তারাপদ যে-ঘরে বসে সেটা ছোট। জনা চারেকের বসার ব্যবস্থা। পাশের ঘরটা বড়। সেখানে সাতজন; পিয়ন বেয়ারা সমেত। গোটা অফিসে সব মিলিয়ে জনা বারো স্টাফ। কোম্পানি বড় নয়, ছোট। কারখানা বেলেঘাটায়।
তারাপদর পাশে জানলা নেই। অনাদির দিকে একফালি লম্বাটে জানলা রয়েছে। অন্যমনস্কভাবে সেই দিকেই তাকাল তারাপদ। বাইরে বৃষ্টি নেই, কিন্তু পড়ন্ত দুপুর বেশ মেঘলা হয়ে আছে। বৃষ্টি আবার আসতে পারে, নাও পারে। সবেই বর্ষা পড়েছে। আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি চলছে বোধ হয়। জুলাই শুরু হল।
কিকিরা যে কী বললেন তারাপদর মাথায় ঢুকছিল না। কালো ট্রাঙ্ক, কফিনের বাক্স, নস্যির ডিবে– মানেটা কী? উনি কি রসিকতা করলেন! করতেও পারেন। আসলে কিকিরা দিন চারেকের জন্যে রানিগঞ্জ গিয়েছিলেন। ওঁর নিজের কেউ নেই কোথাও, তবে দূর সম্পর্কের জ্ঞাতিগোষ্ঠী দু-একজন আছে, পুরনো বন্ধুবান্ধবদের কেউ। এক বন্ধু মারা গিয়েছেন সদ্য। তাঁর শ্রাদ্ধশান্তি ছিল। বন্ধুর ছেলে চিঠি লিখেছিলেন একবার যদি যেতে পারেন কাকাবাবু। কিকিরা মানুষটির মায়ামমতা সামাজিক কর্তব্যবোধ যথেষ্ট। তিনি না গিয়ে কি পারেন! যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিলেন তারাপদদের।
কিন্তু ফিরে এসেই কালো বাক্স আর কফিনের গল্প ফাঁদলেন কেন? অযথা, না কি নিছকই তারাপদকে তলব করার ছুতো! কে জানে!
কালই তবে তারাপদকে কিকিরার বাড়ি যেতে হবে? এটা ঠিকই যে, তারাপদ ফুটবল খেলা নিয়ে মাতামাতি করে না। সে ফুটবল-পাগল নয়। তার নিজের কোনও দলও নেই। তবে তারাপদ যে বোর্ডিং হাউস বা হোটেলে থাকে সেখানে কানু বলে একটা ছেলে থাকে, কানাই পাল। কানু চাকরি করে জাদুঘরে। আর ফুটবল খেলে বি ডিভিশন লিগে। তার ক্লাব ইয়াং স্পোর্টিং। কানুর পাল্লায় পড়ে তারাপদকে ইয়াং স্পোর্টিংয়ের মেম্বার হতে হয়েছে। মাঝেসাঝে মাঠেও যেতে হয় কানুর তাগাদায়। কালকের খেলাটা নাকি ইজ্জতের খেলা ছিল কানুদের, মাঠে যাব বলেছিল তারাপদ। কী আর করা যাবে, যাওয়া হবে না। পরে কানুকে কিছু একটা বলে সামাল দিতে হবে। কানু ছেলেটা ভাল। চেহারাও শক্তসমর্থ। রোজ সকালে আধ বাটি ভিজে ছোলা আর ভিজিয়ে রাখা চিনেবাদাম খায়। বোর্ডিংয়ের ছাদে গিয়ে উনবৈঠক মারে সকালে।
যাকগে, কাল বিকেলে তা হলে তাকে কিকিরার বাড়ি যেতেই হচ্ছে। যাবে। তবে চাঁদুকে পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না। চাঁদু এখন খানিকটা ঝামেলায় রয়েছে। তার বদলির হুকুম হয়েছে অন্য হাসপাতালে। কোয়ার্টারও পাবে। চাঁদু চেষ্টা করছে আরও অন্তত একটা বছর তার পুরনো হাসপাতালে থাকার। হয়তো তার ধরাধরি কাজে দেবে না। তবু চেষ্টা!
