“ঝামেলার প্রপার্টি কিনল কেন?”
“বললাম যে, কম দামে পাচ্ছে…। তা ছাড়া এসব প্রপার্টি মামলা-দেওয়ানি মামলা ক’ পুরুষ ধরে চলে কেউ বলতে পারেনা। এমন লোক বহু আছে এ শহরে, যারা ডিসপিউটেড প্রপার্টি কেনার জন্যে তক্কে তক্কে থাকে। মানে সস্তায় কিনে রাখে, তারপর দশ বিশ বছর মামলা লড়ে দশগুণ দামে সেটা বেচে দেয়।” কিকিরা তারিয়ে তারিয়ে চা খেতে লাগলেন।
তারাপদ বলল, “জ্যাকি দাঁও মারার জন্যে কিনেছে বাড়িটা?”
“খানিকটা তো বটেই। জলের দরে হাতে পেলে কে ছাড়ে। তবে সস্তা বলে শুধু নয়, জ্যাকি ভাবছিল, বাড়িটা সারিয়েসুরিয়ে নতুন করে নিয়ে ওই বাড়িতে মা আর ভাইকে নিয়ে থাকবে। ভবিষ্যতে চেম্বারও করতে পারে। কাছাকাছি।”
“আপনি তো বাড়িটা দেখেছেন বললেন? কেমন বাড়ি?”
“কাল দেখতে গিয়েছিলাম। অনেক পুরনো বাড়ি। মাথার ছাদ ধসে পড়তে পারে, দেওয়াল হেলে পড়ার অবস্থা, চুন বালি খসে গিয়েছে, কাঠের সিঁড়িতে ধপধপ শব্দ হয়। বাড়ির ধাঁচটা হল সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মতন। না দেখলে বুঝতে পারবে না।”
“তো এই বাড়িতে মিস্ট্রিটা কোথায় দেখলেন?”
“দেখার সুযোগ হয়নি; শুনেছি। দোতলা থেকে তেতলার ছাদে যাওয়ার সময় ডান দিকের একটা ঘরে। ঘরটা নাকি বাইরে থেকে বন্ধ ছিল। দরজার কড়ায় তালা তো ঝুলছিলই, তা ছাড়া দুটো কাঠের তক্তা দরজার মাথা থেকে তলা পর্যন্ত ক্রস-এর মতন করে বসিয়ে বাইরে থেকে লম্বা লম্বা পেরেক ঠুকে আটকানো ছিল।”
“বাইরে থেকে ক্রস…?”
“হ্যাঁ। শুনেছি, এককালে বিদেশে যখন প্লেগ এপিডেমিক হয়ে দেখা দিত, লোকে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাত, এইভাবে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করা থাকত। দেখলেই ধরে নিতে হত, ওই বাড়িতে প্লেগ হানা দিয়ে দু’-একটাকে সাবাড় করে গিয়েছে।”
তারাপদ অবাক হয়ে বলল, “ওই ঘরের দরজা আপনি খুলেছিলেন?”
“আমি কেন খুলব! জ্যাকি নিজেই বাড়িতে ঢোকার পর ব্যাপারটা দেখে মিস্ত্রি-মজুর এনে ঘর খুলিয়েছিল। খুলে ওই দৃশ্য দেখে, কালো ট্রাঙ্ক, কফিনের বাক্স, আর একটা নস্যির ডিবে দেখেই মাথায় চক্কর মেরে যায়।”
তারাপদ এবার রীতিমতন কৌতূহল বোধ করল। তার চা শেষ হয়েছে। কাপটা নামিয়ে রাখল। “তারপর?”
“জ্যাকি বিপদে পড়ে গেল। এসব আবার কী! তার মাকে বলল, ভাইকে। মা ভয় পেয়ে বলল, ও বাড়ি ছেড়ে দাও। ওখানে পা দিলে কী অমঙ্গল ঘটবে কে জানে! বুড়ি মানুষ, কম দুঃখশোক পায়নি। ভয় পাওয়া স্বাভাবিক।”
“আর ভাই?”
“ভাইটা ছোকরা। ট্যানারিতে কাজ করে, আর বক্সিং লড়ে বেড়ায়, চক্কর মারে স্কুটার নিয়ে। ভাই বলল, টান মেরে সব বাইরে ফেলে দেবে। কিন্তু জ্যাকির কাকা বুড়ো মানুষ। তার জুতোর দোকান বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে। হুন বলে ডাকে লোকে। সে বলল- ওসব কাজ কোরো না বাছা। শয়তানের সঙ্গে লড়া যায় না।”
মাথা চুলকে তারাপদ বলল, “ইভিল?”
