তারাপদ তার কথা শেষ করেনি, চন্দন অনেকটা দূরে গাছপালার আড়ালে একটা বাড়ি দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে বলল, “তারা, ওই তোর মাঠ-মোকাম, ভুজঙ্গভূষণের বাড়ি।”
চন্দন তাকাল। জায়গাটা দেখার মতন। মাঠের ঢল নেমে গেছে অনেকটা, চারদিকে জঙ্গলের ঝোঁপঝাড় গাছপালা, মনে হয় জঙ্গল বুঝি এখান থেকেই শুরু হয়েছে। ওরই এক পাশে একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে, কিন্তু আড়ালের জন্যে বোঝা যাচ্ছে না বাড়িটা কেমন।
আরও আধ মাইলটাক হেঁটে তারাপদরা ভুজঙ্গভূষণকে বাড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। এটা বাড়ি না দুর্গ বোঝা যায় না। জেলখানার মতন উঁচু পাঁচিল দিয়ে চারদিক ঘেরা। গাছপালার অভাব নেই, আম জাম নিম কাঁঠাল থেকে শুরু। করে শিমুল পর্যন্ত। জল বৃষ্টি রোদ সয়ে সয়ে পাঁচিলের গায়ে শ্যাওলার রঙ ধরেছে। কোথাও কোথাও কালো হয়ে গেছে। পাঁচিলের এ-পাশ থেকে বাড়ির সামান্যই চোখে পড়ে। অনেকটা ভেতর দিকে বাড়িটা। দোতলাই হবে। দোতলরা রেলিং-দেওয়া বারান্দা চোখে পড়ছিল। কেমন একটা ফটফট শব্দ হচ্ছে, যেন একটা মেশিন গোছের কিছু চলছে।
তারাপদ বলল, “কিসের শব্দ রে?”
চন্দন বলল, “ডায়নামো বলে মনে হচ্ছে।”
“কী করে ডায়নামো দিয়ে?”
“বোধ হয় বাতিটাতি জ্বালায়।”
“অবাক হয়ে তারাপদ বলল, “বাব্বা! বিশাল কারবার তা হলে?”
একটা জিনিস চন্দন লক্ষ করল। তারা বাড়ির হয় পেছনে না হয় পাশে কোথাও এসে দাঁড়িয়েছে। সামনের দিকটা নজরে আসছে না।
পাঁচিলের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চন্দন বলল, “আয়, সামনের দিকে যাই।”
শুকনো পাতা, গাছের সরু সরু ভাঙা ডালপালা, ছড়ানো পাথরের ভূপ টপকে তারাপদরা বাড়ির সামনের দিকে এসে পড়ল। প্রথমেই চোখে পড়ল, লোহার ফটক। বিশাল ফটক। কারখানার গেটে যেমন দেখা যায়, অনেকটা সেই রকম। ফটকের একপাশে পাঁচিল জুড়ে ছোট একটা ঘর মতন। বোঝাই যায় পাহারা দেবার ব্যবস্থা রয়েছে। খুবই আশ্চর্য, ফটকের সামনে দিয়ে যে রাস্তাটা মাঠের দিকে চলে গেছে–সেটা কাঁচা হলেও গাড়ি চলার দাগ আছে। মরা ঘাস, কাঁকর-মেশানো মাটির ওপর চাকার দাগ। গরুর গাড়ি চললে যেমন দাগ ধরে যায় মাটিতে। কিন্তু দাগের গর্ত গভীর নয়।
তারাপদ ফটকের সামনে এসে বলল, “এবার?”