খানিকটা সময় অন্যমনস্ক থাকার পর তারাপদ আবার কাজে মন বসাতে চেষ্টা করল। পারল না। কিকিরা আবার কী নতুন উৎপাত জুটিয়ে নিয়েছেন কে জানে!
.
চন্দনকে পাওয়া গেল।
“কী রে! বৃষ্টিতে ভিজলি?”
“দু’-চার ফোঁটা!” তারাপদ রুমালে মুখ মাথা মুছতে মুছতে বল। “তোর কী অবস্থা? হবে কিছু?”
“না। আমার বসকে বললাম, সার এখানে থাকলে একটু পড়াশোনা করতে পারতাম। যেখানে ঠেলে দিচ্ছে আর বোধ হয় হবে না।”
“কী বললেন?”
“হাসলেন। বললেন, বাবা ওপরঅলার মরজি, আমি আর কী করব! তবু তো দু’-একজনকে বলেছিলুম। চান্স দেখছি না।”
“তুই বেকার ঘাবড়াচ্ছিস! যেখানেই যাস তোর কাজ তো একই।”
“পুরনো হাসপাতালের একটা মায়া থাকে রে, তারা। তা ছাড়া সবাই চেনা, ফেসিলিটি ছিল অনেক। নতুন জায়গায় বনিবনা কেমন হবে কে জানে।… ছেড়ে দে, যা হওয়ার হবে। চা আনতে বলি।”
“বল।”
চা আনতে বলে চন্দন একবার অকারণে দেওয়ালে টাঙানো আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের মুখ দেখল। গালে হাত বুলিয়ে নিল। ফিরে এসে বিছানায় বসল আবার। “তোর খবর কী?”
“দুপুরে অফিসে কিকিরার ফোন।”
চন্দন তাকিয়ে থাকল। “কিকিরা ফিরেছেন?”
“গত পরশু। ফিরেই আজ বললেন, ঘনঘোর না ঘনঘটা রহস্য : কালো বাক্স– ট্রাঙ্ক, কফিনের বাক্স, আর নস্যির ডিবে। ভয়ঙ্কর মিস্ত্রি!”
চন্দন কিছুই বুঝল না। বন্ধুর মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল। পাতা পড়ল না চোখের। “মানে?”
“জানি না।”
“কিকিরা তো রানিগঞ্জ গিয়েছিলেন। মিস্ট্রিটা এল কেমন করে?”
“ভগবান জানেন।”
“উনি কি রানিগঞ্জ থেকে মিষ্ট্রি বয়ে এনেছেন?”
“আমি ভাই কিছুই জানি না। যা বললেন বললাম তোকে।”
চন্দন মাথা নাড়ল, বিশ্বাস করল না। “কিকিরার জোক। ঠাট্টা।”
“কে জানে! কাল যেতে বলেছেন, অবশ্য করেই। তোকেও খবরটা দিতে বলেছেন।”
“আমার হবে না। কাল আমি একটা সেমিনারে যাব।”
“কখন?”
“বিকেলে।”
“ফিরবি কখন?”
“তার কি ঠিক আছে! রাত আটটা ন’টা হতে পারে। দু’জন ফিজিশিয়ান আসছেন বাইরে থেকে; চেস্ট স্পেশালিস্ট ফেমাস ডক্টরস। একজন আলিগড় থেকে, আর একজন মাদ্রাজ থেকে।”
তারাপদর খেয়াল হল, বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে গিয়েছে। শব্দ শোনা যাচ্ছিল। এই বৃষ্টির যা তোড়, কম করেও আধ ঘণ্টা চলবে।
“আমাকে একলাই যেতে হবে, তারাপদ বলল।
“চলে যা।”
“যাব। কিন্তু কিকিরাকে নিয়ে আর পারা যাচ্ছে না।”
“কেন?”
“ধ্যুত! যে যা পারছে এনে ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে; আর উনিও ঝাটগুলো মাথা পেতে নিয়ে নিচ্ছেন। কী দরকার!”
চন্দন হাসল। বলল, “পরোপকার। আজকাল আবার নেশাও ধরে গিয়েছে।”
