“জ্যাকি কি আপনার মক্কেল, না, শুধুই ভাইপো?” তারাপদ ঠাট্টা করে বলল।
“দুই-ই।”
“মানে?”
“জ্যাকি বিপদে পড়েছে হে!…ওর মা এখন বুড়ি। তার ওপর একটা পা আর নাড়তে পারে না। কোমর থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত অসাড়।”
“কেন?”
“ওটা ডাক্তারি শাস্ত্র। আমি বলতে পারব না। চাঁদু যদি বলতে পারে। তবে তার দ্বারাও হবে বলে মনে হয় না। অনেক ডাক্তারই তো দেখেছে, যে যার মতন হাতও লাগিয়েছে, কিস্যু হয়নি।”
“ও! মহিলার বয়েস কত?”
“যাটের ওপর নিশ্চয়।…একটা কথা তোমায় বললাম না! জ্যাকির মা যখন বর্মা মুলুক ছেড়ে পালিয়ে আসে তখন সেকেন্ড ওয়ার্লড ওয়ার চলছে। অনেক লোকই পালিয়ে আসছিল, ইন্ডিয়ানরা তো বটেই, অন্যরাও। প্রচণ্ড কষ্ট করে এসেছিল তারা, কত যে হাঁটতে হয়েছে বনজঙ্গল পাহাড় পেরিয়ে। নানান রোগ হয়েছে। পথে, ইনজুরি হয়েছে, বিষাক্ত পোকামাকড়ের কামড়, ঘা, রক্তপাত…। তা সে সময় শিরদাঁড়ার তলার দিকে জোর চোট পেয়েছিল। জ্যাকির মাকে আমি যখন দেখেছি, মহিলা সামান্য খোঁড়াত। এখন বয়েস হয়েছে। পুরনো জখমের জের কিনা বলতে পারব না। দু-একজন সেরকমই বলে।…আমার সঙ্গে জ্যাকির বাবার আলাপ হয় বছর বারো-চোদ্দ আগে। পরে খাতির। ওর মুখেই সব শুনেছি।”
তারাপদ অন্য কথা ভাবছিল। বলল, “যাক গে, অনেক হিস্ট্রি শোনালেন। এবার আসল কথা বলুন তো?”
“আসল, মানে তুমি বলতে চাইছ-”
“হ্যাঁ সার! আমি বলতে চাইছি–কালো বড় ট্রাঙ্ক, খালি কফিনের বাক্স, নস্যির ডিবে…মিস্ট্রিটা কী?”
“ভয়ঙ্কর মিস্ত্রি, অতীব রহস্যময় ঘটনা…” কিকিরা বললেন, চোখ বড় বড় করে। আবার হাঁচি। বার পাঁচেক কম করেও। গলা ধরে এসেছে তাঁর।
বগলা যেন সময় বুঝে চা এনে দিল।
কিকিরার হাতে চায়ের মগ এগিয়ে দিয়ে বগলা বলল, “আদার রস দেওয়া আছে।”
“বেশি করে দিয়েছ?”
“দিয়েছি।” জবাবটা এমনভাবে দেওয়া, যেন কিকিরার অযথা মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই, যেমন দেওয়ার বগলা দিয়েছে।
তারাপদ চায়ে চুমুক দিল।
কিকিরা বললেন, “বুঝলে তারাবাবু, আমার টোটকা হল, চায়ের লিকার, উইথ জিনজার রস, স্লাইট নুন, পারলে দুটুকরো বচ ফেলে দাও, সর্দি গন। বচ অবশ্য পায়নি বগলা, লবঙ্গ ফেলে দিয়েছে।” বলে গরম চায়ে চুমুক দিলেন তিনি।
“ভাল টোটকা,” তারাপদ বলল, “বৃষ্টিতে ভিজেছেন নাকি?”
“রানিগঞ্জে ভিজেছিলাম। তার ওপর কাল জ্যাকির পাল্লায় পড়ে ওর কেনা বাড়িটা দেখতে গিয়ে একরাশ ধুলো নোংরা নাকে ঢুকল। সে কী বাড়ি হে, আমার মনে হয়, পাঁচ-দশ বছরেও সেখানে মানুষের পা পড়েনি। হাঁটু ডুবে যায় ধুলোয় ময়লায়, মাকড়সার জাল, ধেড়ে ইঁদুর, ছুঁচো, আরশোলা, পায়রার নোংরা– হোয়াট নট?”
তারাপদ একটা আন্দাজ করল। “জ্যাকির বাড়ি দেখে আসার পর আপনি আমায় ফোন করেছিলেন?”
