“চেয়েছিলাম। ভদ্রলোক আমাকে সন্দেহ করতেন। খারাপভাবে দেখতেন। তিনি যে আমার চিঠিটা খুলে পড়েছেন তাও স্পষ্ট বুঝেছিলাম আমি। এটা ওঁর বদ অভ্যেস ছিল। উনি নিজের হাতে সেজে পান খেতেন। ছোট ছোট পান। জিভ লাল হয়ে থাকত। চিঠি পড়ে খামের মুখ আঁটার সময় জিভের লালা লাগিয়ে ছিলেন। তার দাগ ছিল।”
কিকিরা বলাইবাবুর দিকে তাকালেন। মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলাইবাবু বললেন, “হ্যাঁ, পান খেতেন; বলতেন অজীর্ণ অম্বলের জন্যে পান খান।”
হরিচন্দনবাবু বললেন, “আপনি ওঁর ঘরে ঢুকে গায়ে আগুন ধরিয়ে দিলেন?”
“শ্রীকান্তবাবু ত্রিফলা খাওয়ার পর কেরোসিন স্টোভ জ্বেলে চায়ের লিকার তৈরি করে খেতেন। সকলেই জানে। সেদিনও তাই করছিলেন। কেরোসিন স্টোভ জ্বললে ঘরে গন্ধ হয়–ধোঁয়াও হয় খানিকটা। কার্তিক মাস। ওঁদের ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল না। সামান্য ফাঁক করা ছিল। উনি স্টোভের সামনে বসে জল গরম করছিলেন। আগুন তো জ্বলছিল। আমি নিঃসাড়ে ঢুকে ওঁর ঘাড় গলা স্টোভের ওপর …” জলধর বাকিটা বললেন না। বলার দরকার করে না, অনুমান করা যায়।
সকলেই নিঃশব্দ। শিউরে উঠেছিলেন সকলেই। বুকের মধ্যে কাঁপছিলেন।
কিকিরা বললেন, “মুরলীবাবু?”
“উনি বোধ হয় এক ঝলক দেখতে পেয়ে গিয়েছিলেন আমাকে। শ্রীকান্তবাবু চিৎকার করে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ওঁর ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। আমি অবশ্য মুড়ি দিয়ে ঘরে ঢুকেছিলাম। তবু–তবু ঘুমজড়ানো চোখে আমাকে দেখে থাকতেও পারেন মুরলীবাবু …। কারণ পরে উনি আমাকে কেমন চোখে যেন দেখতেন। দেখে থাকলে উনিই একমাত্র সাক্ষী।”
“কিন্তু ওঁকে আপনি”।
“উপায় ছিল না। মুরলীবাবুকে আমিই ধোঁকা দিয়ে দোতলায় ডেকে এনেছিলাম ঘুম ভাঙিয়ে। বলেছিলাম, ‘শিগগির আসুন বলাইবাবু কেমন যেন করছেন। উনি গায়ে চাদর জড়িয়ে চলে এলেন।”
“কেন?”
“ওঁকে ডেকে আনার সময় বাঁশিটা বাজছিল। সাপুড়ের বাঁশি। ওই বাঁশি হয়তো উনিও শুনেছিলেন।” একটু থামলেন জলধর। “নিয়তি।”
“আপনি ওঁকে দোতলার বারান্দা থেকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিলেন?”
“দিয়েছিলাম। ভাঙা বারান্দা। পলকা। ফেলে দেওয়ার আগে মাথার পেছনে জখমও করেছিলাম।”
নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সকলে। রজনীবাবু বসে পড়েছেন। ঘামছিলেন। পাখার বাতাস তাঁর গায়ে লাগছে না। সলিলবাবুর মুখ ফ্যাকাশে।
হরিচন্দনবাবুও অসুস্থ বোধ করছিলেন।
সকলেই যখন স্তব্ধ, বিচলিত, শ্বাস প্রায় রুদ্ধ হয়ে এসেছে, তখন জলধর একবার দরজার দিকে তাকালেন। চন্দন দাঁড়িয়ে আছে। পাশে তারাপদ।
সোনার সাপটির দিকে চোখ ফিরিয়ে নিলেন জলধর। মনে হল, তিনি যেন বুঝতে পেরেছেন, সোনার সাপও ছোবল দেয়। বড় করে নিশ্বাস ফেলে জলধর বললেন, “পুলিশ ডাকবেন না?”
