শুরু হল মঞ্চ ভাঙা।
রজনীবাবুরা হাত কয়েক তফাতে গাছের ছায়া খুঁজছিলেন। কথাও বলছিলেন নিজেদের মধ্যে নিচু গলায়।
কিকিরা চন্দনরা রোদের মধ্যেই দাঁড়িয়ে। জলধর একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। মঞ্চের ইটগুলো খসে পড়ছিল একটা একটা করে। ইট, প্লাস্টার।
.
মঞ্চ ভাঙা হল। ইট ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। মঞ্চের মাটি।
এবার মাটি।
কিন্তু এ কী?
মাটির তলায় একটা পাথরের স্ল্যাব।
কিকিরা চন্দনদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।
পাথরের মোটা স্ল্যাবটা ওঠাতে বললেন কিকিরা। শাবলের ডগায় মাটি আলগা করে নিল চৈতন্য মালী। তারপর ওরা দু’ তিনজনে মিলে পাথরটা তুলে নিল। ভারী পাথর।
তারপরই চমক। কিকিরা ঝুঁকে পড়ে দেখলেন।
চারকোনা গর্ত। হাত সোয়া হাত গভীর। গর্তের পাশগুলো লালচে রঙের গার্ডেন টাইন্স দিয়ে ঘেরা, যাতে পাশের মাটি বা জল ভেতরে না ঢুকতে পারে। গর্তের মধ্যে একটা কী যেন রাখা আছে। মোটা পলিথিনে মোড়া। পলিথিনের গায়ে রং ধরেছে মাটি আর লাল টালির।
কিকিরা তুলে নিতে বললেন জিনিসটা।
জলধর রুক্ষভাবে বললেন, “তুলবেন না। ওর মধ্যে আমার গুরুদেবের অস্থি রয়েছে। আপনারা অন্যায় কাজ করছেন।”
চৈতন্য মালী হাত নামিয়ে তুলব কি তুলব না করছিল।
হরিচন্দন হঠাৎ বললেন, “আপনার গুরুদেবের অস্থিই যদি রেখে থাকেন জলধরবাবু, ভাববেন না। আমি নিজে নতুন করে আরও সুন্দর করে আপনার তুলসীমঞ্চ তৈরি করিয়ে দেব। … নে রে চৈতন্য, তোল।”
জিনিসটা তোলা হল।
পলিথিনের মোড়কটা খুলে ফেলল চৈতন্য। অ্যালমুনিয়ামের চারকোনা পাত্র। মোটা চাদরের অ্যালমুনিয়াম। ওপরে ঢাকনা।
ততক্ষণে অন্যরাও ছায়া থেকে সরে সামনে এসে ঝুঁকে পড়েছে।
হরিচন্দন নিজেই বললেন, “ভেতরে চলো। এই রোদে আর দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না। ভেতরে গিয়ে দেখব, কী আছে ওর মধ্যে।”
ভেতরে বারান্দায় পাখা নেই। দুটি মাত্র পাখা মৃণালকুঞ্জের। একটি খাওয়ার ঘরে, অন্যটি ম্যানেজারবাবুর ঘরে।
খাওয়ার ঘরেই এলেন সকলে। পাখা চালিয়ে দেওয়া হল। হাত চারেকের এক লম্বা টেবিল রয়েছে খাওয়ার ঘরে, আর ভাঙা আধ-ভাঙা কটা চেয়ার। একটা বেঞ্চি।
কিকিরা নিজের হাতে অ্যালমুনিয়াম পাত্রটির মুখের ঢাকা খুলতে গিয়েও পারলেন না। ভীষণ আঁট।
চন্দন এগিয়ে এসে পাত্রটির ঢাকনা খুলল।
পাত্রের মধ্যে চামড়ার বাক্স। চৌকোনো।
সেটাও খুলে ফেলা হল।
তারপর সকলেই যেন একসঙ্গে চমকে উঠে কেমন এক শব্দ করলেন।
হরিচন্দনবাবুর গলা যেন আটকে গেল বিস্ময়ে। কিকিরাও ভাবতে পারেননি। অন্যরাও নিশ্চল।
সাপ। তবে সোনার। একটা সোনার সাপ পাকানো লেজের ওপর ভর দিয়ে ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। চওড়া ফণা। ফণার কারুকার্যের চেয়েও চোখে পড়ে তার দুটি চোখ। লাল টুকটুকে দুটি চুনি বসানো চোখে। সাপের মাথার ওপর এক সোনার প্রদীপ। চতুর্মুখী। পঞ্চমুখী নয়। প্রদীপের মুখে একটি করে হীরের টুকরো।
এমন একটি অত্যাশ্চর্য জিনিস দেখা যাবে কে ভেবেছিল!