“হ্যাঁ।”
“তা আপনি হঠাৎ জ্যাকিকে পেলেন কোথায়?”
“আরে, আমি আর কোথায় পাব! জ্যাকি নিজেই এল। আমি তখন রানিগঞ্জ যাচ্ছি, মুকুন্দর কাজ। আমি বললাম, এখন তো আমি কলকাতার বাইরে যাচ্ছি। ফিরতে ফিরতে দিন চার-পাঁচ। চার দিন পরে তুমি এসো, ভাল করে শুনব। এখন তুমি যতটা পারো ঘরদোর সাফ করাও।”
“ও! জ্যাকি আবার এল কবে?”
“কাল সকালেই। বগলা বলল, আগের দিন মানে সকালে এসেও খোঁজ নিয়ে গিয়েছে।”
“কালই আপনি গেলেন জ্যাকির সঙ্গে?”
“গেলাম। বাড়িটা দেখলাম বাইরে বাইরে।”
“কী মনে হল?”
“ঝট করে বলতে পারছি না। তবে ব্যাপারটা মিস্টিরিয়াস, ঘোরতর রহস্য রয়েছে। আমি যেটুকু শুনেছি জ্যাকির মুখে ও-রকম বড় সাইজের হাত তিন-সাড়ে তিনের কালো ট্রাঙ্ক আজকাল বাজারে ঝট করে পাওয়া যায় না। অর্ডার দিতে হয় বোধ হয়। আগে এ ধরনের ট্র্যাভেলিং ট্রাঙ্ক আমি দেখেছি। তবে এমন ট্রাঙ্ক হয় এখনও; স্পেশ্যাল কাজে লাগে। খবর নিয়ে বলতে হবে। জ্যাকি বলল, ট্রাঙ্কের রং বোঝাই মুশকিল। চার পুরু ধুলো জমেছে। কফিনের বাক্সটা মামুলি নয়, মাঝারি, তবে কাঠে ঘুণ ধরেছে। আর নস্যির ডিবে! অদ্ভুত।”
তারাপদ সামান্য চুপ করে থেকে বলল, “জ্যাকি যার কাছ থেকে বাড়ি কিনেছে– সে কী বলে?”
“সে বলে, বন্ধ ঘরের মধ্যে কী ছিল সে জানে না। ঘরটাই সে খোলেনি কোনওদিন।”
তারাপদ চুপ করে গেল।
.
০৩.
দিন দুই পরের কথা। কিকিরার সঙ্গে বাড়িটা দেখতে এসেছিল তারাপদরা। আসার আগেই তারাপদ ঠাট্টা করে চন্দনকে বলেছিল, কিকিরার মাথায় আবার ভূত ভর করেছে রে!
চন্দন আজ সঙ্গেই ছিল। দুপুরে আরাম করে ঘুম দিচ্ছিল নিজের কোয়ার্টারে। আজ সে ছুটি নিয়েছে আগে আগে। তারাপদ এসে ঠেলা মেরে তুলল। বলল, “কিকিরার তলব, তাঁর বাড়িতে যেতে হবে, সেখান থেকে হায়দার লেন, মানে কিকিরার নতুন মক্কেলের বাড়িতে।”
চন্দন আরও খানিকক্ষণ ঘুমোবার তালে ছিল। কিকিরার বাড়িতে সে যেত, তবে তার ইচ্ছে ছিল সন্ধে নাগাদ যাবে।
তারাপদ বলল, বিকেল বিকেল না গেলে বাড়ি দেখা যাবে না। ও বাড়ির ইলেকট্রিক লাইন অকেজো। তার কাটা, কানেকশান নেই। অন্ধকার হয়ে গেলে সিঁড়িতে পা ফেলাও যাবে না, তার ওপর যদি বৃষ্টি এসে যায় সবই বৃথা যাবে।
অগত্যা চন্দনকে উঠতে হল।
কিকিরার বাড়ি আসার পথে তারাপদ মোটামুটি জ্যাকিকাহিনী শুনিয়ে দিয়েছিল চন্দনকে।
