চড়াই ফুরিয়ে গেলেই বাঁ দিকের কাঁচা রাস্তা ধরতে হল।
জায়গাটা যে সুন্দর তাতে কোনো সন্দেহ নেই। খটখটে শুকনো শক্ত মাটি, বিশাল বিশাল মাঠ, ঢেউ-খেলানো; মাঝে-মাঝে বড় বড় পাথর পড়ে আছে, জংলা গাছ নানা রকমের, মাথার ওপর দিয়ে দু-চারটে বক উড়ে যাচ্ছে, রোদ টকটক করছে, শীতের বাতাস দিচ্ছে শনশন করে।
হাঁটতে হাঁটতে চন্দন বলল, “জায়গাটা কিন্তু চমৎকার, কী বলিস?”
তারাপদ বলল, “খুব ভাল। কিন্তু জায়গার কথা এখন ভাবতে পারছি না চাঁদু।”
“কেন? জেনেশুনেও চন্দন বলল।
“ভুজঙ্গ যেরকম ফণা ধরে দাঁড়িয়ে আছে–,” তারাপদ হাজার দুভাবনার মধ্যেও তামাশা করবার চেষ্টা করল।
চন্দন হেসে বলল, “যা বলেছিস। ভুজঙ্গ যে কোন্ ফণা ধরে দাঁড়িয়ে আছে কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না। কিকিরা যা বললেন তাতে লোকটাকে একটা আস্ত শয়তান বলেই মনে হচ্ছে।”
তারাপদ বলল, “কিকিরা কিন্তু সত্যিই বড় ভাল লোক।”
“আমরা ভাই ওঁকেই অবিশ্বাস করছিলাম। সত্যি, মানুষ চেনা বড় কঠিন।”
“সবই কঠিন। এই সংসার চেনাই কি সহজ। ধর না ভুজঙ্গভূষণের কথা লোকটা এত শয়তান কিন্তু সেই লোক মরার আগে আমায় সম্পত্তি দেবার জন্যে ডেকে পাঠায়?”
চন্দন একটা কুলঝোঁপের পাশে বিশাল এক গিরগিটির মতন জীবন দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। “তারা, দেখ।“ চন্দন আঙুল দিয়ে জীবটাকে দেখাল।
তারাপদ বলল, “কী রে ওটা? তক্ষক নাকি?”
চন্দন পায়ের শব্দ করতেই জন্তুটা ঝোঁপের আড়ালে পালাল।
তারাপদ বলল, “ডেনজারাস্ জিনিস। বিষটিষ আছে বোধ হয়।
চন্দন বলল, “তুই এক আচ্ছা জায়গায় এলি, কী বল? চারপাশেই ডেনজার।”
“সত্যি! এখন ভাবছি, টাকার লোভে মানুষ কী না করে!”
“আমার কিন্তু ভালই লাগছে।”
“ভালই লাগছে?”
“অ্যাভেঞ্চার-অ্যাডভেঞ্চার মনে হচ্ছে। সেই যকের ধনের মতন ব্যাপার। তোর পিসেমশাই ভুজঙ্গভূষণের গুপ্তধন উদ্ধারের থ্রিলটা মন্দ কী রে?”
তারাপদ দুঃখের শব্দ করে বলল, “গুপ্তধন উদ্ধার! বলেছিস বেশ। ঢাল নেই তরোয়াল নেই নিধিরাম সর্দার।”
“কেন কেন? নিধিরাম কেন?”
“কিকিরার মুখে শুনলি না ভুজঙ্গ কেমন ভয়ংকর। তার সঙ্গে লড়ব আমরা? আমাদের কী আছে রে? নাথিং। একটা লাঠি পর্যন্ত হাতে নেই।”
চন্দন এবার মুচকি হেসে বলল, “আছে, আছে।”
“কী আছে?”
“বলব?”
“বল।”
“প্রথমে আছে কিকিরার হেল্প। কিকিরা আমাদের সব রকম সাহায্য করবেন বলেছেন।”
“তুই বড় বাজে কথা বলিস, চাঁদু। কিকিরা একটা রুগ্ন লোক, তাঁর একটা হাত একরকম অসাড়। ওই মানুষ তোকে মুখের কথায় ছাড়া আর কিসে সাহায্য করতে পারেন?”