চন্দন আশেপাশে কাউকে দেখতে পেল না। ফটক বন্ধ। পাহারা ঘরের গায়ে একটা ছোট ফটক রয়েছে, কিন্তু তালা দেওয়া। ফটকটা টপকানো যেত, যদি না মাথায় বশার ফলার মতন শিক থাকত।
গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডাকা ছাড়া চন্দন অন্য কোনো উপায় খুঁজে পেল না।
হঠাৎ তারাপদ বলল, “চাঁদু, এদিকে একবার দেখ।”
চন্দন তারাপদর কাছে গেল। বাঁ ফটকের পাশে থামের গায়ে একটা কী যেন লেখা আছে। লোকে সাদা পাথরের ওপরেই বরাবর কালো দিয়ে বাড়ির নামটাম লিখে এসেছে। এ একেবারে উলটো। কালো পাথরের ওপর সোনালি দিয়ে কিছু লেখা ছিল। সোনালি রঙ এখন প্রায় কালচে হয়ে এসেছে, অক্ষরগুলো বোঝা কষ্টকর, অর্ধেক নষ্ট হয়ে গিয়েছে, গিয়ে পাথরের খোদাইটুকু কোনো রকমে টিকে আছে। দেবনাগরী অক্ষরে কিছু লেখা। চন্দন দেবনাগরী বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছে, তারাপদ হয়ত বুঝতে পারত, কিন্তু ভাঙা অস্পষ্ট অক্ষর সে পড়তে পারছিল না।
খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে তারাপদ বলল, “সংস্কৃত মনে হচ্ছে। ঠিক ধরতে পারছি না, তবে আত্মাটাত্মা কিছু লেখা আছে।”
“আত্মা?”
“তাই তো দেখছি।”
চন্দন কী যেন ভাবল, “আত্মা পরে হবে। জোর খিদে পেয়ে গিয়েছে। নিজেদের আত্মা আগে বাঁচাই। আয় আগে তোর পিসেমশাইয়ের সঙ্গে মোলাকাত করি।“
তারাপদকে টেনে নিয়ে চন্দন পাহারা-ঘরটার কাছে এল। “টপকাতে পারবি?”।
“পাগল, বর্শায় গিঁথে যাব।”
“তা হলে?…আচ্ছা, দাঁড়া, আমার কম্বলটা পাট করা রয়েছে। এটা বশার মাথায় দিচ্ছি। তুই ওই সেট্রি পোস্টের গা ধরে ওঠ, উঠে টপকে যা।”
চন্দন যাকে সেট্রি পোস্টের গা বলল সেটা পাহারা-ঘরের দেওয়ালই বলা যায়।
তারাপদ ইতস্তত করল। এই ফটকটা ছোট, ফুট চারেকেরও কম উঁচু মাটি থেকে। হাই জাম্প করেও পেরিয়ে যাওয়া যেত যদি জায়গা থাকত দু পাশে । অবশ্য তারাপদ স্পোর্টসম্যান নয়, চন্দন খানিকটা লাফঝাঁপ করতে পারে।
চন্দনের তাড়া খেয়ে তারাপদ মনে-মনে ভগবানকে ডেকে গেটের ওপর চেপে পড়ল।
কপাল ভাল, কোনো অঘটন ঘটল না। দুজনেই গেট টপকে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
ভেতরে ঢুকে তারাপদরা দেখল, বাড়িটা ফটক থেকে গজ পঞ্চাশেক দূরে হবে। গড়নটা সেকেলে জমিদারবাড়ির মতন, অবশ্য সামনের দিকে গোলাকার ভাব আছে। মজবুত বাড়ি মস্ত মস্ত থাম, পাকাঁপোক্ত বারান্দা বাইরে। দূর থেকে মনে হয়, যেন বড় বড় পাথরে গাঁথা বাড়ি। বাইরে রঙরঙ কিছু নেই, কালচে হয়ে আছে, মানে ভুজঙ্গভূষণ বাইরের দিকে আর নজর দেন না। দেখতে বাড়িটা ছোট নয়। ভুজঙ্গভূষণ একলা মানুষ, এই বাড়ি নিয়ে কী করেন কে জানে!
ফটক থেকে যে রাস্তাটা সোজা বাড়ির সদর সিঁড়িতে গিয়ে পড়েছে, তার দু পাশে বাগান। এক সময় নিশ্চয় ফুলের বাগান ছিল, এখন ফুলটুল তেমন কিছু নেই, নানা ধরনের পাতাবাহার, জবা, গাঁদা আর এলোমেলো কিছু ফুলগাছ। চোখে পড়ে। বাগানে বেদী আছে বসার । ঘাসগুলো মরে যাচ্ছে শীতে। কিছু লতাপাতা নিজের মতন বেড়ে যাচ্ছে। পাঁচিলের গা ধরে অবশ্য বড় বড় গাছ–নিম, কাঁঠাল, আম, হরীতকী ।