কিকিরা বললেন, “ডাকব।” বলে হরিচন্দনের দিকে তাকালেন।
জলধর বললেন, “একটা কথা। দয়া করে আমার ছেলেকে জানাবেন না। আমার নিজেরও ভুল হয়েছে। কলকাতায় থাকার সময় ওটা ব্যাঙ্কের লকারে ছিল। এখানে আসার পর সাতপাঁচ ভেবে নিজের চোখে চোখে রাখব বলে নিয়ে এসেছিলাম। না আনলে কী হত জানি না!”
কেউ কোনও কথা বললেন না।
৩.৪ হায়দার লেনের তেরো নম্বর বাড়ির কফিন বাক্স
০১.
“তারাপদ, তোমার ফোন।”
মুখ তুলে তাকাল তারাপদ। জয়দেবদার টেবিলে ফোন। ফোনটা তিনি নামিয়ে রেখেছেন একপাশে।
হাতের কাজ সরিয়ে রেখে তারাপদ উঠল। অফিসে তাকে ফোন করার তেমন কেউ নেই। চাঁদু কদাচিৎ করে। চেনাজানা দু-একজন হয়তো। তবে অফিসের ফোন হতে পারে। বি ডি কোম্পানির বা মুখার্জিদের।
তারাপদ নিজের টেবিল ছেড়ে উঠে জানলার দিকে এগিয়ে গিয়ে জয়দেবদার সামনে দাঁড়াল। ফোন তুলে নিল।
“হ্যালো?”
“আমি ফিরেছি।” কিকিরার গলা।
“ও আপনি! কবে ফিরলেন?”
“গত পরশু সন্ধেবেলায়। কাল আর তোমায় জানাতে পারিনি। ব্যস্ত ছিলাম।”
“কাজ মিটেছে?”
“তা মিটেছে। ওদিকে খুব বৃষ্টি হচ্ছে। এখানেও দেখছি শুকনো নেই।”
“না। এই তো একটু আগেই এক পশলা হয়ে গেল এদিকেআবার হতে পারে। বর্ষা এসে গিয়েছে…।
কিকিরা শেষের কথাটা শুনতে শুনতেই বললেন, “কাল একবার আসবে। বিকেলেই এসো। শনিবারে তোমার আধবেলা অফিস।”
“কাল একবার মাঠে যাব ভেবেছিলাম। অনেকদিন খেলা দেখিনি। আমাদের টিম নাকি দারুণ শুরু করেছে।”
“রাখো তোমার টিম। ধ্যাড়ানো টিম, তার আবার খেলা! বিকেলেই চলে আসবে। জরুরি খবর আছে।”
তারাপদ ইতস্তত করে বলল, “জরুরি?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ। জরুরি। বুঝলে তারাবাবু- ঘনঘোর রহস্য, সাঙ্ঘাতিক মিস্ত্রি, একটা কালো ট্রাঙ্ক, একটা কফিনের বাক্স, আর নস্যির ডিবে। আমি এখন রেখে দিচ্ছি। পারলে চাঁদুকে একবার খবর দিও।”
কিকিরা ফোন ছেড়ে দিলেন।
তারাপদ কেমন থ’ মেরে গিয়েছিল। দু’মুহূর্ত। তারপর ফোনটা রেখে দিল।
জয়দেবদা বেয়াড়া এক হিসেবের মধ্যে ডুবে আছেন। প্রায় তেরো হাজার টাকার বাড়তি পেমেন্ট হয়ে গিয়েছে। দুর্গাপুরের এক পার্টি টাকাটা মেরে দিয়ে চুপ করে বসে আছে। মাল সাপ্লাই করেনি পুরো, অথচ তার বিল পাস হল কেমন করে? পাঁজাসাহেব খেপে গিয়েছেন। কী হচ্ছে এসব! চোখ বুজে সবাই ঘুমোয় নাকি? মোহিত দত্তকে পাঠিয়ে দিয়েছেন দুর্গাপুরে, এর পর নিজেই হয়তো উকিলবাড়ি ছুটবেন!
তারাপদ নিজের টেবিলে ফিরে এল। এখন যেরকম তোলপাড় চলছে অফিসে, এটা দু’-একদিনের বেশি চলবে বলে তার মনে হয় না। জয়দেবদা পাকা মাথার মানুষ। কাগজপত্র দেখতে দেখতে ভুলটা ঠিক বার করে ফেলবেন।