চন্দন একটা ছোট পাথর লাফ মেরে টপকে গেল। যেন তার হাত-পায়ের সাবলীল ভাবটা দেখাল। বলল, “শোন তারা, কিকিরা আমাদের কাছে চোদ্দ আনা কথাই ভাঙেননি। আমি তোকে বলছি, কিকিরা ভুজঙ্গভূষণের হাঁড়ির খবর রাখেন। কিকিরা ভুজঙ্গভূষণের শত্রু। কাজেই শত্রু যদি ভুজঙ্গভূষণের হাঁড়ির খবর দেন তা হলে আমরা সেটা জানতে পেরে যাচ্ছি। ওটা কম কাজে লাগবে না। দু নম্বর হল, কিকিরার অ্যাডভাইস। সেটা খুব কাজের হবে। আর তিন নম্বর হল, আমার দুটো অস্ত্র।”
“অস্ত্র?” তারাপদ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
চন্দন মিটমিট করে হেসে বলল, “ভাই, যখন থেকে আমি ভুজঙ্গভূষণের কথা শুনেছি তখন থেকেই আমি তাঁকে সাসপেক্ট করেছি। ভুজঙ্গভূষণের দুর্গে ঢুকব অথচ একেবারে খালি হাতে, তা কি হয়! আমি দুটো জিনিস সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। ইনজেকসানের সিরিঞ্জ, আর একটা পাতলা ছিপছিপে ছুরি।”
তারাপদ বন্ধুর এই ব্যাপারটাকে তামাশা মনে করে তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, “এই তোর অস্ত্র? আমি ভেবেছিলাম রিভলবার-টিভলবার নিয়ে এসেছিস।
“ওটা আমি চালাতে জানি না। এ দুটো জানি।”
“তুই ভুজঙ্গকে ওই দিয়ে ভয় দেখাবি? সত্যি চাঁদু তোর যা বুদ্ধি!”
“ভয় দেখাব কেন? ভদ্রলোকের মতন সব যদি মিটমাট হয়ে যায়–তোর ভুজঙ্গভূষণকে ভগবানের হাতে দিয়ে আমরা কলকাতায় ফিরে যাব।”
তারাপদ যেন কি ভেবে বলল, “কিন্তু চাঁদু, যদি ভুজঙ্গ আগেই তোর চালাকি ধরতে পারে?”
চন্দন বলল, “ধরা পড়লেই বা কী হবে! আমরা কলকাতাতেই শুনেছি, ভুজঙ্গভূষণের অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। আমি তোর ডাক্তারবন্ধু; ইমার্জেন্সিতে কাজে লাগতে পারে ভেবে জিনিস দুটো এনেছি।”
যুক্তিটা তারাপদর পছন্দ হল। তবু বলল, “তুই স্টেথোকোপটা এনেছিস?”
“না।”
“বাঃ, তা হলে? স্টেথোস্কোপ ছাড়া ডাক্তার হয়?
“ভুলে গিয়েছি। তাড়াহুড়োর মধ্যে জরুরি জিনিস নিতে লোকে ভুল করে না? সেই রকম ভুল।”
তারাপদ কী যেন ভাবল, বলল, “শুধু ইজেকসানের সিরিঞ্জ নিয়ে কী হবে? ওষুধপত্র?”
চন্দন বলল, “মাথা ধরা, পেট ব্যথার দু-চারটে খুচরো ওষুধ ছাড়া ইনজেকসানের জন্যে মরফিয়ার দুটো অ্যাম্পুল এনেছি, আর-একটা অ্যাম্পুল আছে হার্টের গোলমালের ওষুধ। সবই ইমার্জেন্সির জন্যে।”
তারাপদ এক ফোঁটাও ডাক্তারি বোঝে না। কিন্তু চন্দনের এই উপস্থিত বুদ্ধির জন্যে ওকে বাহবা দিতে ইচ্ছে করছিল । সত্যিই তো, একজন ডাক্তার বন্ধু নিয়ে সে মুখ ঝলসানো ভুজঙ্গভূষণের কাছে আসছে, এরকম অবস্থায় একেবারে খালি হাতে কি আসা যায়?
চুপচাপ কয়েক পা এগিয়ে এসে তারাপদ বলল, “দেখ চাঁদু, ভুজঙ্গকে আমরা যতটা ভয় পাচ্ছি–এতটা ভয়ের কারণ আমাদের বেলায় নাও থাকতে পারে । কাল রাত্রেও ঠিক এতটা ভয় আমাদের ছিল না। আজ সকালে কিকিরাই আমাদের ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। আমরা যতটা ভাবছি তা হয়ত কিছুই হবে না। তা ছাড়া আমি কি যেচে এসেছি? ভুজঙ্গভূষণই আমায় ডেকে পাঠিয়েছেন।”
