতলায় কাঠের জাফরি-করা সান-শেড, ভেঙেচুরে গিয়েছে। বারান্দায় লোহার শিক আঁটা রেলিং। সেকেলে নকশা করা রেলিংও আছে দু’-একটা বাড়িতে, তবে ভাঙাচোরা। বারান্দায় জানলায় কাপড়-জামা ঝুলছে, শুকোতে দেওয়া, প্যান্ট শার্ট ফ্রক থেকে শুরু করে লুঙ্গি পর্যন্ত। বাড়িগুলো বেশিরভাগই দোতলা বা তেতলা। গায়ে গায়ে ঠেস দেওয়া। চাপাচাপির একটা গন্ধ রয়েছে বাতাসে। পাখির খাঁচাও চোখে পড়ল চন্দনের। রাস্তাও অপরিষ্কার।
তারাপদ বলল, “যা বাব্বা, এখানে বোরখাও ঝুলছে?”
চন্দন বলল, “শুঁটকি মাছের গন্ধ পাচ্ছিস না?”
তারাপদ নাক টানল। বলল, “এতরকম গন্ধ পাচ্ছি। কোনটা শুঁটকির আর কোনটা পচা ডিমভাজার, বুঝতে পারছি না।”
রাস্তার গায়ে দু-একটা দোকান। মামুলি। খদ্দের চোখে পড়ছে না তেমন।
বড় রাস্তার পাশ দিয়ে একটা গলিতে ঢুকলেন কিকিরা।
সরু গলি। দুটো লোক পাশাপাশি হেঁটে গেলে তৃতীয়জনের জায়গা থাকে না।
গলিতে এখন ছায়া। মেঘলার দরুন আরও ঘন হয়েছে ছায়া।
“এই আপনার হায়দার লেন?” চন্দন বলল কিকিরাকে।
“হ্যাঁ। এই গলির এটা পেছনের দিক। ওপাশ দিয়ে ঢুকলে এত সরু মনে হয় না।”
“মানে, এটা বাই লেন?”
“না। কলকাতার অনেক পুরনো গলির মুখ বড়, লেজ ছোট। এটা লেজের দিক।”
“ও! তা আপনার মক্কেল এই লেজের দিকে বাড়ি কিনল কেন?”
“পেয়ে গেল। দাম কম।”
“বাড়ির পজেশান নেয়নি।”
“না, এখনও নয়। পজেশান নেওয়ার আগে লেখাপড়া আছে কাগজে, আইনের ব্যাপার। সেটা শেষ হলে তবে তার আগেই ফ্যাকড়া বেঁধে গেল।”
“কালো ট্রাঙ্ক, কফিনের বাক্স…”
“মার্ডার!” কিকিরা আচমকা বললেন। কিন্তু স্বাভাবিক গলায়।
চন্দন আর তারাপদ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। “মার্ডার?”
“বেশি নয়। মাত্র দুটো…”
কিকিরার গলার স্বর ঠাণ্ডা, মোটেই উত্তেজিত নয়। তারাপদদের সন্দেহ হল। কিকিরা তামাশা করছেন।
তারাপদ বলল, “মজা করছেন?”
“উঁহু! নো মজা। ফ্যাক্ট।”
“ফ্যাক্ট! কই আগে তো বলেননি!”
“তখন শুনিনি। কাল সকালে একবার টহলে বেরুলাম। জ্যাকির কাকার জুতোর দোকান বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে বলেছিলাম না! কাল রবিবার বলে দোকান বন্ধ ছিল। কাকা হেয়ার স্ট্রিট থানার পেছন দিকে থাকত জানতাম। পুরনো জায়গাতেই। খোঁজ করে করে পেয়ে গেলাম বুড়োকে।”
“চিনতেন কাকাকে?”
“বাঃ, চিনব না। আগে দু-এক জোড়া জুতোও কিনেছি। তা ছাড়া জ্যাকির বাবার সঙ্গেও গিয়েছি হুন-এর কাছে। আজকাল কালেভদ্রে দেখা হয় ওদিকে গেলে দোকানে।”
“কী বলল সে?”
“বলল, ভাইপোর বাড়ি কেনার কথা সে জানে। জ্যাকিই বলেছে। প্রথমে ও অতটা বোঝেনি। খেয়ালও করেনি। পরে কার সঙ্গে হায়দার লেনের বাড়ির কথা বলতেই সে বলল, আরে তেরো নম্বর বাড়ি; সেখানে যে দুটো মার্ডার হয়েছে। ওটাকে লোকে গুম বাড়ি বলে! ওই বাড়ি তো কেউ কেনে না। অনেক চেষ্টা করেও বিক্রি করা যায়নি। জ্যাকি ওই বাড়ি কিনেছে! ও মরবে।”
চন্দন বলল, “কবে হয়েছে মার্ডার।”
“হালে নয়। একটা হয়েছে বছর দুই আগে। আর-একটা আরও আগে।”
“পাড়ার লোক জানে নিশ্চয়।”
“না-জানবে কেন? অন্তত কিছু লোক। দুটো মার্ডারই শ্বাস বন্ধ করে, যাকে বলে গলায় ফাঁস দিয়ে, স্ল্যাংগুলেশান…”
“পুলিশ।”
“পুলিশ রিপোর্টেই বলেছে স্ট্র্যাংগুলেশান।”
“কেউ ধরা পড়েনি?”
“না।”
চন্দন সন্দেহের গলায় বলে, “তা ইয়ে–এই মার্ডারের ব্যাপারটা আপনার জ্যাকি জানে না? বলেনি আপনাকে?”
“বলেছে একবার। তবে সেভাবে নয়। পাড়ায় দু-একটা খুন জখমের গল্প শোনা যায়–বলেছিল। ব্যাপারটাকে ও তেমন পাত্তা দেয়নি। আমার তো তাই মনে হচ্ছে।”
“পাত্তা দেয়নি কেন?”
“বলতে পারব না। আমার ধারণা, জ্যাকি ভেবেছে, এসব পাড়ার লোকের গল্প। কতটা সত্যি কতটা বানানো বলা মুশকিল। তা ছাড়া দুটো ঘটনাই পুরনো। এখন আর তার গুরুত্ব কী?”