“রাইট।”
“আপনার অতীব রহস্যময় ঘটনাটা তা হলে জ্যাকির বাড়িতে দেখেছেন?”
“বিলকুল ঠিক। ধরেছ ঠিকই। তবে পদার্থগুলো এখনও চোখে দেখা হয়নি। শুনেছি।”
তারাপদ শব্দ শুনতে পেল। বৃষ্টি নামল। বাইরের দিকে জানলার শার্সি বন্ধ। জলের ছাট আসবে না। চা খেতে খেতে দু’ পলক জানলাটা দেখে নিল সে।
হঠাৎ বলল, “আপনি বলছেন, জ্যাকির কেনা বাড়ি। আবার বলছেন, সে বাড়িতে মানুষের পা পড়েনি অনেককাল। একটু ধরিয়ে দিন, সার; মাথায় ঢুকছে না। তা ছাড়া আপনার মক্কেলের নাম জ্যাকি হল কেন? লি, সিন, ফু… এই রকম একটা কিছু হওয়া উচিত ছিল। নয় কী? চিনে নাম…!”
কিকিরা দু’ চুমুক চা নিয়ে যেন গলায় গরমটা লাগিয়ে নিচ্ছিলেন। ঢোঁক গিললেন। তারপর বললেন, “আরে ওরা দু-তিন পুরুষ কলকাতায়, নাম নিয়ে অত ধরাকাটা করেনি। তোমরা করো? বাঙালি ছেলের ডাকনাম ডন, টিটো, যিশু হয় না? মেয়েদের নাম আইভি, লিলি, রুবি শোনোনি। নামে কী আসে যায়।… তবে জ্যাকিরা চিনে হলেও অ্যাংলো পাড়ার গায়ে মানুষ তো, ওই নামটা নিয়ে নিয়েছে। মাইন্ড দ্যাট ওর মা বার্মিজ, বার্মিজ খ্রিশ্চান।”
তারাপদ চায়ের কাপ নামিয়ে পকেটে হাত ডোবাল, একটা সিগারেট খাবে।
সিগারেট ধরিয়ে চায়ের কাপ আবার উঠিয়ে নিল। “জ্যাকিরা নতুন বাড়ি কিনেছে?”
“ইয়েস। হায়দার লেনে। জায়গাটা তোমার ম্যাপে নেই। কর্পোরেশনের খাতায় কী নাম আছে জানি না। ওটা তোমার ওয়েলেসলি পাড়ার মধ্যে পড়ত একসময়। ওখানে তুমি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, চাইনিজ, দু’-চার ঘর গুজরাটি মুসলিম, মায় সাউথ ইন্ডিয়ানও পেয়ে যেতে পারো–কেরেলিয়ান। পাঁচমেশালি পাড়া হলেও অ্যাংলো ঘরানা, মেইনলি; আর চাইনিজ।”
“এখন কোথায় থাকে জ্যাকিরা?”
“জ্যোতি সিনেমার পেছন দিকে…?”
“নতুন বাড়ি হালে কিনেছে?”
“জাস্ট এ মান্থ! এখনও পুরোপুরি কেনা হয়নি, কাগজপত্র তৈরি হয়নি বিক্রিবাটার, কাজ এগুচ্ছে। এর মধ্যে অনেক টাকা অ্যাডভান্স করেছে জ্যাকি…”
“কত টাকা?”
“লাখখানেক।”
“লা-খ!”
“চমকাবার কিছু নেই তারাবাবু। লাখ দু’ লাখ আজকের বাজারে কিছুই নয়। কলকাতায় লাখ টাকায় ফুটপাথের দু হাত জায়গা পাওয়া যায় না।” কিকিরার আবার হাঁচি হল। জোরেই। সামলে নিতে সময় লাগল সামান্য। চা খেয়ে গলা ভিজিয়ে টাগরায় শব্দ করলেন। বললেন, “জ্যাকি যে বাড়িটা কিনেছে সেটা মান্ধাতা আমলের হলেও, ওই বাড়ির দাম কম করেও এখন আট-দশ হতে পারত। হয়নি, কারণ বাড়িটা নিয়ে টানা মামলা-মোকদ্দমার পরও তার মালিকানা নিয়ে একটা গণ্ডগোল আছে। মর্টগেজ করা প্রপার্টি ছিল। শরিকও। যাই হোক, ঝামেলার সম্পত্তি বলে কম দামে হাতে পেয়ে গিয়েছিল জ্যাকি।”
