“এই নেশাই একদিন ওঁকে বিপদে ফেলবে।”
.
০২.
কিকিরা যে কার সঙ্গে কথা বলছিলেন, তারাপদ বুঝতে পারল না।
বগলাও কাছে নেই। সদর দরজা খুলে দিয়ে নীচে গিয়েছে কী যেন আনতে। মুহূর্ত কয়েক দাঁড়িয়ে থেকে তারাপদ কিকিরার বসার ঘরে ঢুকল।
“এই যে, এসো!” কিকিরা ডাকলেন। সঙ্গে সঙ্গে হাঁচি। বার পাঁচ-সাত। মাঝের একটা হাঁচি এমন বিকট শোনাল, মনে হল রোগাসোগা মানুষটির নাকচোখের শিরাই না ছিঁড়ে যায়! হাতে রুমাল ছিল কিকিরার। নাক-মুখ মুছলেন।
তারাপদ কিকিরাকে নজর করে দেখল। চোখ লালচে, ছলছল করছে, মুখও সামান্য ফোলা দেখাচ্ছিল। মানে, সদ্য বর্ষায় ভিজে কাঁচা সর্দি ঝামরেছে ওঁর।
অন্য লোকটিকেও নজর করল তারাপদ। মুখ দেখলেই বোঝা যায়, চিনেপাড়ার লোক। পুরোপুরি না হলেও আধাআধি চাইনিজ তো হবেই। মাথার অর্ধেকই যেন টাক, পাতলা চুল, গোল থ্যাবড়ানো মুখ, ছোট ছোট চোখ, ভোঁতা নাক; গায়ের রং খানিকটা হলদেটে। বয়েস কমপক্ষেও বছর পঁয়ত্রিশ চল্লিশও হতে পারে। বোঝা মুশকিল। পরনে প্যান্ট, গায়ে বুশ শার্ট।
কিকিরা বললেন, “এসো তারা, আলাপ করিয়ে দিই। এই জেন্টেলম্যানের গোটা তিনেক নাম। আমরা জ্যাকি বলে ডাকি। জ্যাকি সুঙ।” বলে তারাপদর দিকে আঙুল তুলে দেখালেন জ্যাকিকে, “তারাপদ। মাই পার্টনার।”
জ্যাকি মাথা নুইয়ে সম্ভাষণ জানাল তারাপদকে।
তারাপদ তখনও বোকার মতন দাঁড়িয়ে। বুঝতে পারছে না–জ্যাকি কে? আর কেনই বা তার আবির্ভাব?
কিকিরা রুমালে নাক মুছলেন আবার। হাসি হাসি ভাব করে বললেন, “জ্যাকি নাইনটি ফাইভ পার্সেন্ট বাংলা বোঝে। বলতেও পারে। টেরেটি, বউবাজার, ধর্মতলা করে ওর দিন কেটেছে। কাকার জুতোর দোকান বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে। দু-তিন জেনারেশান এখানে। ওয়েলেসলিতে জ্যাকির দাঁত তোলার চেম্বার। না না, পাশ করা ডেন্টিস্ট নয়, তবে ওটা ওদের ফ্যামিলি প্রফেশান। বাবা ফটাফট দাঁত তুলতেন। হুট করে বাবা মারা গেলে মায়েরও পেশা হল দাঁত তোলা। এখন জ্যাকি।” কিকিরা আবার হাঁচলেন। নাক পরিষ্কার করলেন রুমালে। মজার গলা করেই বললেন, “এদের স্পেশালিটি কী জানেনা, তারাপদ? পেশেন্টকে নিয়ে ঠুক ঠুক করবে না। যদি দাঁত তোলাতে চাও, একটা গুলি আগে, একবার কুলকুচো, তারপরই এক টান। ব্যস। সাফ। রাত্রে আর-একটা গুলি। কী জ্যাকি–আমি রাইট?”