সকলেই প্রথমে চুপ। তারপর দু-একটি অস্ফুট শব্দ।
হরিচন্দনবাবু ঘাড় ফিরিয়ে দেখলেন জলধরকে। নিজেকে সংযত রাখা মুশকিল। তবু বললেন, “এই আপনার গুরুদেবের অস্থি?”
জলধর কথা বললেন না। তাঁর মুখের চেহারা অদ্ভুতভাবে বিকৃত হয়ে গিয়েছে।
কিকিরা বললেন, “এটি উনি কোথাও থেকে চুরি করেছিলেন। এমন জিনিসের দাম কয়েক লাখ টাকা তো হবেই, তা ছাড়া এর অ্যান্টিক ভ্যালু? কবেকার জিনিস, কোথায় ছিল–আমরা তো বলতে পারব না, এ-ব্যাপারে যাঁরা অন্তত আন্দাজ দিতে পারেন–তাঁদের কাছে নিয়ে যেতে হবে। … জলধরবাবু, জিনিসটি আপনি পেলেন কোথায়, কবে? সত্যি কথাই বলুন। আপনার চিঠির কথা আমরা জানি। বলাইবাবু রয়েছেন এখানে।”
জলধর কাউকেই দেখলেন না। বললেন, “আন্দামানে। ভবানীশঙ্কর বলে একজনের সঙ্গে আমার ভাব ছিল। সে চুরি করেছিল। ওটা কোথাকার, আমি জানি না। ওর ইতিহাস বলতে পারব না। তবে এইটুকু জানি, ওটা সুমাত্রা বা জাভা থেকে পাওয়া। বিদেশি টুরিস্টের একটা ছোট দল একবার আন্দামানে আসে। তার মধ্যে এক সাহেব, হয়তো কোটিপতি, আবার কিওরো, ওটি এনেছিলেন। ভবানীশঙ্কর পোর্টে চাকরি করত। সে চুরি করে আমায় রাখতে দিয়েছিল।”
“মানে, পরে কোনও সময়ে ওটা বেচে দিতে পারলে টাকাটা দুজনে ভাগাভাগি করে নেবেন। তাই না?” কিকিরা বললেন।
জলধর সে-কথার জবাব দিলেন না। বললেন, “ভবানীশঙ্কর একবার অসুস্থ হয়ে পড়ল। ভাল রকম। বেঘোর জ্বর। আমি আন্দামান থেকে পালিয়ে এলাম।”
“সোনার সাপ চুরি করে?”
“হ্যাঁ। আমার মনে হয়েছিল, মেনিনজাইটিস রোগের মতন যে ব্যাধি হয়েছে। ভবানীশঙ্করের, তাতে হয়তো সে বাঁচবে না।”
“বাঃ! আপনি তবে ভাল বন্ধু।”
“বন্ধুত্বের কথা বাদ দিন। কে কার বন্ধু! ধরে নিন, আমি লোভে পড়ে এই কাজ করেছি। তারপরও নিশ্চিন্ত ছিলাম না কলকাতায় এসে। গা-ঢাকা দিয়ে থেকেছি অনেকদিন। শেষে আমি আর ভবানীশঙ্করের কোনও খোঁজ পাইনি।”
হরিচন্দনবাবু বললেন, “আপনি মশাই চাকরিবাকরিও তো করতেন। ঘরসংসারও করেছেন শুনেছি।”
“কোনওটাই মিথ্যে নয়। মিথ্যে বলতে আমার টাইটেলটা পালটে নিয়েছিলাম। এফিডেভিট করে। বিশ্বাসের জায়গায় হালদার।”
কিকিরা বললেন, “এসব কথা পরে। আগে বলুন, আপনি শ্রীকান্তবাবুকে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিলেন?”