জ্যাকি হাসল। তারাপদ দেখল, জ্যাকির সামনের একটা দাঁতের ডগায় সোনা সামান্য; যেন পিন করে বাঁধানো। বাদামি রং দাঁতের।
তারাপদর মনে হল, ওই সোনা-বাঁধানো দাঁতটা বোধ হয় বিজ্ঞাপন। জ্যাকি নিশ্চয় সোনা দিয়ে দাঁত বাঁধাতে পারে। সে শুনেছে, চিনে ডেন্টিস্টরা এ-ব্যাপারে এক্সপার্ট।
নিজের দাঁতের ওপর আলগা জিব বুলিয়ে নিল তারাপদ অকারণেই। এবার বসল একপাশে।
জ্যাকি এবার উঠবে। বলল, “টাইম হয়ে গেল; আমি চলি অ্যাঙ্কল।” জ্যাকির উচ্চারণে খানিকটা গোলমাল রয়েছে, হয়ে গেল’ ‘হোয়ে’’গ্যালো’ শোনাল।
কিকিরা ঘাড় হেলালেন। “এসো।”
“নেক্সট কবে মিট হবে?” জ্যাকির কথা বলার ধরনই বোধ হয় এরকম।
“আমি যাব। খবর পাবে। তোমায় ভাবতে হবে না।”
জ্যাকি আবার একবার তার হাতঘড়ি দেখল। সোনালি চেন ব্যান্ড। উঠে পড়ল। তারাপদের দিকে এগিয়ে দু’হাতে তার হাত ধরল একবার। হাসল। তারপর এগিয়ে গিয়ে ঘরের কোণ থেকে তার ওয়াটার প্রুফ আর মাথার হেলমেট উঠিয়ে নিয়ে হাত নাড়ল।
চলে গেল জ্যাকি।
তারাপদ কয়েক পলক তাকিয়ে থাকল দরজার দিকে। মনে পড়ল, বাড়ির নীচে একটা স্কুটার দেখেছিল সে। ওটা তবে ওই লোকটির। কিকিরার দিকে চোখ ফেরাল তারাপদ। “এটিকে কোত্থেকে জোগাড় করলেন?”
“বাতিটা জ্বেলে দাও। ঘোলাটে হয়ে গিয়েছে। বাইরে…”
তারাপদ উঠে পড়ল। বাতি জ্বালাল। বাইরের জমা মেঘ বোধ হয় ঘন হয়ে এসেছে। বাদলার গন্ধ। বৃষ্টি আসতে পারে।
“কটা বাজল হে?”
“সাড়ে পাঁচ।”
“চাঁদু?”
“আসতে পারবে না। সেমিনারে গিয়েছে।”
বগলা ফিরে এসেছে খানিকটা আগেই, তার নড়াচড়া, কাজকর্মের শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। বাতি জ্বেলে দিয়ে এসে তারাপদ বসল। বলল, “বললেন না?”
“তুমি জ্যাকির কথা বলছ? জ্যাকি আমার ওল্ড নেফু, আমায় অ্যাঙ্কল বলে। চাচা ভাতিজা আর কী! ওর বাবা আমার দুটো দাঁত তুলেছিল। কী হাত! ম্যাজিক হ্যান্ড। বন্ধুত্ব হয়েছিল। হুট করে মরে গেল বেচারি। একটু সন্দেহ আছে মরা নিয়ে। জ্যাকি তখন দুরন্ত ছোকরা। বাপের ধমকানিতে মাঝে মাঝে বাবার চেম্বারের পাশের ঘরে বসে দাঁত-বাঁধানোর কাজ শেখে। জ্যাকির মা গত যুদ্ধের সময় অনেকের সঙ্গে বর্মা থেকে পালিয়ে আসে। বয়েস কম। এখানেই থাকত, চিনেপাড়ায়। পরে বিয়ে হয়। স্বামীর কাছে হাতেখড়ি দাঁত-তোলার কাজে। তা ছাড়া টেলারিংও করত। এখন বুড়ি। অথর্ব।”
“আপনি সার ধান ভানতে শিবের গীত গাইছেন!”
“না হে! একটু আধটু জানিয়ে রাখছি। তোমরা তো হালের ছোকরা, অনেক কিছুই দেখোনি। আমিও যে সব দেখেছি, তাও নয়, তবু তোমাদের চেয়ে বেশি দেখেছি। কলকাতায় আমার পঁচিশ তিরিশ বছর থাকা হল। চোখে যা দেখেছি তাই বা তোমরা দেখলে কোথায়! শুনেছি আরও বেশি। যেমন ধরো, কলকাতা শহরের এই বউবাজার পাড়া, ধর্মতলা স্ট্রিট, কিড় স্ট্রিট-একসময় চাইনিজ মানে চিনে দাঁতের ডাক্তারদের বিস্তর পসার ছিল। ওটা ওদের বংশগত ব্যাপার। প্রফেশনাল হেরিটেজ বলতে ওদের ওই দাঁত তোলা, বাঁধানো, জুতোর দোকান, রেস্তোরাঁ, কার্পেন্টারি…!” কিকিরা আবার হাঁচলেন। সামান্য বিরক্ত যেন। “বর্ষার মুখে ভেজা খুব খারাপ, বুঝলে তারা। আর বয়েসও তো হচ্ছে। যা বলছিলাম, পাঞ্জাবিদের ছেলেগুলো গোঁফ ওঠার আগেই গাড়ির স্টিয়ারিং ধরতে শিখে যায়, বড়বাজারে গিয়ে দেখবে–ষোলো সতেরোও বয়েস হয়নি, ছেলেগুলো বাপের গদির পাশে ঘুরঘুর করছে। ফ্যামিলি ট্রাডিশন আর কী! চিনেদের দাঁত তোলার ব্যাপারটাও সেইরকম। আগে ভালই ছিল ওদের এই পেশাটা। এখন কমে গিয়েছে। তবে আছে..।”
